সলতানাত-ই-বাংলা, যা ছিল একটি স্বাধীন মুসলিম রাজ্য। এর স্থায়ীত্বকাল ছিল ১৩৫২ থেকে ১৫৭৬ সাল পর্যন্ত। মধ্যযুগে দক্ষিণ এশিয়ার একটি শক্তিশালী রাজ্য ছিল এটি। একে ‘শাহী বাঙ্গালা’ নামেও অভিহিত করা হয়েছে ইতিহাসে। আজকের বাংলাদেশকে রেখে দক্ষিণ-পশ্চিমে বিহার-ওড়িশা, দক্ষিণ-পূর্বে আরাকান ও পূর্বে ত্রিপুরা পর্যন্ত এর প্রভাব ছিল। হোসেন শাহী বংশের শাসনামলে বাংলা সালতানাত নিজের শক্তির শীর্ষে পৌঁছায়। সর্বাধিক পরিচিত বংশগুলির মধ্যে ছিল ইলিয়াস শাহী, গণেশ বংশ এবং হোসেন শাহী বংশ। বাংলা সালতানাত ছিল একটি সুন্নি মুসলিম শাসিত রাজ্য যেখানে বাঙালি, তুর্কী-পারস্য, আফগান এবং আবিসিনিয়ান অভিজাত শ্রেণীর প্রভাবও লক্ষ্য করা যেত। সেই সময় অতিবাহিত করার পর অনেক ভাঙা গড়ার মধ্যে দিয়ে আজ এর অস্তিত্বই নেই। তবে বর্তমানে বাংলাদেশে মুহাম্মদ ইউনূসের শাসনকালে এক শ্রেণির কট্টর মৌলবাদী সংগঠন নতুন করে সলতানাত-ই-বাংলা গঠনের স্বপ্ন দেখছে। যা ভারতের গোয়েন্দা সংস্থাগুলির মাথা ব্যাথার অন্যতম কারণ।
জানা যাচ্ছে, ঢাকার ‘সালতানাত-ই-বাংলা’ নামক একটি কট্টরপন্থী ইসলামিকগোষ্ঠী, যা ‘তুর্কি যুব ফেডারেশন’ নামক একটি তুর্কি এনজিও দ্বারা সমর্থিত, তাঁরাই এর জোরদার প্রচার করছে। এর প্রভাব এতটাই যে বাংলাদেশের তরুণ শিক্ষার্থী এবং মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের মধ্যে ব্যাপকভাবে সংক্রমিত হয়েছে। জুলাই আন্দোলন এবং আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশে মুহাম্মদ ইউনূসের যে অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় এসেছে, তাঁরা কট্টরপন্থী মুসলিম সংগঠনগুলিকে উৎসাহিত করছে। ফলে বাংলাদেশে ইসলামিক চরমপন্থা নতুন করে মাথাচাড়া দিয়েছে। যা পূর্বতন শেখ হাসিনার আমলে কার্যত গর্তে ঢুকে গিয়েছিল। ওয়াকিবহাল মহলের মতে, “বৃহত্তর বাংলাদেশ” হল একটি উগ্র ধারণা যার মধ্যে ভারতীয় ভূখণ্ডের একটি বিশাল অংশ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। মাস কয়েক আগেই, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-ছাত্র কেন্দ্রের ভিতরে সলতানাত-ই-বাংলা নামে বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন ‘বৃহত্তর বাংলাদেশ’-এর একটি মানচিত্র উন্মোচন করেছিল। সেই মানচিত্র নিজের সোশ্যাল মিডিয়া পেজে শেয়ার করে বিতর্ক বাড়িয়েছিলেন হাসিনা হঠাও আন্দোলনের মেটিকুলাস ডিজাইনের মাস্টারমাইন্ড তথা বাংলাদেশের অন্যতম উপদেষ্টা মাহফুজ আলম। যদিও কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তিনি সেটা ডিলিট করেন।
