ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রীর একটি অডিও ক্লিপ নিয়ে দাবি করেছে সেটি শেখ হাসিনারই। ১৮ সেকেন্ডের ওই অডিও ক্লিপে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছবি দেখানো হয়েছে এবং তাতে তাঁকে আন্দোলনকারীদের উপর প্রাণঘাতী শক্তি ব্যবহারের নির্দেশ দিতে শোনা গিয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। বিবিসির দাবি, ওই অডিওটি যুক্তরাজ্য-ভিত্তিক ফরেনসিক ফার্ম ইয়ারশট দ্বারা যাচাই করা হয়েছে, এবং এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে যে ক্লিপটি সম্পাদনা বা বিকৃত করা হয়নি। লন্ডন ভিত্তিক সংবাদমাধ্যম বিবিসি ওই প্রতিবেদন প্রকাশ করার পরই বাংলাদেশের রাজনীতি তোলপাড় হতে শুরু করেছে। বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বিবিসির ওই প্রতিবেদন কে সামনে রেখে শেখ হাসিনাকে ফেরত চেয়ে নতুন করে উদ্যোগী হচ্ছে বলে জানা যাচ্ছে। এমনকি ভারতও নাকি আর শেখ হাসিনাকে আটকে রাখতে পারবে না বলে দাবি করছে ঢাকা। অপরদিকে আওয়ামী লীগ সহ বাংলাদেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ দাবি করছে বিবিসির ওই প্রতিবেদন রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। তাদের দাবি, প্রতিবেদনটি একটি সংক্ষিপ্ত অডিও অংশের উপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়েছে, যার স্থায়িত্ব মাত্র ১৮ সেকেন্ডের।
বিবিসির প্রতিবেদনটি প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গেই এর সত্যতা, উৎস এবং সময়কাল নিয়ে অনেক প্রশ্ন উঠেছে। বিশ্লেষকদের মতে, একটি পুরোনো ও খণ্ডিত অডিওকে কেন্দ্র করে নির্ভরযোগ্য ফরেনসিক প্রমাণ এবং স্বচ্ছ উৎস ছাড়াই তৈরি এই প্রতিবেদন। প্রশ্ন উঠছে, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কাদের সঙ্গে কথা বলছিলেন তা যেমন উল্লেখ করা হয়নি, তেমনি কোন প্রসঙ্গে তিনি এই নির্দেশ দিচ্ছেন সেটাও স্পষ্ট নয়। মাত্র 18 সেকেন্ডের একটি খন্ডিত অংশ নিয়ে কারোর বিরুদ্ধে এত বড় দাবি করা যে কোনও সংবাদমাধ্যমের দায়বদ্ধতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা বাধ্য। বিশেষ করে তিনি যদি কোন রাষ্ট্রের প্রধান হয়ে থাকেন তবে তো আরও সাবধানতা অবলম্বন ও প্রামাণ্য দলিল দাখিল করা উচিত ছিল বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। কিন্তু বিবিসির ওই প্রতিবেদনে সে সবের কোনও উল্লেখ নেই। যেখানে একটি দীর্ঘ রেকর্ডিং থাকা আবশ্যক, সেখানে শুধুমাত্র ওই নির্দিষ্ট অংশটিই জনসমক্ষে প্রকাশ করা হয়েছে। এটা বস্তুনিষ্ট সাংবাদিকতার বিরুদ্ধে।
অথচ বিবিসির এই প্রতিবেদন সামনে আসতেই বাংলাদেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের দাবিতে ফের সরব হল ঢাকা! প্রসঙ্গত, মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় বৃহস্পতিবার বাংলাদেশের আদালতে হাসিনার বিরুদ্ধে চার্জ গঠন হওয়ার কথা। তার আগেই রীতিমতো বিবৃতি দিয়ে শেখ হাসিনার প্রসঙ্গে ভারতের ‘নৈতিক স্বচ্ছতা’ দাবি করল বাংলাদেশ। প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের প্রেস সচিব শফিকুল আলম এ বিষয়ে সমাজমাধ্যমে পোস্ট করেছেন। তিনি লিখেছেন, “মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্তকে আর আগলে রাখতে পারবে না ভারত”। তাঁর এই ফেসবুক পোস্টের পরই হইচই পড়ে গিয়েছে কূটনৈতিক মহলে।
মুহাম্মদ ইউনূসের প্রেসসচিব ওই পোস্টে আরও লিখেছেন, আমরা এখন ভারতকে বিবেক এবং নৈতিক স্বচ্ছতার সঙ্গে কাজ করার অনুরোধ জানাচ্ছি। বাংলাদেশ সরকার অনেক দিন ধরে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ চেয়ে আইনানুগ অনুরোধ জানিয়ে আসছে। কিন্তু ভারত তা মানছে না। এটা আর চলবে না। যাঁর বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ রয়েছে, এমন কাউকে ভারত আর আগলে রাখতে পারবে না। কোনও আঞ্চলিক বন্ধুত্ব, কৌশলগত হিসাবনিকেশ বা কোনও রাজনৈতিক উত্তরাধিকার— কোনও কিছুই সাধারণ নাগরিকদের ইচ্ছাকৃত ভাবে হত্যাকে আড়াল করতে পারে না”। ওয়াকিবহাল মহলের মতে, যত সময় এগোচ্ছে, ততই যেন হাসিনা ইস্যুতে মরিয়া হয়ে উঠছে বাংলাদেশ। তাই ব্রিটেনের সংবাদমাধ্যম বিবিসির অন্তর্তদন্তে হাসিনার বিরুদ্ধে উঠে আসা অভিযোগকেও হাতিয়ার করতে ছাড়ছে না বাংলাদেশ।
ইউনূসের প্রেসসচিব তাই লিখেছেন, ভারত এবং বাংলাদেশ উভয়েরই দীর্ঘদিনের বন্ধু ব্রিটেন। সেখানকার সংবাদমাধ্যমগুলিও এই নৃশংসতার কথা প্রকাশ করেছে। এই মুহূর্তের গুরুত্ব বিবেচনা করে ভারত যেন ন্যায়বিচার, আইনের শাসন এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রতি সম্মান দেখায়, এটাই আমরা চাই। কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের দাবি, একটা বিষয়ে পাকিস্তান ও বাংলাদেশ এক বিন্দুতে দাঁড়িয়ে। পাকিস্তান যেমন অপারেশন সিঁদুরের সময়ে সোশ্যাল মিডিয়ার তথ্য দিয়ে ভারতের রাফাল ধ্বংসের দাবি করেছিল, তেমনই মিডিয়ায় প্রকাশিত এক প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে বাংলাদেশ ভারতকে কাঠগড়ায় তোলার চেষ্টা করছে। কিন্তু তাঁরা জানে না যে কোনও মিডিয়া রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করে কূটনৈতিক বোঝাপড়া হয় না। ফলে বাংলাদেশের এই বিবৃতির পর ভারত কী প্রতিক্রিয়া দেয়।












Discussion about this post