ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে সর্বাত্মক যুদ্ধ প্রায় শুরু হয়ে গিয়েছে। এই কারণে ভারতীয় বাজার-সহ বিশ্ববাজারে বড় ধরনের বাণিজ্য বিঘ্ন ঘটবে বলে আশা করছেন বিশেষজ্ঞরা। আমাদের কৌতূহল হল, ভারত কতটা প্রভাবিত হতে পারে?
গত ১৩ জুন, শুক্রবার সেনসেক্স ৫৭৩ পয়েন্ট কমে বন্ধ হওয়ার পর ভারতীয় বাজারে সংঘাতের প্রভাবের প্রাথমিক লক্ষণগুলি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বিশ্লেষকদের একটা বড় অংশ মনে করছেন, এই যুদ্ধ যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে তা বিপজ্জনক হবে ভারতীয় অর্থনীতিতে। কারণ বিশ্ববাজারে, অপরিচিত তেলের দাম বাড়লে ভারত ও পেট্রোল-ডিজেলের দাম বেড়ে যাবে। কিন্তু সত্যি কি তাই হতে পারে? একদল বিশেষজ্ঞ বলছেন একদল বিশেষজ্ঞ বলছেন, এটা একদমই হবে না। প্রসঙ্গত, ইরান ও ইজরায়েলের সঙ্গে ভারতের বাণিজ্যিক সম্পর্ক রয়েছে তা বিবেচনা করে, তাদের সংঘাতের প্রভাব ভারতেও দেখা যাবে বলেই মনে করছেন একদল বিশেষজ্ঞ। এর মূল কারণ হল অপরিশধিত তেল রফতানির একটা বড় অংশ আসে ইরান থেকে। কিন্তু ইসরাইলি আক্রমণের জেলে হরমুজ প্রণালী কার্যত বন্ধ হয়ে বসে আছে। ফলে ভারতে যেমন তেল আসছে না, তেমনি কিংবা অন্যান্য দেশেও তেল রপ্তানি বন্ধ হয়ে বসে আছে।
শুক্রবার ইজরায়েলের প্রথম দুই দফা হামলার পর, আন্তর্জাতিক তেল বাজারে ৯ শতাংশেরও বেশি দাম বেড়েছে। ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দামও ছয় ডলারেরও বেশি বেড়ে পাঁচ মাসের সর্বোচ্চ ৭৮ ডলার প্রতি ব্যারেল অতিক্রম করেছে। তবে ভারত ইরান থেকে প্রচুর পরিমাণে অপরিশোধিত তেল আমদানি করে না। কিন্তু সরবরাহ শৃঙ্খল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কারণে রফতানি ব্যয়বহুল হতে পারে বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তবে অপরিশোধিত তেলের দাম বৃদ্ধির ফলে বিশ্ব বাজারে ভারতীয় রুপির মূল্য দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, যার ফলে মুদ্রাস্ফীতি দেখা দিতে পারে। কিন্তু ভারত রাশিয়া থেকে অপরিশোধিত তেল কিনছে পর্যাপ্ত পরিমানে, যা ভারতের সাপ্লাই চেন বিঘ্ন ঘটাবে না। পাশাপাশি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি কয়েক মাস আগেই গায়ানা সফরে গিয়েছিলেন। আফ্রিকার এই দেশে বিপুল পরিমাণ তেল পাওয়া গিয়েছে মাটির তলায়, নরেন্দ্র মোদি, গায়ানা সরকারের সঙ্গে চুক্তি ছেড়ে এসেছেন। অপরদিকে আন্দামান দ্বীপপুঞ্জেও বিপুল পরিমাণ তেল আবিষ্কার হয়েছে যা বছরখানেকের মধ্যেই উত্তোলন শুরু হয়ে যাবে বলে দাবি করেছেন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী হরদীপ সিং পুরী।
