তিনি বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন উচ্চপদস্থ কর্মচারী, বর্তমানে মরক্কোতে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিযুক্ত। তিনি ফেসবুক পোস্টে সরাসরি মুহাম্মদ ইউনূসকে একজন চক্রান্তকারী হিসেবে দেগে দিয়েছেন এবং দাবি করেছেন, ষড়যন্ত্র করে ক্ষমতা দখল করেছেন ইউনূস। তাঁর এই ফেসবুক পোস্ট ঘিরে এখন গোটা বাংলাদেশে শোড়গোল পড়ে গিয়েছে। সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল তিনি এমন দিনে এই ফেসবুক পোস্ট করলেন যখন রাষ্ট্রপুঞ্জের মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস বাংলাদেশ সফরে এসেছেন। ফলে সবমিলিয়ে চরম অস্বস্তিতে মুহাম্মদ ইউনূস।
হারুন-আল-রশিদ বর্তমানে মরক্কোতে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত হিসেবে কর্মরত। সূত্রের খবর, তাঁকে গত বছরের ১১ ডিসেম্বর অবিলম্বে বাংলাদেশে ফিরে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাজে যোগ দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তিনি নানা অজুহাতে দেশে ফেরেননি। অবশেষে তিনি বাংলাদেশ সরকারের নির্দেশ অমান্য করে কানাডায় চলে যান। আর সেখান থেকেই তিনি ফেসবুকে মুহাম্মদ ইউনূসকে উদ্দেশ্য করে লম্বা-চওড়া একটা পোস্ট লেখেন। তিনি সরাসরি প্রধান উপদেষ্টার নাম উল্লেখ করে লেখেন, ডঃ ইউনূসের অধীনে নৈরাজ্যের পথে ধাবিত হচ্ছে বাংলাদেশ। বিশ্বের নিরাবতা বেদনাদায়ক। তিনি আরও লেখেন, গত ৫ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বৈধ সরকারকে উৎখাত করে ক্ষমতা দখল করেছেন ডঃ ইউনূস। প্রসঙ্গত, একজন কর্মরত কূটনৈতিক বা চাকরিতে থাকা রাষ্ট্রদূতের এমন ভূমিকা গোটা বিশ্বেই কার্যত বিরল এবং অকল্পনীয় বলে অভিমত কূটনৈতিক মহলের। যদিও বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতি জারি করে জানিয়েছে, হারুন-আল-রশিদের পাশপোর্ট বাতিলের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের কাজ শুরু করেছে। সেই সঙ্গে তাঁকে পদ থেকে সরিয়ে দেওয়ার নির্দেশিকা জারি করেছে। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে, আচমকা কেন এই রাষ্ট্রদূত সরকারি নির্দেশকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে সরকারের প্রধানকেই কাঠগড়ায় তুললেন?
হারুন-আল-রশিদের দীর্ঘ পোস্ট পড়লেই বোঝা যাবে আসল রহস্যটা ঠিক কি। তিনি লিখেছেন, ‘২০২৪ সালের ৫ আগস্ট। দেশটি তার ইতিহাসের এক অন্ধকারতম অধ্যায়ের মুখোমুখি হয়। একটি সুপরিকল্পিত সন্ত্রাসী আক্রমণ, যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বৈধ সরকারকে উৎখাত করে বাংলাদেশের ভীতকে নড়িয়ে দেয়। যখন দেশ জ্বলছিল এবং শৃঙ্খলা ভেঙে পড়ছিল, মহম্মদ ইউনূস তখন আত্মপ্রকাশ করেন দখলদার হিসেবে’। বাংলাদেশের মিডিয়া পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একাধিক সূত্র উদ্ধৃতি করে দাবি করেছে, হারুন-আল-রশিদ এবং পরিবারের পাসপোর্ট বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে। অর্থাৎ তিনি