সত্যিটা অনেক বেশি ভয়াবহ। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন, জামায়তে ইসলামী, বর্তমান জাতীয় নাগরিক পার্টির নেতারা এবং হাসিনা বিরোধী গণঅভ্যুত্থানের সঙ্গে জড়িত অন্যান্য জিহাদি সংগঠনগুলি ঠিক কি চাইছেন মুহাম্মদ ইউনূসের কাছ থেকে? এর উত্তর খুঁজতে গেলে যেটা বেরিয়ে আসবে, সেই সত্যিটা সত্যই অতি ভয়াবহ। বিগত, দশ মাসে বাংলাদেশে যা যা হচ্ছে, সেগুলিকে একটা সরলরেখায় টানা যায়, তাহলেই বোঝা যাবে আগামীদিনে কোন জায়গায় পৌঁছতে চাইছেন মুহাম্মদ ইউনূস এবং তাঁর সহযোগীরা। গত বছরের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের পর থেকে আইন প্রয়োগকারী কর্মকর্তা, আওয়ামী লীগ সমর্থক এবং ধর্মীয় সংখ্যালঘু-সহ শত শত মানুষের প্রাণহানি ঘটেছিল। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, পুলিশ ও প্রশাসনের একটা বড় অংশ এখন মুহাম্মদ ইউনূসের হাতে বন্দি। এটা একটা অশুভ ইঙ্গিত দিয়ে চলেছে। কি সেই ইঙ্গিত? উত্তরটা হল, বাংলাদেশ ধীরে ধীরে একটি উগ্র ইসলামী খিলাফতের অন্ধকার অতল গহ্বরে তলিয়ে যাচ্ছে। আর এই রূপান্তরের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে জুলাই ঘোষণাপত্র বা জুলাই সনদ।
মুহাম্মদ ইউনূস দেশের বিদ্যমান ১৯৭২ সালের সংবিধান বাতিল করে নিজেকে তথাকথিত ‘দ্বিতীয় প্রজাতন্ত্রের’ একজন নিষ্ঠুর ‘সুলতান’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার দিকে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছেন। জুলাই ঘোষণাপত্র কার্যকর করার মাধ্যমে মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে বিপ্লবী সরকারে রূপান্তরিত করবে বলেই মনে করছেন বাংলাদেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ। ১৯৭২ সালের সংবিধান বাতিল হয়ে গেলে মুহাম্মদ ইউনূস ও তাঁর সহযোগীরা রাষ্ট্রপতি মুহাম্মদ শাহাবুদ্দিন চুপ্পু এবং সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার উজ জামানকে বরখাস্ত করতে পারে। এর ফলে বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীকে তাঁদের পরিকল্পিত “ইসলামিক বিপ্লবী সেনাবাহিনী” দ্বারা প্রতিস্থাপন করার জন্য অবাধ কর্তৃত্ব অর্জন করবেন। বিশেষজ্ঞরা দাবি করছেন, সেই বাংলাদেশ খোমেনির ইরান, পাকিস্তানের সামরিকা প্রভাবিত ইসলামবাদ বা এরদোগানের স্বৈরাচারী তুরস্কের চেয়েও অনেক বেশি নিপীড়ক ও নিষ্ঠুর হবে।
মুহাম্মদ ইউনূস ঈদের প্রাক্কালে শুভেচ্ছা ভাষণেই জানিয়েছেন, আগামী জুলাই মাসেই জুলাই সনদ বা ঘোষণাপত্র ঘোষণা করা হবে। তাঁর দাবি, এই সনদ একটি “কল্যাণমুখী রাষ্ট্রের” ভিত্তি স্থাপন করবে, এবং স্বাক্ষরকারীরা এর আমূল সংস্কার বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দেবে।
মস্তিস্কের ওপর একটু জোর দিলেই মনে পরে যাবে, মাত্র কয়েক মাস আগে, ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে, ইউনূসের প্রেস অফিস জুলাই ঘোষণার সাথে কোনও সম্পর্ক থাকার কথা তীব্রভাবে অস্বীকার করেছিল। এবং এটিকে “অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সাথে সম্পর্কিত নয় এমন একটি ব্যক্তিগত উদ্যোগ” বলে অভিহিত করেছিল। বিশ্লেষকদের মতে, সেটা ছিল কৌশলগত বিভ্রান্তি ছড়ানোর উদ্যোগ। কিন্তু মুহাম্মদ ইউনূসের সহযোগীরা স্পষ্টবাদী। যেমন, জাতীয় নাগরিক পার্টির অন্যতম সংগঠক হাসনাত আবদুল্লাহ জুলাইয়ের ঘোষণাপত্রকে