বিশ্বব্যাঙ্ক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তাহবিলের প্রতিবেদন অনুযায়ী ভারত ইতিমধ্যেই বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম অর্থনীতি হিসেবে উঠে এসেছে। ওই দুই সংস্থার দাবি, চলতি বছরেই ভারত তৃতীয় স্থানে উঠে আসবে জার্মানিকে ছাপিয়ে। এটা অবশ্যই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চিনের সামনে বড় মাথাব্যাথার কারণ। ভারতের এই উত্থান সবচেয়ে বেশি চিন্তায় রেখেছে বেজিংকে। কারণ, একদিকে ভারতের অর্থনৈতিক উত্থান, অন্যদিকে চিনের অর্থনীতি পড়তির দিকে। তাই বেজিং যেমন ভারতের দিকে বন্ধুত্বের হাত বাড়াতে উদ্যোগী, তেমনই তলে তলে পুরোনো খেলাও বজায় রেখেছে চিনা কমিউনিস্ট পার্টি। ভারতের বিরুদ্ধে ছায়াযুদ্ধ বজায় রাখতে তাঁরা এবার বাংলাদেশকে হাতিয়ার করতে চায়। এর ইঙ্গিত হল, গত দুই মাসে বাংলাদেশের মৌলবাদী রাজনৈতিক সংগঠন জামায়তে -ই-ইসলামি নেতাদের দুটি চিন সফর। এখানেই শেষ নয়, চিনা কমিউনিস্ট পার্টির আমন্ত্রণে বেজিং সফরে গিয়েছিলেন বিএনপির একটি উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধি দল। আর সবটাই হচ্ছে মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে বাইরে রেখে। পুরো বিষয়টা নিয়ে উদ্বেগে রয়েছে ভারত।
সম্প্রতি জামাত প্রধান শফিকুর রহমানের নেতৃত্বে ৯ সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল বেজিং সফর করে এলেন। গত দুই মাসের মধ্যে জামাত নেতাদের এটা দ্বিতীয় চিন সফর। কেন এত ঘনঘন চিন সফরে যাচ্ছেন কট্টরপন্থী এই ইসলামী সংগঠন? যা আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। কূটনৈতিক বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, দক্ষিণ এশিয়ায় মৌলবাদী শক্তিগুলিকে ব্যবহার করে চিন ভারতের বিরুদ্ধে একটি ছায়াযুদ্ধ চালাতে পারে। পাকিস্তানকে খোলাখুলি সাহায্য করেও চিন সেভাবে ফায়দা তুলতে পারেনি। চিন দীর্ঘদিন ধরে ইসলামবাদকে অত্যাধুনিক যুদ্ধস্ত্র ও সাজ সরঞ্জাম দিয়ে এসেছে। চিন-পাকিস্তান ইকোণমিক করিডোরে বিপলু বিনিয়োগ করেছে বেজিং। কিন্তু পাকিস্তানে বালুচিস্থান আন্দোলন ও ভারতের অপারেশন সিঁদুর এই ইকোণমিক করিডোরের দফারফা হয়ে গিয়েছে। বিপুল ক্ষতির মুখে দাঁড়িয়ে গিয়েছে চিন। একইভাবে চিন-মিয়ানমার ইকোণমিক করিডোরের অবস্থাও বিশ বাও জলে। সেখানেও বিপুল ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে চিনের। তাই কিছুটা ব্যাকফুটে চিনের শি জিংপিন প্রশাসন। এই অবহে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নতি করতে ও ফের বাণিজ্যক সম্পর্ক বৃদ্ধি করতে উদ্যোহী বেজিং। কিন্তু চিন তো চিনই, তাঁরা যতই বন্ধুত্বের হাত বাড়াক না কেন, ভারতের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করতে তাঁরা মোটেই পিছিয়ে থাকতে রাজি নয়। সেই কারণেই বাংলাদেশের দিকে নজর তাঁদের।
কূটনৈতিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জামাত অতীতেও প্রকাশ্যে ভারত-বিরোধী মন্তব্য বা ভারত বিদ্বেষী নানা কর্মকান্ডের সঙ্গে যুক্ত ছিল। বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারের সময়ে নিষিদ্ধ থাকা জামাত বর্তমান ইউনূসের সরকারের প্রধান চালিকাশক্তি। বাংলাদেশে নতুন সরকার গঠনের পরে জামাত শিবির রাজনৈতিক ভাবে যথেষ্টই সক্রিয় হয়ে উঠেছে। এমনকি বাংলাদেশে ছাত্রদের নতুন রাজনৈতিক দল এমসিপির সঙ্গে জামাতের অতি ঘনিষ্টতা এখন ওপেন সিক্রেট। ঢাকায় একাধিক জনসভায় অংশ নিয়ে সংগঠনটি স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে, তারা আগামী নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে চায় এবং নতুন সরকার ও সংসদকে ইসলামি শরিয়াহ অনুসারে পরিচালনার দাবি জানিয়েছে। বাংলাদেশে একটি অন্তর্বর্তী সরকার চলছে এবং সেখানকার রাজনৈতিক পরিস্থিতিও অত্যন্ত সংকটজনক। এই আবহে বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলিকে বারবার চিনের আমন্ত্রণ এবং বৈঠক কূটনৈতিক মহলে যথেষ্টই আগ্রহের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। জামায়তে ইসলামীর মতো কট্টরপন্থী ইসলামিক দলকে চিনের প্রকাশ্য সমর্থন শুধুমাত্র বাংলাদেশ নয়, গোটা দক্ষিণ এশিয়ার জন্যই অশনিসংকেত বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা।
কূটনৈতিক মহলের মতে, এত দ্রুত জামাতের পরপর দু-বার চিন সফর অনেক প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, চিন হয়তো বাংলাদেশে একটি ‘ছায়া প্রভাব’ তৈরি করতে চাইছে। যেখানে কয়েকটি ইসলামপন্থী গোষ্ঠীকে হাতিয়ার করে বেজিং ভারতের কৌশলগত প্রভাবকে চ্যালেঞ্জ জানাবে। এটা ভারতের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক বিষয় হতে পারে। কারণ আজ না হয় কাল বাংলাদেশে নির্বাচন হবে। সেখানে বিএনপি ও জামাত যদি সরকার গঠন করে, তাহলে তা ভারতের আভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার ক্ষেত্রে আরও বড় ঝুঁকি হতে পারে। এখন দেখার, ভারত বাংলাদেশ ইস্যুতে শেষ পর্যন্ত কি অবস্থান নেয়।












Discussion about this post