বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ী সদস্যরা গত মঙ্গলবার শপথ নিয়েছেন। সেই সঙ্গেই জামায়াত ও এনসিপির সাংসদরা সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবেও শপথ নিয়েছেন। কিন্তু বাংলাদেশের বর্তমান সাংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ দল বিএনপির কোনও সদস্যই এবার সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ হিসেবে শপথ নেননি। বাংলাদেশের বর্তমান সংবিধানে এই পরিষদের শপথ নেওয়ার কোনও বিধান নেই উল্লেখ করে বিএনপি পরিষদীয় সদস্যরা সাধারণ এমপি হিসেবেই কেবলমাত্র শপথ নিয়েছেন। ফলে প্রশ্ন উঠছে বাংলাদেশের বিদায়ী প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস এবং তথাকথিত সংবিধান সংস্কার পরিষদের চেয়ারম্যান আলী রীয়াজের বহু নাটকের ফসল ‘জুলাই সনদ’ এখন কি আইসিইউতে? এই প্রশ্ন আরও জোরালো হয়েছে যখন ভোটের ফল ঘোষণার পরই বাংলাদেশের উচ্চ আদালতে দুটি রিট দাখিল হওয়ার পর। সব মিলিয়ে এক চরম অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে জুলাই সনদের বাস্তবায়ন নিয়ে।
বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েও বিএনপির এমপিরা সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেননি। রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন চুপ্পুর জারি করা জুলাই জাতীয় সনদ বা সংবিধান সংস্কার প্রস্তাবনা বাস্তবায়ন আদেশ অনুযায়ী, গণভোটে “হ্যাঁ” বিজয়ী হলে নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা একই সঙ্গে সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসাবেও কাজ করবেন। ওই আদেশের ভিত্তিতে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি একইদিনে গণভোট হয়েছে। আর সেখানে ‘হ্যাঁ’ ভোট জয় লাভ করেছে। ফলে রাষ্ট্রপতির আদেশ অনুযায়ী জয়ী সাংসদরা দুটি শপথ নেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বিএনপি সাংসদরা একটিমাত্র শপথ নেন। তবে জামায়াত এবং এনসিপি সদস্যরা দুটি শপথ নিয়েছেন। এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া বলেছেন, “গণভোটে জনরায়ের সাথে প্রতারণা করে শপথ নিতে যাচ্ছে সরকার”। আবার জামায়াতের আমির শফিকুর রহমানও দাবি করেছেন, গণপরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ না নিয়ে বিএনপির জুলাই আন্দোলনকে অবজ্ঞা করেছে। কিন্তু বিএনপি যা বলার তাই বলেছে। তাঁদের দাবি, বর্তমান সংবিধানে এমন কোনও বিধান নেই। তাই নতুন সংসদে এটা নিয়ে আলোচনা হবে, তারপর সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে। যদিও রাজনৈতিক মহলের মতে, জুলাই সনদ কার্যত ঠান্ডা ঘরে পাঠিয়ে দিল তারেক রহমানের বিএনপি। কারণ, তাঁরা এবারের নির্বাচনে দুই তৃতীয়াংশ আসন পেয়ে সরকার গড়েছে। অপরদিকে বাংলাদেশের সংবিধান বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গণভোটের রায়ের কারণে যদি জুলাই আদেশ বাস্তবায়নযোগ্যই হয়ে যায়, তাহলে সংবিধান সংস্কার পরিষদের প্রয়োজনীয়তাই থাকে না। আবার অন্যদিকে যেসব সদস্যরা শপথ নিয়েছেন তারা নিজেরাই জুলাই আদেশ অনুযায়ী নিজেরাই সংবিধান বানিয়ে ফেলতে পারেন।
কিন্তু যেটা জানা যাচ্ছে, সেটাও কম গুরুত্বপূ্র্ণ নয়। ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত গণভোটের বৈধতা চ্যালেঞ্জ ও ১৩ ফেব্রুয়ারি ঘোষিত গণভোটের ফলাফল বাতিল চেয়ে বাংলাদেশ হাইকোর্টে রিট দায়ের করা হয়েছে। মঙ্গলবার সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী এ বি এম আতাউল মজিদ জনস্বার্থে এ রিট দায়ের করেন। ওই রিটে তিনি দাবি করেছেন, সংবিধানে গণভোট আয়োজনের কোনও বিধান নেই এবং নির্বাচন কমিশনের কোনও গণভোট পরিচালনার ক্ষমতা নেই। সেই যুক্তি দিয়ে তাঁর আবেদন কেন ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত গণভোটকে অবৈধ ও অসাংবিধানিক ঘোষণা করা হবে না। অপরদিকে আইনজীবী ইউনুছ আলী আকন্দ জুলাই সনদকে অসাংবিধানিক দাবি করে রিট করে আরেকটি আবেদন করেছেন। ওয়াকিবহাল মহলের মতে জামায়াত ও এনসিপির ৭৭ জন সদস্য শপথ নিলেও তারা সংবিধান লঙ্ঘনের দায়ে ফেঁসে যেতে পারেন। বিএনপি ঠিক এই আইনি জটিলতা চিহ্নিত করেই মঙ্গলবার শপথ নেননি গণপরিষদের সদস্য হিসেবে। এখন অনেকের মনেই প্রশ্ন, ১২ ফেব্রুয়ারির গণভোটের ফল কি শেষ পর্যন্ত বাতিল হয়ে যাবে? নাকি জুলাই সনদ চলে যাবে হিমঘরে? সবমিলিয়ে যা বোঝা যাচ্ছে, মুহাম্মদ ইউনূস এবং ছাত্রনেতাদের স্বপ্নের জুলাই সনদ বা সংবিধান সংশোধনের প্রচেষ্টা আপাতত চরম অনিশ্চয়তার মুখে দাঁড়িয়ে।












Discussion about this post