বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের মন্তব্যের এ বার কড়া প্রতিক্রিয়া শোনা গেল ভারতের বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের মুখে। সম্প্রতি চিন সফরে গিয়ে প্রধান উপদেষ্টা বাংলাদেশকে ‘ওনলি গার্ডিয়ান অফ দ্য ওসান’ অর্থাৎ বঙ্গোপসাগরের একমাত্র অভিভাবক বলে ব্যাখ্যা করেছিলেন। সেই সঙ্গে বলেছিলেন, ভারতের উত্তর-পূর্বের সাতটি রাজ্য ল্যান্ডলক অর্থাৎ সম্পূর্ণ স্থলভাগ বেষ্টিত। তাই চিনের উচিৎ বাংলাদেশে তাঁদের অর্থনীতি প্রসারিত করা। মুহাম্মদ ইউনূসের এই মন্তব্যের জেরে ভারতে তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়। অনেকেই দাবি করতে শুরু করেন, বাংলাদেশকে এবার উচিৎ শিক্ষা দিক ভারত। যদিও ভারত সরকার সরকারিভাবে এখনও কোনও প্রতিক্রিয়া দেয়নি। কিন্তু এবার ঘুরিয়ে বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসকে এক হাত নিলেন ভারতের বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর। বর্তমানে তিনি থাইল্যান্ডের ব্যাঙ্ককে রয়েছেন বিমসটেকের সম্মেলনে। তাৎপর্যপূর্ণভাবে সেখানেই রয়েছেন বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসও। সেই সম্মেলনের একটি অনুষ্ঠানে ভারতের বিদেশমন্ত্রী বলেন, “ভারতের ৬,৫০০ কিমি উপকূল বঙ্গোপসাগর লাগোয়া। বিমসটেক গোষ্ঠীর পাঁচ সদস্যের সঙ্গে ভারতের শুধু সীমান্তের যোগ রয়েছে এমন নয়, দেশগুলির একে অপরের সঙ্গে সংযোগের মাধ্যম আমাদের দেশ। ভারতীয় উপ-মহাদেশ আসিয়ান সদস্যদের মধ্যেও সংযোগ স্থাপন করেছে। আমাদের উত্তর-পূর্বাঞ্চল নির্দিষ্ট ভাবে বিমসটেক গোষ্ঠীর জন্য কানেক্টিং হাব। উত্তর-পূর্বের সড়ক, রেলপথ, জলপথ, গ্রিড এবং পাইপলাইনের মাধ্যমে বাণিজ্য স্থাপন করতে পারে বাকি রাষ্ট্রগুলিও”। এখানেই শেষ নয়, জয়শঙ্করের সংযোজন, “ভারতের এই ভৌগোলিক অবস্থান নিয়ে নয়াদিল্লি সচেতন। প্রতিবেশী ও সদস্য রাষ্ট্রগুলির বাণিজ্যিক মালপত্রের যাতায়াতের বিষয়টিও মাথায় থাকে। নয়াদিল্লি সমন্বয়ে বিশ্বাসী কোনও স্বার্থপরতায় নয়”।
প্রসঙ্গত, একদিকে চিনে গিয়ে মুহাম্মদ ইউনূস ভারতকেই আক্রমণ করছেন, ভারতের সেভেন সিস্টার্স নিয়ে হুমকি দিচ্ছেন, নিজেদেরকে সমুদ্রের অভিভাবক বলে দাবি করছেন। অন্যদিকে তাঁরাই ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে একবার বৈঠকে বসতে চেয়ে বারবার আবদার করছে। এই মুহূর্তে বিমসটেক সম্মেলনে যোগ দিতে ব্যাঙ্ককে রয়েছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং এস জয়শঙ্কর। অন্যদিকে একই সম্মেলনে যোগ দিয়েছেন বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস এবং পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন। কিন্তু এই সম্মেলনের ফাঁকে তাঁদের মধ্যে কোনও দ্বিপাক্ষিক বৈঠকের ব্যাপারে ভারত এখনও পর্যন্ত রাজি হয়নি বলেই খবর। যদিও বাংলাদেশ বুধবারও দাবি করেছিল তাঁরা আশাবাদী ভারত ইতিবাচক সাড়া দেবে। কিন্তু বৃহস্পতিবার ভারতের বিদেশমন্ত্রীর মন্তব্য বাংলাদেশের কাছে একটা বড় ধাক্কা বলেই মনে করছেন কূটনৈতিক মহলের একটা বড় অংশ। ওয়াকিবহাল মহলের মতে, ভারতের বিদেশমন্ত্রী বুঝিয়ে দিলেন ‘ওনলি গার্ডিয়ান অফ দ্য ওসান’ আসলে ভারতই। বিশেষজ্ঞরা দাবি করছেন, ভারত যদি সাত থেকে দশ দিনের জন্য বঙ্গোপসাগরে একটা নৌ মহড়া করে এবং এর জন্য জাহাজ চলাচলের ওপর নোটাম জারি করে তাহলেই বাংলাদেশের নৌ বাণিজ্য কার্যত বন্ধ হয়ে যাবে। কারণ এই মুহূর্তে ভারতের নৌ বহরের পরিধি যতটা সমুদ্রে নৌ মহড়া দিতেও অনেক বেশি জায়গার প্রয়োজন। ফলে বঙ্গোপসাগর কার্যত স্তব্ধ হয়ে যাবে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল।
মুহাম্মদ ইউনূসের বক্তব্যকে ভারতের রাজনৈতিক মহল হাস্যকর বলেই উল্লেখ করছেন। তাঁদের বক্তব্য, শুধু সেভেন সিস্টার্স নয়, ভারতের বহু রাজ্যই সরাসরি সমুদ্রের মুখ দেখে না। যেমন, মধ্যপ্রদেশ, রাজস্থান, ঝাড়খণ্ড, জম্মু কাশ্মীর, পঞ্জাব, হরিয়ানা, উত্তরাখণ্ড, উত্তরপ্রদেশ ও বিহারের মতো রাজ্যগুলিও সমুদ্রের ধারেকাছে নেই। তাহলে কি সেই রাজ্যগুলি উন্নতি করছে না? উল্লেথ্য, মিয়ানমারে সিত্তেই সমুদ্র বন্দর তৈরি করেছে ভারত। কলকাতা বন্দর থেকে জাহাজে পণ্য সিত্তেই বন্দরে নিয়ে যাওয়া হয় এরপর কালাদান মাল্টি মোডাল প্রকল্পের আওতায় নির্মিত জলপথ ও সড়কপথে সেই পণ্য পৌঁছে যায় মিজোরামের স্থলবন্দরে। ফলে চট্টগ্রাম বা মোংলা বন্দর যদি আটকেও রাখে বাংলাদেশ, ভারত ঠিকই সেভেন সিস্টার্সে পণ্য আদানপ্রদান করতে পারবে মিয়ানমারের সিত্তেই বন্দর ব্যবহার করে।
Discussion about this post