শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে প্রথম সাক্ষীর বয়ানে চরম অস্বস্তিতে পড়েছে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। তিনি শুনানিতে বলেন, শেখ হাসিনা হাজার হাজার খুন করেছেন। তিনি নিজে পুলিশের গুলিতে আহত হয়েছেন। কিন্তু শেখ হাসিনার পক্ষে নিযুক্ত রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী যখন তাঁকে প্রশ্ন করেন, আপনি যে বলছেন, শেখ হাসিনা হাজার হাজার খুন করেছেন। এর কোনও প্রমাণ আছে কি? জবাবে প্রথম সাক্ষী হিসেবে কাঠগড়ায় দাঁড়ানো ব্যক্তি মাথা নীচু করে বলেন, না, আমার কাছে কোনও প্রমাণ নেই। শুনেছি উনি হাজার হাজার খুন করেছেন। হাসিনার আইনজীবী এরপর প্রশ্ন করেন, আপনি যে পুলিশের গুলিতেই আহত হয়েছেন তার প্রমাণ কী? তিনি ফরেনসিক রিপোর্ট দেখতে চান যা থেকে বুলেটের চরিত্র বোঝা যায়। জানা যাচ্ছে, রাষ্ট্রপক্ষ সেই রিপোর্ট দেখাতে পারেননি। উল্লেখ্য, বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে মামলা চলছে ঢাকার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনালে। তার সাক্ষ্য গ্রহণ শুরু হয়েছে। কিন্তু প্রথম সাক্ষীর ক্ষেত্রেই হোঁচট খেতে হল মুহাম্মদ ইউনূসের সরকারকে।
সূত্রের খবর, ওই আদালতে সাবেক প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে প্রথম সাক্ষী খোকনচন্দ্র বর্মণ। তিনি ঢাকার একজন মাইক্রো বাস চালক। গণ-অভ্যুত্থানের সময় ঢাকার যাত্রা বাড়িতে তাঁর চোখে, মুখে গুলি লেগেছিল। যাত্রা বাড়িতে পুলিশের গুলিতে ছয়জন নিহত এবং বহু মানুষ আহত হন। খোকন চন্দ্র বর্মণ তাঁদের একজন। তাঁকে বিদেশে নিয়ে গিয়ে চিকিৎসা করানো হয়েছিল। এদিন ট্রাইব্যুনালের বিচারপতি গোলাম মোর্তূজা মজুমদারকে তিনি মাস্ক খুলে তাঁর আঘাতও দেখান। কিন্তু প্রশ্নোত্তর পর্বে তাঁকে জেরা করতে গিয়েই বেরিয়ে আসে আসল তথ্য। তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, তিনি শুনেছেন, শেখ হাসিনার নির্দেশেই গুলি ছুঁড়েছিল পুলিশ। প্রথম সাক্ষী খোকন চন্দ্র বর্মনকে হাসিনা পক্ষের আইনজীবী আমির হোসেন প্রশ্ন করেন, যাত্রা বাড়িতে অভ্যুত্থানকারীদের গুলিতে বহ পুলিশ নিহত ও আহত হয়েছেন দেশি বন্দুকের গুলিতে। আপনার আঘাত দেখে মনে হচ্ছে আপনিও দেশি বন্দুকের গুলিতে আহত হয়েছেন। অর্থাৎ আন্দোলনকারীদের ছোঁড়া গুলিতে আপনি আহত হয়েছেন। এই কথা শুনেই সাক্ষী খোকনচন্দ্র বর্মণ আদালত কক্ষেই উত্তেজিত হয়ে পড়েন বলে জানা যায়। অর্থাৎ, সাক্ষী হিসেবে তাঁকে যে শিখিয়ে পড়িয়ে পাঠানো হয়েছিল সেটাই প্রমান হয়েছে আলাদত কক্ষে।
অন্যদিকে, হাসিনার বিরুদ্ধে দ্বিতীয় সাক্ষী হিসেবে এদিন হাজির করানো হয় আব্দুল্লাহ আল ইমরান নামে এক ব্যক্তিকে। তিনি ঢাকা কলেজের ছাত্র ছিলেন। গত বছর জুলাই আন্দোলনের সময় তাঁর পায়ে গুলি লাগে। তাঁর একটি পা বাদ গিয়েছে। এদিন তিনি আদালতে দাঁড়িয়ে দাবি করেন, পঙ্গু হাসপাতালে এসে শেখ হাসিনা বলেছিলেন ‘নো রিলিজ নো ট্রিটমেন্ট’। এরপরই নাকি তাঁর পায়ের চিকিৎসা বন্ধ হয়ে যায়। তাঁর পায়ে পচন ধরলেও তাঁকে অপারেশন থিয়েটারে নিয়ে যেতে দেরি করানো হয়। ওই সাক্ষী আরও দাবি করেন, তাঁর বাবা তাকে রিলিজ করে অন্য হাসপাতালে নিতে চাইলে তাও করতে দেওয়া হয়নি। উল্লেখ্য, বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান কামালের বিরুদ্ধে গণহত্যা-সহ একাধিক ধারায় মামলা হয়েছে। তৃতীয় অভিযুক্ত সাবেক পুলিশকর্তা চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন রাজসাক্ষী হয়েছেন। তাঁর জবানবন্দি নেওয়ার আগে অন্যান্য সাক্ষীদের বয়ান নেওয়া হচ্ছে। আর তাতেই হোঁচট খেতে হচ্ছে সরকার পক্ষকে। উল্লেখ্য, এই ধরণের মামলায় সাধারণত মূল অভিযুক্ত যদি ফেরার বা নিরুদ্দেশ থাকেন বা তাঁর পক্ষের সরাসরি কোনও আইনজীবী না থাকেন তাহলে একজন রাষ্ট্রপক্ষ নিয়োজিত আইনজীবী দেওয়া হয়। যেমন শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান কামালের হয়ে লড়ছেন আইনজীবী আমীর হোসেন। কিন্তু আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে এই ধরণের বিচারপ্রক্রিয়া মান্যতা পায় না। ফলে ঢাকার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনালে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে যে মামলা চলছে, তাতে রাষ্ট্রসংঘ বা অন্যান্য রাষ্ট্র মান্যতা দেবে কিনা সন্দেহ। এরমধ্যেই জানা গেল প্রথম সাক্ষীই বিরুপ হয়েছেন। যদিও বাংলাদেশের কোনও প্রথমসারির সংবাদমাধ্যম এই সংক্রান্ত খবর প্রকাশই করেনি। সবমিলিয়ে বিচারের নামে যে প্রহসন হচ্ছে, সেটা আবারও প্রমানিত হল।












Discussion about this post