যেমন বাংলাদেশে ফিরতে পারবেন না। তেমনই কানাডা থেকে অন্য কোনও দেশেও যেতে পারবেন না। সেটা বুঝতে পেরেই হারুন-আল-রশিদ ফেসবুকে বিদ্রোহ করেছেন। আরেকটি অংশ দাবি করছেন, ওই রাষ্ট্রদূতকে সরাতে মুহাম্মদ ইউনূসের ওপর চাপ সৃষ্টি করছিল জামায়তে ইসলামী। এর কারণ মরক্কোর রাষ্ট্রদূত হারুন-আল-রশিদ অনেকটাই স্বাধীনচেতা মানুষ। তিনি নাস্তিকতায় বিশ্বাসী এবং ইসলামী রীতিনীতি মানেন না। ধর্ম বিষয়ে তাঁর মতের সঙ্গে উগ্র ইসলামপন্থীদের বিরোধ বেঁধেছে বহুবার। সেই কারণে তাঁকে সরাতে তৎপর হয়েছিল জামাত শিবির।
এও জানা যাচ্ছে, হারুন-আল-রশিদ আওয়ামী লীগ এবং শেখ হাসিনার ঘনিষ্ঠ ছিলেন না। কিন্তু ধর্ম বিষয়ে তাঁর মনোভাবের কারণেই জামাতের চক্ষুশূল হয়েছিলেন বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত। এর থেকেই বোঝা যাচ্ছে, বাংলাদেশ কোন পথে যাচ্ছে। সরকারের ওপর উগ্র ইসলামী ভাবধারা চাপিয়ে দিতে মরিয়া জামায়তে ইসলামী। ওই নির্বাসিত রাষ্ট্রদূতও সেই ইঙ্গিত করেছেন তাঁর ফেসবুক পোস্টে। অন্যদিকে নজিরবিহীন আক্রমণ করেছেন মুহাম্মদ ইউনূসকেও। কিন্তু একজন কর্মরত রাষ্ট্রদূত সরকারের প্রধানকে আক্রমণ করেছেন এমন একটা সময়, যখন রাষ্ট্রপুঞ্জের মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতারেজ বাংলাদেশ সফরে রয়েছেন। খুব কৌশলে হারুন-আল-রশিদ বিশ্বের দৃষ্টি আকর্ষণ করাতে সক্ষম হলেন বলেই মনে করছেন ওয়াকিবহাল মহল। তিনি তাঁর ফেসবুক পোস্টের মাধ্যমে নিজেকে ‘নির্যাতিত কূটনীতিক’, ‘নির্বাসিত ঔপন্যাসিক’ ও ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন, যা মূলত বিদেশে সহানুভূতি অর্জনের অভিপ্রায়ে করা হয়েছে। একই সঙ্গে তিনি মুহাম্মদ ইউনূসের মুখোশ খুলে দেওয়ার মতো একের পর এক অভিযোগ করে গিয়েছেন।
বাংলাদেশের গণ অভ্যুত্থানের প্রসঙ্গে তিনি লেখেন, ‘এই ঘটনা ইতিহাস কীভাবে মনে রাখবে? হয়তো সবচেয়ে ভয়াবহ এবং সফল সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড—যা এক রাতের মধ্যে গোটা দেশকে বদলে দিয়েছে। তাঁর আক্রমণ থেকে রেহাই পাননি বিদেশে থাকা বাংলাদেশী ইউটিউবাররাও। হারুন-আল-রশিদ লিখেছেন, এটি, একটি সন্ত্রাসী আন্দোলনের উত্থান, এক পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র। বছরের পর বছর ডিজিটাল সন্ত্রাসীরা বাংলাদেশে উগ্রপন্থার বিস্তার ঘটিয়েছে। তাঁরা অনলাইনে সরকারের বিরুদ্ধে মিথ্যা প্রচার চালিয়ে অস্থিরতা সৃষ্টি করে। উল্লেখ্য, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও ঘুরিয়ে স্বীকার করেছেন শেখ হাসিনার পতনের পিছনে একটা আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র ছিল। এবার বাংলাদেশের এক রাষ্ট্রদূতও সেই অভিযোগ করলেন। সবমিলিয়ে মুহাম্মদ ইউনূস চরম অস্বস্তিতে পড়লেন এ কথা বলাই বাহুল্য।
https://www.facebook.com/permalink.php?story_fbid=pfbid024m5ERec8QFxEzezDVVa4uGAzFDxFrUC9uJEA2bebN3JA93mDfD5LbzJZutdp1ZFKl&id=100024517820898&rdid=iQgCu2RoTJ5AJWRp#
Discussion about this post