“যেতে পারি, যে কোনও দিকেই আমি চলে যেতে পারি। কিন্তু কেন যাব? … কিন্তু, এখনই যাব না। তোমাদেরও সঙ্গে নিয়ে যাবো। একাকী যাব না অসময়ে। ”
বাংলাদেশে হাসিনার প্রত্যাবর্তনের প্রশ্নের সঙ্গে শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের “যেতে পারি কিন্তু কেন যাব”কবিতা উজ্জ্বল উদাহরণ হতে পারে। হাসিনা যে দেশে ফিরবেন, তা নিয়ে কিন্তু কোনও সন্দেহ নেই। কিন্তু তাঁর ফেরার থেকেও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন কেন তিনি ফিরবেন। উত্তর তিনি দিয়েছেন ভারতের একটি গণমাধ্যমকে। সেই উত্তরের গর্ভে রয়েছে বাংলাদেশে হাসিনার প্রত্যাবর্তনের গূঢ় উদ্দেশ্য। এই সাক্ষাৎকার তিনি দিলেন এমন একটা সময় যখন বাংলাদেশের নির্বাচন আর মাত্র দু সপ্তাহ বাদে। বঙ্গবন্ধু কন্যা দিল্লিতে থাকাকালীন তিনি একাধিকবার বিভিন্ন গণমাধ্যমে সাক্ষাৎকার দিয়েছেন। সেই সব সাক্ষাৎকারের থেকে সর্বশেষ সাক্ষাৎকারের তফাৎ আকাশ-পাতাল। অতীতে তাঁর সাক্ষাৎকারের নিশানায় মূলত ছিলেন তদারকি সরকার প্রধান ইউনূস। সর্বশেষ সাক্ষাৎকারটিকে ইউনূসকে তিনি যেমন নিশানা করেছেন, পাশাপাশি তিনি জানিয়ে দিয়েছেন, বাংলাদেশে ফিরে তাঁর প্রধান এবং প্রথম কর্তব্য কী হবে।
শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের এই কবিতার উল্লেখ করা হয়েছে অসময়ের কথা। বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্তিতি হাসিনার প্রত্যাবর্তনের জন্য মোটেই শুভ নয়। তিনি এখন এক দানবের সঙ্গে লড়াই করার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন। অনেকটাই এরকম ‘দানবের সাথে যারা সংগ্রামের তরে, প্রস্তুত হতেছে ঘরে ঘরে।’ এই লড়াইয়ে তিনি একা নন, লড়াইয়ে সামিল তাঁর দলের সহযোদ্ধারা। ভারত তাঁকে বাড়িয়ে দিয়েছে সাহায্যের হাত।
ভারতের গণমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে কিন্তু একবারের জন্য হাসিনাকে প্রশ্ন করা হয়নি তিনি কবে ফিরবেন। প্রশ্ন করা হয়েছিল দেশে ফেরার পর তাঁর প্রথম কাজ কী হবে। তিনি যে উত্তর দিয়েছেন, সেটা একটা রাজনৈতিক ইঙ্গিত। উত্তরে তিনি জামাত, আওয়ামী লীগ, বিএনপি, নির্বাচন এই নিয়ে হাসিনা যা বললেন, তা কিন্তু কোনও সাধারণ বক্তব্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। বরং এটি হয়ে উঠেছে ভবিষ্যৎ রাজনীতির এক স্পষ্ট রূপরেখা। প্রশ্ন এই সাক্ষাৎকার কি হাসিনার ফেরার বার্তা? না কি বিএনপির জন্য মেরুকরণের সংকেত? এই সাক্ষাৎকারে সব থেকে অস্বাভাবিক বিষয়টা ছিল প্রশ্নের ধরণ। যাকে প্রশ্ন করা হয়েছে তিনি কোনও বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী নন। তিনি এখনও ভারতে রয়েছেন। ভারতে বসেই তিনি দিয়েছেন বিশেষ সাক্ষাৎকার। বাংলাদেশের আদালতে তিনি মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত। তাঁর দল আওয়ামী লীগকে রাষ্ট্রীয়ভাবে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে স্বাভাবিক প্রশ্ন হত – আপনি কবে ফিরবেন? বা আদৌ ফিরতে পারবেন কি না? কিন্তু প্রশ্নটা সে পথে যায়নি। জি- টুয়েন্টি ফোরকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে হাসিনার কাছে জানতে চাওয়া হয়েছে দেশে ফেরার পর তিনি কী করবেন? জবাবে হাসিনা বলেন, “আমার প্রথম এবং সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার হবে, সংবিধান সম্মত শাসনব্যবস্থা ও আইনের শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠা। গত কয়েক মাস ধরে বাংলাদেশ কার্যত আইনের বাইরে চলে গিয়েছে। মব সন্ত্রাস, বিচারবহির্ভূত গ্রেফতার, গণহারে আটক – গোটা গণতান্ত্রিক কাঠামো ভেঙে দেওয়া হয়েছে। আজ প্রায় এক লক্ষ ৫২ হাজার মানুষ মিথ্যা মামলায় কারাবন্দি, যাঁদের অনেকেই নির্মম নির্যাতনের শিকার। তাঁদের অবিলম্বে মুক্তি দেওয়া জরুরী।” এর পাশাপাশি হাসিনা আরও বলেন, “ইউনূস যে সর্বনাশ করে গিয়েছে, তার মেরামতি করতে হবে। দ্রুতগতির অর্থনীতি থমকে গিয়েছে। বিদেশি বিনিয়োগ প্রায় বন্ধ। যুবসমাজ, কৃষক, শ্রমিক – কারও জন্য কাজ নেই। রাষ্ট্রের ধর্মনিরপেক্ষ ভিত্তি আক্রান্ত। সংখ্যালঘুরা প্রতিদিন আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন। দেশে আজ আইনের শাসন নেই। আছে শুধু মব সন্ত্রাস। ” এই সাক্ষাৎকার থেকে একটা বিষয় স্পষ্ট যে হাসিনা ফিরছেন। আজ হোক বা কাল। এই সাক্ষাৎকার আরও একটি প্রশ্ন তুলে দিচ্ছে। সেই প্রশ্ন হল এটা কি নিছক সাংবাদিকতা? না কি বার্তা পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব। শেখ হাসিনার অবস্থান কি? অবসর না প্রস্তুতি?
এই সাক্ষাৎকারে আরও যে বিষয়টি উল্লেখযোগ্য, তা হল হাসিনা জানিয়েছেন সব দলের অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচন। সেই নির্বাচনে ফলাফল আওয়ামী লীগের বিপক্ষে গেলেও তিনি মেনে নেবেন। বসবেন বিরোধীনেতা হিসেবে। আর জয়ী হলে তিনি দুঃশাসন থেকে দেশকে মুক্ত করবেন।












Discussion about this post