ঢাকার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনালে বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা-সহ তিনজনের বিরুদ্ধে মামলার শুনানি শেষ। জানা গিয়েছে, ১০ জুলাই তাঁদের বিরুদ্ধে চার্জ গঠন করা হবে। সোমবার বিচারপতি মহম্মদ গোলাম মর্তুজা মজুমদারের নেতৃত্বে গঠিত তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল এই আদেশ দিয়েছেন। তবে এই মুহূর্তে শেখ হাসিনা ভারতের আশ্রয়ে রয়েছেন। ঢাকার ট্রাইব্যুনাল জানিয়েছে, নির্দেশ মেনে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে তিনি আদালতে হাজিরা না দিলে তাঁকে ছাড়াই চার্জ গঠন করা হবে এবং শুনানি চলবে। উল্লেখ্য, শেখ হাসিনা তাঁর পক্ষে কোনও আইনজীবীকে নিয়োগ করেননি। তাই তাঁর হয়ে মামলা লড়ার জন্য রাষ্ট্রকর্তৃক একজন আইনজীবীকে নিয়োজিত হয়েছে। তাঁর নাম আমির হোসেন। সোমবার তিনি প্রথমবার বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রীর হয়ে সাওয়াল করেন। আর তাতেই তিনি যে যুক্তি-জাল সাজিয়েছেন, তাতে মনে করা হচ্ছে, ঠিকঠাক এগোলে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে চার্জ গঠন করা কঠিন হয়ে যাবে সরকার পক্ষের।
ঢাকার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনাল আইনজীবী আমির হোসেনকে শেখ হাসিনার পক্ষে লড়ার জন্য নিয়োগ করেছিল। তিনি আদালতে দাবি করেন, গত বছরের জুলাই – অগাস্ট মাসে বাংলাদেশে কোনও যুদ্ধ সংঘটিত হয়নি, যা হয়েছিল সেটা ছিল রাজনৈতিক বিরোধ। শেখ হাসিনা সে সময় দেশ পরিচালনায় শীর্ষপদে ছিলেন। তাঁর যুক্তি, যদি যুদ্ধই না হয়ে থাকে তাহলে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী যুদ্ধোপরাধী হিসেবে বিচার হয় কিভাবে? পাশাপাশি তাঁর আরও দাবি, পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, বঙ্গবন্ধু টানেল-সহ উল্লেখযোগ্য উন্নয়নমূলক কাজ তিনি করেছেন। তাই সেই সব অবকাঠামো ধ্বংসের সঙ্গে তিনি জড়িত থাকতে পারেন না। এমনকি ২০২৪ সালের ১৪ জুলাই থেকে ৫ আগস্ট প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে তিনি কোনও হত্যার নির্দেশ দেননি। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হয়ে সাওয়াল করার সময় আইনজীবী আমির হোসেন বলেন, শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে কোনও দালিলিক প্রমাণ নেই। প্রসিকিউশন কোনও রূপ প্রমাণ দাখিলেও ব্যর্থ হয়েছে। আইনজীবী মহলের একাংশ বলছেন, ঢাকার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনাল গঠন করা হয়েছিল ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালীন সংগঠিত অপরাধগুলির বিচার করার জন্য। এর আওতায় পড়ে, যুদ্ধাপরাধ, গণহত্যা, মানবতাবিরোধী অপরাধ এবং শান্তির বিরুদ্ধে হওয়া সংগঠিত অপরাধ। এই ট্রাইবুনাল ২০১০ সালের ২৫ মার্চ তৈরি করেছিল শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধিন আওয়ামী লীগ সরকার। মুক্তিযুদ্ধের সময়, যে বা যারা মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে পাকিস্তানি সেনার হয়ে কাজ করেছিলেন, যারা ২ লক্ষ মহিলার মান-সম্মান নষ্ট করে ধর্ষণের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন সেই রাজাকার, আল বদর ও আল সামস বাহিনীর সদস্যদের বিচার হচ্ছিল এই আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনালে। অথচ বর্তমান বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এই ট্রাইবুনালে বিচারের জন্য হাজির করেছে শেখ হাসিনা এবং তাঁর সরকারের মন্ত্রী-আমলাদের। যা সম্পূর্ণ বেআইনি ও অসাংবিধানিক বলেই মনে করছিলেন আইনজীবী মহলের একাংশ। যদিও এতদিন একতরফাভাবে মামলার শুনানি চলছিল। কারণ, হাসিনার হয়ে কেউ মামলা লড়তে রাজি হচ্ছিলেন না, আর হাসিনাও কাউকে নিয়োগ করেননি। আরও দুই আসামীর হয়ে কেউ লড়তে রাজি হননি। এর কারণ, বাংলাদেশের বর্তমান শাসকদের ভয়প্রদর্শন।
আইনজীবী আমির হোসেন প্রথমদিনই যেভাবে যুক্তির জাল বুনেছেন। তাতে মনে করা হচ্ছে, যদি তিনি নির্ভয়ে তাঁর সাওয়াল চালিয়ে যেতে পারেন, তাহলে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে মুহাম্মদ ইউনূস সরকার বিপদে পড়বেন। কারণ, বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া কয়েকটি মামলা এবং সামান্য কয়েকটি তথ্যের ভিত্তিতে তাঁকে গণহত্যা, হত্যা, গুম, অপহরণের মতো মারাত্মক সব ধারায় অভিযুক্ত করা হয়েছে। সেভাবে কোনও দালিলিক ও ফরেন্সিক প্রমান দাখিল করতে পারেনি সরকারপক্ষ। অপরদিকে, এই মামলার শুনানির ক্ষেত্রে যে তাড়াহুড়ো করা হচ্ছে, তাতেই পরিস্কার অন্তর্বর্তীকালীন সরকার যেনতেন প্রকারেণ শেখ হাসিনাকে দোষী সাব্যস্থ করে আন্তর্জাতিক মঞ্চে অপদস্থ করতে চাইছে। কিন্তু হাসিনাও পাকা রাজনীতিবিদ। তিনিও প্রথমদিনের সাওয়াল-জবাব শেষে এক অডিও বার্তায় জানিয়ে দেন, দেশে ফিরে আদালতের মুখোমুখি হব। মামলার মোকাবিলা করব, দেখব কত ধানে কত চাল। রাজনৈতিক মহলের মতে, রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবীই যদি তাঁকে নির্দোষ প্রমাণ করতে এতটা যুক্তির জাল বুনতে পারেন, তাহলে তিনি দেশে ফিরে আরও বাঘা বাঘা আইনজীবী নিয়োগ করলে মামলা জেতার সম্ভাবনা আরও বেড়ে যাবে।












Discussion about this post