বিদায়ি বছরের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার আন্দোলনের জেরে ক্ষমতা ছেড়ে দেশ ছেড়ে ভারতে পালিয়ে আসতে বাধ্য হন বাংলাদেশের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং তিনি ভারতেই আশ্রয় নেন। তাঁর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সরকারের প্রতি ভারতের দীর্ঘদিনের সমর্থন রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। দেশ ছাড়ার পর ভারত তাঁকে আশ্রয় দেওয়ায় এই অভিযোগ আরও যেন দৃঢ় করেছে ।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশ্ব ধর্ম ও সংস্কৃতি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক শাফি মো. মোস্তফা বাংলাদেশের রাজনীতিতে ভারতের এই ভূমিকাকে ‘হস্তক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে’ বলে মনে করেন । তার স্পষ্ট বার্তা, ‘ভারতের উচিত বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের প্রতি সম্মান দেখিয়ে সরাসরি রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ থেকে বিরত থাকা। একই সঙ্গে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ও প্রতিষ্ঠানগুলোকে সমর্থন দেওয়া। অন্যদিকে, বাংলাদেশের উচিত সংখ্যালঘুদের সমস্যা ও অভ্যন্তরীণ সংকটগুলোর দ্রুত সমাধান করা, যাতে সেগুলো বাইরের কোনো শক্তির পক্ষে চাপ দেওয়ার হাতিয়ার না হয়।’
তবে এখন পর্যন্ত কোনও পক্ষই আলোচনার পথে হাঁটছে না। বরং পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে, যখন বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মহম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা মাহফুজ আলম ভারতের বিরুদ্ধে বিতর্কিত মন্তব্য করেন। মাহফুজ আলম ভারতের বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী রাজ্য আসাম, বাংলা ও ত্রিপুরায় ‘উপনিবেশ স্থাপনের’ অভিযোগ তোলেন। তিনি ১৬ ডিসেম্বর এক পোস্টে প্রকাশ্যে ভারতের কিছু অংশ দখলেরও হুমকি দেন। যদিও পরিস্থিতি বুঝে পোস্টটি পরে মুছে ফেলা হয়।
উল্লেখ্য, ভারত সম্প্রতি বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য ভিসা কার্যক্রম সীমিত করেছে। এর ফলে চিকিৎসার জন্য ভারতে যাওয়া অনেক বাংলাদেশির চিন্তার ভাঁজও লক্ষ্য করা গিয়েছে। ভারতীয় গণমাধ্যমেও বাংলাদেশের সংখ্যালঘু নির্যাতন নিয়ে সমালোচনা বাড়ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের পিস ইনস্টিটিউটের বাংলাদেশ বিশেষজ্ঞ জিওফ্রে ম্যাকডোনাল্ড বলেন, ‘বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের সুরক্ষার অভাব ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। উভয় পক্ষের মধ্যে শান্তিপূর্ণ আলোচনা প্রয়োজন।’
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক ভারত-পাকিস্তান সম্পর্কের মতো বিভাজনের পথে মোড় নিতে পারে। দিল্লিভিত্তিক সাংবাদিক ভারত ভূষণ বলেন, ‘ভারতের উসকানিমূলক মন্তব্য এবং বাংলাদেশের প্রতি ভালোবাসার অভাব দুই দেশের মধ্যে বিভাজনের আশঙ্কা বাড়াচ্ছে।’
দীর্ঘদিন ধরে ভারত-পাকিস্তান সম্পর্ক বিভাজন ও কাশ্মীরের সীমান্ত সমস্যা নিয়ে উত্তেজনার সৃষ্টি করেছে। বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কও একই পথে যেতে পারে—এমন আশঙ্কা কেউ কেউ করলেও দিল্লির ইন্ডিয়া ফাউন্ডেশনের গবেষক পবন চৌরাসিয়া বলেন, ‘এটা সম্ভব নয়, কারণ বাংলাদেশের বেশির ভাগ মানুষ ভারতের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক চায়।’
ভারতের পররাষ্ট্রসচিব বিক্রম মিশ্র সম্প্রতি ঢাকা সফর করে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে আলোচনা করেছেন। যদিও সংখ্যালঘু অধিকার, সীমান্ত নিরাপত্তা এবং রাজনৈতিক অস্থিরতা নিয়ে উদ্বেগ থেকেই গিয়েছে, তবে এ আলোচনা দুই দেশের সম্পর্কে আশার আলো দেখিয়েছে ।
তাই এখন ইউনূস সরকারের উচিত সংখ্যালঘুদের প্রতি দায়িত্ব পালন করা এবং ভারতের উদ্বেগের বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করা। ভারতও বাংলাদেশের সরকার ও তার কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ চালিয়ে যাবে এবং সম্ভবত এটি গোপনে চলছে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা, সংবিধান পরিবর্তন এবং নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কারের মতো বিষয়গুলো আগামী ছয়-সাত মাসের মধ্যে নির্ধারিত হবে। যে সময়টা ভারতের জন্য পর্যবেক্ষণের সময়। এমনটাই মত আন্তর্জাতিক মহলের একাংশের।












Discussion about this post