বাংলাদেশে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর সে দেশে একটি স্থায়ী মন্ত্রিসভা গঠিত হয়েছে। বিএনপি একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার পর সরকারের প্রধান বা বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন তারেক রহমান। তাঁর সঙ্গেই ২৫ জন পূর্ণমন্ত্রী এবং ২৪ জন প্রতিমন্ত্রী শপথ নিয়েছেন বাংলাদেশে। এরমধ্যে একজন এমন মন্ত্রী আছেন, যিনি সদ্য সমাপ্ত নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেননি, আবার আগের ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টাও ছিলেন। যাকে ঘিরে বাংলাদেশের রাজনৈতিক মহলে চলছে নানান বিতর্ক। তবে, শুধু খলিলুর রহমান নয়, বিতর্কের মধ্যে রয়েছেন বিএনপির আরও দুই মন্ত্রী। রাজনৈতিক মহলের চর্চা, এই তিনজনই নাকি ভারতের প্রেসক্রিপশনে মন্ত্রিসভায় ঠাঁই পেয়েছেন বা এরা প্রত্যেকেই নাকি ভারতের অত্যন্ত ঘনিষ্ট। আসুন একটু এই তিনজনের বিষয়ে একটু আলোচনা করা যাক।
বাংলাদেশের নতুন পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান. তিনি ছিলেন অন্তর্বর্তী সরকারের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা। যদিও সে সময় খলিলুর রহমানের নাগরিকত্ব নিয়েও প্রশ্ন উঠেছিল। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক, বিএনপির নেতারাও সে সময় এই অভিযোগ তুলেছিলেন। তাদের দাবি ছিল, খলিলুর দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করেন। সেকারণে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক। এমনকি অন্তর্বর্তী সরকার বিদায় নেওয়ার কয়েকদিন আগে ওই সরকারের প্রধান উপদেষ্টাসহ অন্য উপদেষ্টারা তাদের সম্পদের যে হিসাব প্রকাশ করেছেন, তাতে দেখা যায়, খলিলুর রহমানের সম্পদের বেশিরভাগই বিদেশে। তাহলে কেন খলিলুরকে মন্ত্রিসভায় ঠাঁই দিলেন তারেক রহমান। এরমধ্যেই কেউ কেউ দাবি করছেন, নাগরিকত্ব না নিয়ে খলিলুর রহমান যুক্তরাষ্ট্রের গ্রিনকার্ড নিয়েছেন। আর তার মাধ্যমেই খলিলুর যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করছিলেন। উল্লেখ্য, গ্রিন কার্ডের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র বিভিন্ন আয়ের স্তরের অভিবাসীদের সে দেশে স্থায়ীভাবে বসবাস ও কাজ করার অনুমতি দেয়। বিএনপি তাঁকে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদের দায়িত্ব দেওয়ায় নানা প্রশ্ন উঠছে। যদিও তাঁর দাবি, আমি তো নিজের ইচ্ছায় মন্ত্রী হইনি, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আমাকে এই গুরু দায়িত্ব দিয়েছেন।
অন্যদিকে বিএনপির স্থায়ী কমিটি’র সদস্য ও বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীকে বাংলাদেশের অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এই আমীর খসরু দীর্ঘদিন ধরেই ভারতের সঙ্গে সম্পর্কে রয়েছেন। এমনকি তিনি ঘনঘন ভারতে আসেন এমনকি কিছু নামী ভারতীয় থিঙ্ক-ট্যাঙ্ক আয়োজিত ইন্টারেক্টিভ সেশনে যোগ দিতে দেখা যায় তাঁকে। এর আগে ২০১৮ সালের জুন মাসে তিনি তিন সদস্যের প্রতিনিধি দল নিয়ে ভারত সফর করেছিলেন। আবার কয়েকমাস আগেই আমীর খসরুর একটি ছবি সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়েছিল, যেখানে দেখা গিয়েছিল ওই শীর্ষ বিএনপি নেতা ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহর সঙ্গে কথা বলছেন। বাংলাদেশের রাজনৈতিক মহলের অনেকেরেই দাবি, ভারতের সঙ্গে বিএনপির সেতুবন্ধনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা নিয়েছেন এই আমীর খসরু। তাঁকেই দেওয়া হয়েছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রিত্ব। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক নীতি নির্ধারণের কেন্দ্রবিন্দু হল অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়। যদিও আমীর খসরু এই বিষয়ে একজন বিশেষজ্ঞ বলেই জানা যায়।
এরপরেই আসছে সালাহউদ্দিন আহমেদের নাম। তিনি কয়েকদিন আগেই শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ নিয়ে একটা দাবি করেছিলেন। কিন্তু দিন দুয়েকের মধ্যেই একশো আশি ডিগ্রি ঘুরে তিনি পাল্টা দাবি করেন। এই শালাউদ্দিন আহমেদকে ২০১৫ সালের ১০ মার্চ রাতে রাজধানীর উত্তরার একটি বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছিল। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরাই তাঁকে উঠিয়ে নিয়ে যায় বলে বিএনপি অভিযোগ করেছিল সে সময়। কিন্তু দুই মাস পর ভারতের মেঘালয় রাজ্যের শিলংয়ে সালাহউদ্দিনকে পাওয়া যায়। তারপর থেকে দীর্ঘ ৯ বছর তিনি ভারতের শিলংয়ে ছিলেন। এরপর বাংলাদেশের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ১১ আগস্ট তিনি দেশে ফেরেন। তারপর বিগত দেড় বছরে তিনিই বিএনপির অন্যমত শীর্ষ নেতা হিসেবে দায়িত্ব পালনের পর তারেক রমহানের মন্ত্রিসভায় সালাউদ্দিন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের গুরু দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তাঁর হাতেই এখন বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার গুরু দায়িত্ব।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ওয়াকিবহাল মহলের মতে, এই তিনজনই ভারতের সঙ্গে সংশ্লিষ্টা রয়েছে। এর আগেও তাঁরা ভারতের হয়ে বক্তব্য রেখেছেন বা ভারতের সঙ্গে তাঁদের কোনও না কোনও ভাবে যোগাযোগ ছিল। যেমন খলিলুর রহমান গত বছর নয়া দিল্লিতে ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত ডোভালের সঙ্গে একান্ত বৈঠকও করে গিয়েছেন। আমীর খসরু বা সালাউদ্দিন আহমেদও ভারতের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা রেখে চলেছেন। তাৎপর্যপূর্ণভাবে এই তিনজনই তারেক মন্ত্রিসভার গুরুত্বপূর্ণ তিনটি পদে জায়গা পেলেন। এটা কি রাজনৈতিক পুনর্বাসন নাকি এর পিছনে রয়েছে আন্তর্জাতিক কোনও কৌশলগত সমীকরণ। যেখানে দীর্ঘ ১৭ বছর কারাবাসে থাকার পর বিএনপি জমানার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর এবার ভোটে জিতেও মন্ত্রীত্ব পাননি। আবার বিএনপির সিনিয়র নেতা রুহুল কবীর রিজভীও মন্ত্রীত্ব পাননি। এই দুজনই ঘোষিতভাবে ভারতবিরোধী বলে পরিচিত। সবমিলিয়ে এটাই মনে করা হচ্ছে, এবারে তারেকের মন্ত্রিসভা গঠিত হয়েছে ভারতের প্রেসক্রিপশনেই।












Discussion about this post