বাক্য একটাই। কিন্তু তার অভিঘাত এতটাই মারাত্মক যে অন্তর্বর্তী সরকার প্রধানের মাথা তো বটেই, তাঁর উপদেষ্টাদের মাথা ঘুরিয়ে দেওয়ার পক্ষে যথেষ্ঠ। কী সেই বাক্য, সেটা আগে জানিয়ে দেওয়া যাক। একটি চিঠি এসেছে লন্ডন থেকে। প্রাপক যমুনাভবনের বাসিন্দা। চিঠির ভাষা বেশ স্পষ্ট এবং সরাসরি। কী আছে সেই চিঠিতে?
চিঠিতে বলা হয়েছে, ‘ফেব্রুয়ারি ২০২৬-য়ের নির্বাচন যদি প্রধান দল আওয়ামী লীগ ছাড়া অনির্বাচিত সরকারের ছায়ায় সাধারণ ভোটারের অপরিহার্য অধিকার কেড়ে নিয়ে অনুষ্ঠিত হয়, তবে সেটি নির্বাচন নয়। রাষ্ট্রীয় প্রহসন এবং সেটি অগ্রহণযোগ্য।’
এই চিঠি এসেছে লন্ডন থেকে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, গত এক দশকে এরকম কঠোর ভাষায় চিঠি কোনও সরকার পায়নি। চাপ আরও আছে। বাংলাদেশে ব্রিটেনের হাইকমিশনার সারাহ কুক তদারকি সরকারকে ‘ডেমোক্র্যাসি প্যাক’ নামে একটি প্রস্তাব পাঠিয়েছেন। যেখানে বলা হয়েছে, নির্বাচনের ৯০ দিন আগে সরকারকে সব দলের সঙ্গে বৈঠক করতে হবে। চিঠিতে বলা হয় বাংলাদেশের জাতীয় সাধারণ নির্বাচনে জাতিসঙ্ঘের পর্যবেক্ষক দল যাবে। ভোটের দিন সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতায় কোনওরকমভাবে হস্তক্ষেপ করা যাবে না।
৯০ দিন অনেক আগেই অতিক্রান্ত হয়েছে। তদারকি সরকার সব দলের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেনি। জাতিসঙ্ঘ থেকেও জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, তারা বাংলাদেশের আসন্ন নির্বাচনে কোনও প্রতিনিধিদল পাঠাবে না। আর সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা? এই সরকারের আমলে সংবাদমাধ্যম বা গণমাধ্যম কতটা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারছে, তা আর নতুন করে বলার দরকার পড়ে না। বাংলাদেশের প্রথম শ্রেণির গণমাধ্যম ‘প্রথম আলো’ জ্বলন্ত উদাহরণ। এদিকে ব্রিটেনের সংসদভবনে বাংলাদেশ নিয়ে একটি মুলতুবি প্রস্তাব আসতে চলেছে। সেখানে বাংলাদেশ সরকারকে তাদের সর্বশেষ অবস্থান জানাতে বাধ্য করা হবে। ব্রিটেন যদি ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনকে স্বীকৃতি না দেয়, তাহলে তাদের দেখাদেখি ইউরোপীয় ইউনিয়নও বাংলাদেশের পিছু ছাড়বে না। একই রাস্তায় হাঁটবে আমেরিকাও। আমেরিকা আয়োজন করতে চলেছে ডেমোক্র্যাসি সামিট। সূত্রের খবর, বাংলাদেশের নাম তালিকায় রয়েছে। তবে সেটা শেষ পর্যন্ত থাকবে কি না, সেটা নির্ভর করছে সে দেশের পরিস্থিতির ওপর। যদি তদারকি সরকারের অবস্থান এতটুকু না বদলায়, তাহলে তালিকা থেকে বাংলাদেশের নাম যে কাটা পড়বে তা নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই।
বাংলাদেশের তদারকি সরকার প্রধান তাঁর প্রিয় ‘দেশোবাসী’কে এই বলে আশ্বাস দিয়েছেন, যে ১২ ফেব্রুয়ারি ভোট হবে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ। ভোট হবে একেবারে উৎসবমুখর পরিবেশে। প্রত্যেক নাগরিক তাদের মতাধিকার প্রয়োগ করতে পারবেন। ভোটের আগে এবং ভোট-পরবর্তী পর্যায়ে কোনওভাবেই আইন-শৃঙ্খলা ভেঙে পড়তে দেওয়া যাবে না। যারা আইন নিজেদের হাতে তুলে নেওয়ার চেষ্টা করবে, সরকার তাদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ করবে। ভোটের দিন যত এগিয়ে আসছে, তদারকি সরকারের যেমন চাপ বাড়ছে, সমানভাবে চাপ বাড়ছে তদারকি সরকার প্রধানের। এই চাপ শুধু দেশের অভ্যন্তরের চাপ নয়, চাপ আসছে আন্তর্জাতিকমহল থেকেও। কিছুদিন আগে পর্যন্ত তদারকি সরকারের ওপর নানা ইস্যুতে চাপ তৈরি করে আসছিল আমেরিকা। এবার লন্ডন থেকেও সরকারের ওপর চাপ তৈরি করা হল। লন্ডন থেকে এই চিঠি আসলে নির্বাচনের বৈধতা নিয়ে আগে থেকেই প্রশ্ন তুলে রাখল।
এদিকে, ব্রিটেনের চার সাংসদ – বব ব্ল্যাকম্যান, জিম শ্যানন, জ্যাস আথওয়াল, ক্রিস ল্য যৌথভাবে একটি বিবৃতি জারি করেছেন। বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘প্রত্যেক শুভবুদ্ধি সম্পন্ন মানুষ এটা আশা করে যে ভোটের উদ্দেশ্য হবে একটি স্থিতিশীল এবং উন্নত বাংলাদেশ। সেটা তখনই সম্ভব যদি নির্বাচনে সকলে অংশগ্রহণ করতে পারে এবং সেই নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করবে নিরপেক্ষ আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক দল।’ বিবৃতিতে রাখঢাক না করেই জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে বর্তমানে তদারকি সরকার অবৈধ। তাই, সেই সরকার কোনওভাবেই বাংলাদেশের ভোট নিয়ে পক্ষপাতপূর্ণ আচরণ করতে পারে না। সেখানে এটাও বলা হয়েছে, ‘গণতান্ত্রিক নির্বাচন নির্ভর করে গ্রহণযোগ্য, অবাধ ও সুষ্ঠু প্রতিদ্বন্দ্বিতার ওপর। মানবাধিকার, আইনের শাসন ও যথাযথ প্রক্রিয়ার প্রতি শ্রদ্ধা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার অপরিহার্য উপাদান। নির্বাচনের সময় এসব মানদণ্ড ধারাবাহিকভাবে মেনে চলা হয়নি। ভোটের আগে বিরোধী দলের উল্লেখযোগ্য নেতাকর্মীদের গ্রেফতার নিয়ে আমরা উদ্বিগ্ন। ’
একটি দেশকে পরাধীনতার শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করার কাজটি যে কত কঠিন সেটা একমাত্র তাঁরাই বলতে পারবেন, যারা কাজটি করেছেন। একটি...
Read more











Discussion about this post