বর্তমান পরিস্থিতিতে সংবাদ শিরোনামে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিবের বিদায় নিয়ে শুরু হয়ে গিয়েছে দ্বন্দ্ব নাটক বিতর্ক। উঠে আসছে একের পর এক রাষ্ট্রদূতের নিকেশ হওয়ার নির্দেশ! কি পরিস্থিতি এখন দেশের প্রাণকেন্দ্রে? এর পিছনে রয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও প্রধান উপদেষ্টার দপ্তরের দ্বন্দ্ব যেটি এখন ওপেন সিক্রেট। আর এই দ্বন্দ্বে প্রধান উপদেষ্টা দপ্তরের হয়ে ভূমিকা নিচ্ছে যতই নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমান আর তাকে সহায়তা করছে পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা কমিটির অন্য দুই উপদেষ্টা।
সম্প্রতি বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে শুরু হয়েছে অস্থির পরিস্থিতি। মন্ত্রণালয়ের সচিব জসীমউদ্দীনকে সরিয়ে দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার পর থেকেই এই খবর প্রকাশ্যে আসতে শুরু করে। ২২শে মে একটি অফিসিয়াল বিবৃতি দিতে বলা হয়েছে মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন পররাষ্ট্র সচিব পদ থেকে সরে গিয়েছেন। পরবর্তী আদেশ না আসা পর্যন্ত মুহাম্মদ জুহুল আলম সিদ্দিকী ভারপ্রাপ্ত সচিব হিসেবে কাজ করবেন। ওয়াশিংটনে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত আসাদ আলম সিয়ামকে পরবর্তী পররাষ্ট্র সচিব হিসেবে নিয়োগ করার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তিক সরকার। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না হওয়া পর্যন্ত ভারপ্রাপ্ত সচেতন হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন জহুল আলম সিদ্দিকী। এছাড়াও তিনি আগামী 20 জুন অবসর গ্রহণ করবেন তাই তিনি আগামী এক মাসেরও কম সময়ের জন্য ভারপ্রাপ্ত পররাষ্ট্র সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালনে নিয়োজিত থাকবেন।
তবে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই রদ বদলের একদিন আগে, অন্তর্বর্তী সরকারের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন বলেছিলেন, মোঃ জসিম উদ্দিন আর পররাষ্ট্র সচিব পদে থাকছেন না। তার ক্ষেত্রে অপসর্গের কোন বিষয় নেই তিনি সম্পূর্ণ নিজ ইচ্ছায় এই পথ থেকে সরে যাচ্ছেন।
কিন্তু যে দাবি করা হচ্ছে যে পররাষ্ট্র সচিব জসিম উদ্দিনকে ইচ্ছাকৃত সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে সেই দাবির পিছনে রয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও প্রধান উপদেষ্টা দপ্তরের গভীর দ্বন্দ্ব। অর্থাৎ এই রদবদল শুধু একজন কর্মকর্তা পরিবর্তন নয়, এটি যে অন্তর্বর্তী সরকারের কূটনৈতিক কৌশলের প্রতিফলন, তা পর্যবেক্ষকেরা জানেন।
কূটনৈতিক সূত্রমতে, মিয়ানমারের রাখাইনের ভেতরে মানবিক করিডর গঠনের যে প্রস্তাব জাতিসংঘ ও জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমানের মাধ্যমে এসেছিল, সেটি নিয়ে জসীম উদ্দিন বেঁকে বসেছিলেন। তাঁর আশঙ্কা ছিল, এটি বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকি হতে পারে এবং এতে সীমান্তবর্তী অঞ্চলে অ-রাষ্ট্রীয় সশস্ত্র গোষ্ঠীর অনুপ্রবেশের ঝুঁকি আছে। অর্থাৎ তিনি জানিয়েছিলেন, ‘প্রত্যাবাসনের বিনিময়ে এই মানবিক করিডরের পরিকল্পনা রোহিঙ্গাদের অনুপ্রবেশকেই উৎসাহিত করবে।’
আরো একটি কারণ, গত ১৭ এপ্রিল ঢাকায় জসীমউদ্দীনের নেতৃত্বে পাকিস্তানের সঙ্গে অনুষ্ঠিত হয় পররাষ্ট্র পর্যায়ের একটি সভা । ওই সভায় পররাষ্ট্র সচিব জসীমউদ্দীন সরাসরি,১৯৭১ সালের পূর্বে অখণ্ড পাকিস্তানের জাতীয় সম্পদ থেকে বাংলাদেশের প্রাপ্য ৪.৩২ বিলিয়ন ডলার এবং ১৯৭০ সালের ভোলার ঘূর্ণিঝড়ে পূর্ব পাকিস্তানের জন্য ঘোষিত ২০০ মিলিয়ন ডলারের বৈদেশিক অনুদান ফেরতের দাবি জানায়। এই ধরনের আগ্রাসী কূটনৈতিক অবস্থান একেবারেই মেনে নিতে পারেনি পাকিস্তান এবং ঢাকার একটি অংশ। কারণ বাংলাদেশে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার দীর্ঘদিন ধরে পাকিস্তানের সঙ্গে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক তৈরির জন্য সক্রিয় ছিল। ঠিক এই কারণে মোঃ জসিম উদ্দিনের এই মৌলিক অধিকার সংক্রান্ত দাবিতে না করাই শ্রেয় বলে মনে করা হচ্ছে বাংলাদেশেরই একাংশের তরফে।
তবে পররাষ্ট্র সচিব জসীম উদ্দিনের সরে যাওয়া বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির ভবিষ্যৎ কৌশলের গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যায় হতে পারে । বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, জসীম উদ্দিনের অপসারণ কেবল একজন কূটনীতিকের দায়িত্ব বদলের বিষয় নয়, এটি পরিবর্তিত পররাষ্ট্রনীতির ইঙ্গিতও বহন করছে। ইউনূসের বাংলাদেশ কীভাবে দেশের ভবিষ্যৎ এগিয়ে নিয়ে চলে, এখন সেটাই দেখার।












Discussion about this post