আওয়ামী লীগকে অপ্রাসঙ্গিক করে তোলার একটি হাতিয়ার হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন এবং এটিকে ১৯৭২ সালের মুজিববাদী সংবিধানের সমাধি” হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন। আরেকজন এনসিপি নেতা, সারজিস আলম, বলেছিলেন যে এই ঘোষণাপত্রটি “ভবিষ্যতের শাসনব্যবস্থার জন্য একটি নির্দেশিকা” হিসেবে কাজ করবে এবং “সকল বাংলাদেশির আশা ও আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটাবে”। জামাত নেতারা কিছু না বললেও তাঁরা এই জুলাই ঘোষণাপত্র তৈরি করার মূল কারিগর বলেই মনে করছেন তথ্যাভিজ্ঞ মহল।
জুলাই ঘোষণাপত্র নিয়ে কেন এত তাড়াহুড়ো? মুহাম্মদ ইউনূস এবং এনসিপি নেতাদের আশঙ্কা, ভবিষ্যতে নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় এলে ইউনূস এবং তার ইসলামপন্থী চক্রের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহ এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ আনা হতে পারে। উল্লেখ্য, ২০২৫ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি জাতিসংঘের মানবাধিকার অফিসের এক প্রতিবেদনের ষষ্ঠ অধ্যায়ে বলা হয়েছিল, ইউনূসের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করা চরমপন্থী গোষ্ঠীগুলি রাষ্ট্রকে পঙ্গু করে দেওয়ার এবং রাজনৈতিক দখলদারিত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য সহিংস প্রচারণা চালিয়েছিল। ওই প্রতিবেদনে জিহাদি গোষ্ঠীগুলির দ্বারা সংঘটিত গণপিটুনি, লক্ষ্যবস্তু হত্যা এবং নৃশংস সহিংসতার ভয়াবহ বিবরণ দেওয়া হয়েছে।
দি ইউরোয়েশিয়ান টাইমসের এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, জাতিসংঘের এই প্রতিবেদন প্রকাশের পর, মুহাম্মদ ইউনূসের প্রশাসন ইচ্ছাকৃতভাবে ষষ্ঠ অধ্যায়টি দমন করে এবং পূর্ববর্তী আওয়ামী লীগ সরকারের সমালোচনাকারী অংশগুলিকে আলাদা করে ফেলে। বিপুল আর্থিক সম্পদের সহায়তায়, ইউনূস দেশীয় এবং আন্তর্জাতিকভাবে একটি সমন্বিত মিডিয়া এবং জনসংযোগ অভিযান শুরু করে। যার মাধ্যমে তিনি তাঁর প্রশাসনকে ন্যায়বিচারের আলোকবর্তিকা হিসেবে উপস্থাপন করেন এবং নিজের অপরাধ গোপন করেন। দি ইউরোয়েশিয়ান টাইমসে লেখক আরও দাবি করেছেন, ক্রমাগত অস্বীকার সত্ত্বেও, বিভিন্ন তথ্যপ্রমাণ নিশ্চিত করে যে জুলাই ঘোষণাটি ইউনূস এবং তার শক্তিশালী সমর্থকদের, বিশেষ করে মার্কিন ডিপ স্টেট এবং পাকিস্তানের ইন্টার-সার্ভিসেস ইন্টেলিজেন্স বা আইএসআইয়ের একটি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার অংশ। তাদের উদ্দেশ্যই ছিল, মুহাম্মদ ইউনূসকে প্রক্সি হিসেবে ব্যবহার করে বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল করতে, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলিকে ভেঙে ফেলতে এবং দেশের কৌশলগত ও ভূ-রাজনৈতিক সম্পদের উপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ অর্জনের করা। এখনও পর্যন্ত তাঁরা এই কাজে সফল। এবার জুলাই ঘোষণাপত্র একবার জারি হয়ে গেলেই কেল্লাফতে। মাঝে একমাত্র বাঁধা বিএনপি ও সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার উজ জামান। ওয়াকিবহাল মহলের মতে, জুনের বাকি সপ্তাহ এবং জুলাই মাসে বাংলাদেশে নাটকীয় এবং অভূতপূর্ব রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হতে পারে।












Discussion about this post