এবার আসা যাক ইরান প্রসঙ্গে, জেনে রাখা ভালো, ইরান প্রতিদিন প্রায় ৩.৩ মিলিয়ন ব্যারেল অপরিশোধিত তেল উৎপাদন করে, যা বিশ্বব্যাপী উৎপাদনের প্রায় ৩%। ইরান বিভিন্ন দেশে প্রায় ১.৫ মিলিয়ন ব্যারল তেল রফতানি করে, যার মধ্যে চিন হল বৃহত্তম আমদানিকারক দেশ, মোট ৮০ শতাংশ। এবং তার পরেই রয়েছে তুরস্ক। ইরান হরমুজ প্রণালী যা পারস্য উপসাগরের উত্তর দিকে অবস্থিত সেখান দিয়ে তেল রফতানি করে। যা বিশ্বব্যাপী তেল সরবরাহের ২০-২৫ শতাংশ পরিবহনের একটি গুরুত্বপূর্ণ পথ। ইজরায়েলি হানায় এই সমুদ্র পথ বন্ধ করার হুমকি দিচ্ছে ইরান। সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং কাতার থেকে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি চালানের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ করিডোর এই হরমুজ প্রণালী। যা ভারতে শীর্ষ এলএনজি সরবরাহকারীদের মধ্যে একটি পথ। ইজরায়েলের সাথে চলমান সংঘর্ষের ফলে যদি এটি করা হয়, তাহলে তা বিশ্বব্যাপী তেল সরবরাহের জন্যই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। সবচেয়ে বেশি চাপে পড়বে চিন। আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইজরায়েলি হানার পর ইরানি তেল সরবরাহে সাময়িক হ্রাস পাবে। তবে, যদি এই সংঘাত খুব বেশি সময় ধরে চলে, তবে এটি তেল বাজারে ব্যাঘাত ঘটাতে পারে।
পশ্চিম এশীয় দেশগুলির মধ্যে সংঘাত সমুদ্রপথে বাণিজ্যের উপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। ইয়েমেনে হুথিদের বারবার আক্রমণের কারণে গত বছর জুড়ে নিরাপত্তা উদ্বেগের কারণে ভারত থেকে রফতানি চালান-সহ জাহাজগুলি চলতি বছরের মে মাসে লোহিত সাগর রুট দিয়ে পুনরায় চালু করা শুরু হয়েছিল । তবে, ইজরায়েল এবং ইরানের মধ্যে সরাসরি সংঘর্ষ শুরু হওয়ার সাথে সাথে, জাহাজটিকে দীর্ঘ কেপ অফ গুড হোপ রুটটি নিতে বাধ্য হচ্ছে। এই পথ পরিবর্তনের ফলে যাত্রার সময় ১০-১৪ দিন বৃদ্ধি পাওয়ার যেমন সম্ভবনা রয়েছে, তেমনই খরচও বৃদ্ধি পাবে।
অন্য একটি দিক হল, মধ্যপ্রাচ্য থেকে ভারতের আমদানির মধ্যে রয়েছে, এলপিজি, এলএনজি, পেট্রোকেমিক্যাল এবং সার। সমুদ্রপথে পরিবর্তনের ফলে দাম যেমন বৃদ্ধি পাবে, তেমনই নৌপথে পরিবহন ঝুঁকি দেখা দিতে পারে। পাশাপাশি এলপিজি বা সার সরবরাহে যেকোনও রকম ব্যাঘাত গ্রামীণ ভারতীয় অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলতে পারে। এছাড়া বিমান, রাসায়নিক, রঙ, টায়ার, সিমেন্ট এবং সরবরাহ সহ উৎপাদন ক্ষেত্রগুলি পেট্রোলিয়াম-ভিত্তিক উপাদান এবং জ্বালানি ব্যবহার করে। জেট জ্বালানি, গ্যাসোলিন বা ন্যাফথার মতো কাঁচামালের দাম বৃদ্ধি পেলে, লাভের মার্জিন হ্রাস পাবে বলে মনে করছেন অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞরা। কিন্তু, ভারত সরকারের দাবি, ইরান-ইজরায়েল যুদ্ধে তাৎক্ষণিকভাবে কিছু ক্ষেত্রে দাম বৃদ্ধি পেলেও, পরবর্তী সময়ে তা খুব একটা প্রভাব ফেলবে না ভারতের অর্থনীতিতে।











Discussion about this post