গত বছরের ৫ আগস্ট বাংলাদেশে রাজনৈতিক পালাবদল হয়েছিল। আওয়ামী লীগ সরকারের প্রধান শেখ হাসিনার পতন এবং অন্তর্বর্তীকালীন মুহাম্মদ ইউনূসের উত্থান। এই রাজনৈতিক পালাবদল নিয়ে বহু বিতর্ক আছে। দাবি, মার্কিন ডিপ স্টেট ও পাকিস্তানের আইএসআই বাংলাদেশে পালাবদল ঘটানোর মূল কারিগর। যদিও এই দাবিসমূহ আজ প্রমাণিত। মুহাম্মদ ইউনূস ও তাঁর সহযোগীরা এখনও বাংলাদেশের সর্বোচ্চ ক্ষমতায় আছে, আর তাঁদের মূল লক্ষ্য সে দেশের সংবিধান পাল্টে ইসলামিক দেশে পরিণত করা। এই পর্যন্ত ঠিক ছিল। কিন্তু গোল বাঁধলো বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে। নোবেলজয়ী মুহাম্মদ ইউনূস দাবি করেছিলেন তিনি বাংলাদেশকে সোনার বাংলা হিসেবে গড়ে তুলবেন। কিন্তু আদতে হল উল্টো। বাংলাদেশের মূল বাণিজ্য রেডিমেড পোশাক শিল্প ধ্বংস হতে শুরু করেছে। অন্যদিকে মুহাম্মদ ইউনূস দাবি করেছিলেন, বিদেশ থেকে বিপুল বিনিয়োগ তিনি নিয়ে আসবেন। বাংলাদেশকে প্রকৃতই সোনার বাংলা গড়বেন। কিন্তু তা হয়নি বিগত এক বছরে। কারণ, মুহাম্মদ ইউনূস বিগত ১১মাসে ১২টি বিদেশ সফর করলেও সেভাবে লগ্নি আসেনি বাংলাদেশে।
উল্লেখ্য, আগামী ১ আগস্ট থেকে কার্যকর হতে যাওয়া মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নতুন ট্যারিফ নীতির আওতায় বাংলাদেশের জন্য রফতানি পণ্যের ওপর প্রযোজ্য হতে পারে প্রায় ৫০ শতাংশ কার্যকর শুল্কহার। এই শুল্কহার নির্ধারিত হয়েছে বর্তমানে কার্যকর ১৫ শতাংশ শুল্ক এবং নতুন করে আরোপিত আরও ৩৫ শতাংশ শুল্ক মিলিয়ে। আন্তর্জাতিক ঋণমান সংস্থা ফিচ রেটিংস এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, এটা যুক্তরাষ্ট্রের সব বাণিজ্য অংশীদার দেশের মধ্যে সবচেয়ে বেশি। এমনকি বিশ্বের ছোট ছোট দেশেও এত শুল্ক চাপায়নি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। বলা হচ্ছে, তেল-গ্যাস, তামা-সহ অন্যান্য দেশকে বিশেষ শুল্কছাড় দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, বাংলাদেশ এ সুবিধা পাবে না। এমনকি বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রফতানি পণ্য রেডিমেড পোশাকও এই ছাড় পাবে না। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব শর্তের অনেকগুলো শুধু বাণিজ্য নয়, বরং কূটনৈতিক ও নীতিগত বিষয়েও যুক্ত। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এখনো ভারতের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি করেনি। এমনকি সেই চুক্তি নিয়ে খুব একটা উচ্চবাচ্যও করছে না। জানা যাচ্ছে, খুব শিগ্রই ভারতের সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একটি মিনি বাণিজ্য চুক্তি সম্পন্ন হতে পারে। পরবর্তী সময়ে বৃহত্তর বাণিজ্য শক্তি হবে। অর্থাৎ বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে ভারতবর্ষ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে মাথা নত করছে না। ফলে প্রশ্ন উঠছে কিসের ভিত্তিতে বাংলাদেশ মার্কিন গুলোকে মাথা নত করল?