এর কয়েকমাস পর সেই মানচিত্র প্রকাশ্যে এল মুহাম্মদ ইউনূসের হাত ধরে। সম্প্রতি বাংলাদেশ সফরে এসেছলেন পাকিস্তানি সশস্ত্র বাহিনীর জয়েন্ট চিফস অফ স্টাফ কমিটির চেয়ারম্যান জেনারেল সাহির শামশাদ মির্জা। তাঁর হাতে ‘আর্ট অফ ট্রায়াম্ফ’ নামে একটি শিল্পকর্মের সংকলন উপহার তুলে দেন বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস। পাক জেনারেলকে দেওয়া এই উপহারের প্রচ্ছদে বাংলাদেশের একটি মানচিত্র রয়েছে। সেটিই ‘বৃহত্তর বাংলাদেশ’-এর মানচিত্র বলে মনে করা হচ্ছে। এই মানচিত্রে ভারতের সেভেন সিস্টার্স-সহ ভারতের বেশ কিছুটা অংশ বাংলাদেশের ম্যাপে দেখানো হয়েছে। ফলে প্রশ্ন উঠছে, মুহাম্মদ ইউনূস কি জেনে বুঝেই এই ধরণের কাণ্ড ঘটালেন? যেখানে পাকিস্তানি সেনা জেনারেলকে তিনি এই বিতর্কিত মানচিত্র-সহ একটি বই উপহার দিচ্ছেন। ওয়াকিবহাল মহল মনে করছেন, এটা ভারতকে দেওয়া একটা বার্তা। তাতে তিনি বোঝালেন, অচিরেই পাকিস্তানের সাহায্য নিয়ে বাংলাদেশ ভারতের সেভেন সিস্টার্স-সহ আরও কিছু অংশ দখল নেবে। অর্থাৎ, কট্টরপন্থীদের যে দাবি ছিল, সালতানাত ই বাংলা গঠনের, সেই স্বপ্ন তিনি পূরণ করবেন। কোনও শিল্পীর ভূগোল জ্ঞানের অভাব বা তুলির ভুল টান নয়, ভারতের গোয়েন্দা সংস্থাগুলির রিপোর্ট বলছে, এরকম একটা চক্রান্ত রচিত হচ্ছে বাংলাদেশে। যা নয়া দিল্লির অত্যন্ত চিন্তার কারণ।
কারণ ওই বিতর্কিত মানচিত্রে কেবল মায়ানমারের আরাকান অঞ্চলই নয়, পশ্চিমবঙ্গ, বিহার, ঝাড়খণ্ড, ওড়িশা, ত্রিপুরা, আসাম এবং অন্যান্য উত্তর-পূর্ব রাজ্য সহ ভারতীয় ভূখণ্ডের একটি বিশাল অংশও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এটা একটা বৃহত্তর ষড়যন্ত্র বলে মনে করছেন ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলি। কারণ, গোয়েন্দা সংস্থাগুলি এই দাবি জানানো কট্টরপন্থী ইসলামিক সংগঠন এবং তুর্কির ওই বিতর্কিত এনজিও-র সঙ্গে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের একটি উদ্বেগজনক সংযোগ রয়েছে। জানা গিয়েছে, প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের কন্যা দীনা আফরোজ ইউনূসের সাথে তহবিলের যোগসূত্র রয়েছে। সবকিছুই ভারতীয় গোয়েন্দাদের রেডারে রয়েছে। বাংলাদেশের মানচিত্র বড় করে গ্রেটার বাংলাদেশ গঠনের গোপন ষড়যন্ত্র এখন আরও বড় আকারে তুলে আনা হচ্ছে। এতে তুর্কি ও পাকিস্তান সরাসরি সহায়তা করছে বলেও জানা যাচ্ছে। সবমিলিয়ে মুহাম্মদ ইউনূস নিছক সৌজন্যের খাতিরে ওই উপহার দেননি পাক জেনারেলকে, এটা একটা সুপরিকল্পিত নাটক। যা মঞ্চস্থ হচ্ছে ঢাকাকে কেন্দ্র করে। এখন দেখার, ভারত এর প্রতিক্রিয়া কোন উপায়ে দেয়।












Discussion about this post