“ আমার ভালোবাসার কোনও জন্ম হয় না / মৃত্যু হয় না – / কেননা আমি অন্যরকম ভালোবাসার হীরের গয়না / শরীরে নিয়ে জন্মেছিলাম / আমার কেউ নাম রাখেনি, তিনটে / চারটে ছদ্মনামে / আমার ভ্রমণ মর্তধানে / আগুন দেখে আলো ভেবেছি , আলোয়া আমার হাত পুড়ে যায় / অন্ধকারে মানুষ দেখা সহজ ভেবে ঘুর্ণিমায়ায় / অন্ধকারে মিশে থেকেছি। / কেউ আমাকে শিরোপা দেয়, কেউ দু চোখে হাজার ছি ছি / তবু আমার জন্ম কবচ, ভালোবাসাকে ভালোবেসেছি, / আমার কোনও ভয় হয় না/ আমার ভালোবাসার কোনও জন্ম হয় না, মৃত্যু হয় না। ”
নীললোহিতের ‘জন্ম হয় না, মৃত্যু হয় না’ কবিতার সঙ্গে বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি যেন হুবহু মিলে যায়। প্রশ্ন তোলে বাংলাদেশ কি সত্যিই সভ্য হয়েছে? না কি আমরা ইতিহাসের সব চেয়ে অমানবিক সময় পার করছি – এই প্রশ্ন আজ আর কোনও তাত্ত্বিক নয়, বরং রক্তমাখা বাস্তবতা। কারাগারে একের পর এক রাজনৈতিক বন্দীর মৃত্যু, মিথ্যা মামলায় মাসের পর মাস আটক রেখে জামিন না দেওয়া, আদালত না বসা আর কারাগারের বাইরে পরিবারের সদস্যদের না খেতে পেয়ে মারা যাওয়ার দৃশ্য আমাদের প্রতিদিনের খবর হয়ে উঠেছে। এই নির্মম বাস্তবতার মাঝেই দাঁড়়িয়ে আছে বাগেরহাটের ছাত্রলীগ নেতা জুয়েল হাসান সাদ্দামের করুণ গল্প। ১১ মাস ধরে কারাবন্দী এক মানুষ, যিনি নিজের সন্তানের জন্ম দেখার সুযোগ পাননি, আর জীবনে প্রথমবার সন্তানকে দেখেছেন মৃত অবস্থায়। তাঁর স্ত্রী কানিজ সুবর্ণা এবং তাদের মাত্র নয় মাসের শিশুসন্তান নাজিম – দুজনেই নেই। একজন পিতা আজ হাতকড়া পরা অবস্থায় জেলের গেটে দাঁড়িয়ে স্ত্রী ও সন্তানের নিথর দেহের দিকে তারকিয়ে আছে। এটা কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। নয় এটা কোনও বিচ্ছিন্ন ট্র্যাজেডি। এটি একটি পুরনো শাসনব্যবস্থার মুখোশ খুলে দেয় – যেখানে মানবিকতা, ন্যায়বিচার, সভ্যতার দাবি কেবল মুখের কথা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সাদ্দাম একা নয়, তার মতো হাজার হাজার সাদ্দাম আজ বাংলাদেশে বুক চাপড়ে কাঁদছে। বাগেরহাট সদর উপজেলা নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগ সভাপতি জুয়েল হাসান সাদ্দাম বর্তমানে একাধিক মামলায় জেলে বন্দী। গত ২৪ জানুয়ারি সন্ধ্যায় যশোরের কেন্দ্রীয় কারাগারের গেটে তাঁকে মাত্র পাঁচ মিনিটের জন্য মৃত স্ত্রী এবং নয় মাসের মৃত শিশুপুত্রের মুখ দেখতে দেওয়া হয়েছিল। প্যারোল না পাওয়ায় মৃতদেহ অ্যাম্বুল্যান্সে করে কারাগারের গেটের সামনে নিয়ে যাওয়া হয়। কারা কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, মৃতদেহ বহনকারী অ্যাম্বুল্যান্সটি সন্ধ্যা সাতটার দিকে জেলের সামনে পৌঁছায়। এরপর সাড়ে ৭টা নাগাদ অ্যাম্বুল্যান্সসহ পরিবারের ছয়জন নিকটাত্মীয়কে জেলেগেটের ভিতরে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়। সেখানে তাদের মাত্র পাঁচ মিনিট বরাদ্দ করা হয়।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, জুয়েলের ১২ থেকে ১৫জন আত্মীয় দুই মাইক্রোবাসে করে যশোরের কেন্দ্রীয় কারাগারের সামনে উপস্থিত হয়। বাইরে অপেক্ষমান স্বজনদের কান্নায় এক হৃদয় বিদারক পরিস্থিতি তৈরি হয়। গত ৫ অগাস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর গোপালগঞ্জ থেকে গ্রেপ্তার হন সাদ্দাম। তারপর থেকে তিনি যশোরের কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দী। শুক্রবার বিকেলে বাগেরহাট সদর উপজেলার বেখেডাঙ্গা গ্রামে সাদ্দামের বাড়ি থেকে স্ত্রী কানিজ সুরভানা স্বর্ণালীর দেহ উদ্ধার হয়। তাঁর পাশেই পাওয়া যায় তাদের নয় মাসের শিশুপুত্র নাজিমের দেহ। পুলিশ ও পরিবারের দাবি, বিষণ্ণতা থেকে সন্তানকে হত্যার পর স্বর্ণালী আত্মহত্যা করেছে। প্যারোলে সাদ্দামকে মুক্তি না দেওয়ার বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দেয়।
আদালতে সাদ্দামের আইনজীবী সাঈদ আহমেদ রাজা বলেন, আদালত মানবিক বিবেচনায় সাদ্দামকে জামিন দিয়েছেন। তাঁর বিরুদ্ধে সাতটি মামলা ছিল। এর আগে ৬টি মামলায় হাইকোর্ট জামিন দিয়েছিল। সোমবার সপ্তম মামলায় তাঁর জামিন মঞ্জুর করল আদালত।












Discussion about this post