আসলে মুহাম্মদ ইউনূসের কূটনৈতিক চাল পুরোপুরি ব্যর্থ। তিনি বিগত ১১ মাসে যে যে দেশে সফর করেছেন সেখান থেকে কত বিনিয়োগ আনতে পারলেন তার কোনও নির্দিষ্ট তথ্য দিতে পারেনি বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। এমনকি চীন তাকে রেড কার্পেট দিয়ে আহ্বান জানিয়েছিল। সেই চীন থেকেও সেরকম কোনো বিনিয়োগ আসেনি। জাপান গিয়েও তিনি বড় কোন বিনিয়োগ আনতে পারেননি, জানা যায় ঢাকা মেট্রোর জন্য অনেক বেশি সুদে তিনি ঋণ পেয়েছেন। যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মুহাম্মদ ইউনুসকে বাংলাদেশে পাঠিয়েছিল তারাও এখন হাত তুলে নিচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের একাংশ বলছেন, ভুটানের মতো ছোট্ট দেশেও গত বছর প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ বা এফডিআই বেড়েছে ছয় গুণ। কিন্তু বাংলাদেশে ২০২৪ সালে এফডিআই আগের বছরের চেয়ে ১৩.২৫ শতাংশ কমেছে। জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন সংস্থা তাঁদের সর্বশেষ প্রতিবেদনে জানিয়েছে, ২০২৪ সালে বাংলাদেশে এফডিআই এসেছে মাত্র ১.২৭ বিলিয়ন ডলার, যা বাংলাদেশি টাকায় ১৫ হাজার ৬২১ কোটি টাকা। সরকারি হিসেবে তা বিগত দশ বছরে সর্বনিম্ন। এই পরিস্থিতিতে বিশ্বব্যাংকের বেসরকারি খাতবিষয়ক প্রতিষ্ঠান ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্স করপোরেশনের এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, বাংলাদেশে ব্যবসায় পরিবেশ তথা বিনিয়োগের ক্ষেত্রে এখনও পাঁচটি বড় বাধা রয়েছে। এগুলো হল বিদ্যুতের সমস্যা, অর্থায়নের সীমিত সুযোগ, দুর্নীতি, অনানুষ্ঠানিক খাতের আধিক্য ও উচ্চ কর হার। বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনা করে অর্থনীতিবিদ ও বিশ্লেষকরা বলছেন, বিদেশি বিনিয়োগ কমার কারণ হিসেবে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, অর্থনীতির অস্থিতিশীলতা, ব্যবসার জন্য উপযুক্ত পরিবেশের অভাব, সেবাপ্রাপ্তিতে ভোগান্তি, জ্বালানিসংকট, ডলারসংকট, অর্থপাচার ও দুর্নীতির মতো বিষয়গুলো মূল কারণ। এর অন্যতম উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, গত বছর সুইজারল্যান্ডের দাভোসে অনুষ্ঠিত ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামে গিয়ে একাধিক বৈঠক করার পরও সুইজারল্যান্ড সরকার বাংলাদেশের জন্য বড় মাপের আর্থিক সহায়তা প্যাকেজ বাতিল করেছে। অর্থাৎ, আন্তর্জাতিক মঞ্চে একের পর এক ধাক্কা আসছে বাংলাদেশের জন্য। যা নিয়ে মুহাম্মদ ইউনূসের কোনও মাথাব্যাথা নেই। উল্টে বাংলাদেশকে তিনি ঠেলে দিচ্ছেন এক অন্ধকারময় অধ্যায়ের দিকে। অন্যদিকে, ভারতের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি করে ফেলেছে ইংল্যান্ড-সুইজারল্যান্ড-সহ ইউরোপীয় বহু দেশ। সেখানে বাদ যাচ্ছে শুধু বাংলাদেশ!












Discussion about this post