“আমি তো আমার শপথ রেখেছি / অক্ষরে অক্ষরে/ যারা প্রতিবাদী তাদের জীবন / দিয়েছি নরক করে। / দাপিয়ে বেড়াবে আমাদের দল / অন্যে কবে না কথা/ বজ্র কঠিন রাজ্যশাসনে”।
প্রতিবেদনের সঙ্গে শঙ্খ ঘোষের সবিনয় নিবেদন কবিতার প্রতিটি কথা যেন মিলে যায় সংবাদ শিরোনামে থাকা ব্যক্তির গত ১৮ মাসের কার্যাবলীর সঙ্গে। কবিতার একজায়গায় শঙ্খ ঘোষ লিখছেন- “ যে মরে মরুক, অথবা জীবন /কেটে যাক শোক করে / আমি আজ জয়ী, সবার জীবন / দিয়েছি নরক করে”।
প্রতিবেদনের শিরোনামে যিনি রয়েছেন, অর্থাৎ ইউনূস তিনি জয়ী হয়েছেন কি না তা নিয়ে বিস্তর তর্ক হতে পারে। তবে তিনি তাঁর গত ১৮ মাসের শাসনামলে বাকিদের জীবন যে নরক করে দিয়েছেন, তা নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই। এই গত ১৮ মাসে তাঁর দল দাপিয়ে বেড়িয়েছে। কেউ কথা বলতে পারেনি, এমনই তাঁর বজ্রশাসন। যারা প্রতিবাদী ছিল তাদেরও জীবন নরক করে দিয়েছেন। কেউ মরেছে। কারও জীবন কেটছে শোক করে। জাতির উদ্দেশ্যে দেওয়া ভাষণে তিনি নিজেকে জয়ের দাবিদার বলতে চেয়েছেন। রাজা আলেকজান্ডার কোনও যুদ্ধে পরাজিত হলে তিনি কি মুছে ফেলতে পারতেন তাঁর পরাজয়ের গ্লানি? বা কিং লিয়ার? ইউনূস আর যাই হোক না কেন, তিনি আলেকজান্ডার নন। তিনি মহম্মদ বিন তুঘলকের এক অবিসংবাদি আধুনিক সংস্করণ। তাঁর তুঘলকি শাসনে বাংলাদেশ কার্যত দেউলিয়া হয়ে গিয়েছে। হেনরি কিসিঞ্জার বেঁচে থাকলে তিনি এই নোবেলম্যানকে ডেকে কংগ্রেসনাল মেডেল দিতেন। কারণ, জাতির উদ্দেশ্যে দেওয়া তাঁর বাস্কেটগেট বক্তৃতা তাঁকে সোনার হরফে খোদাই করে রাখা যেতে পারে। বাংলাদেশে অশান্তির নিরিখে ইংরেজি সাহিত্যে এক নতুন শব্দের জন্ম দিয়েছে — মবোক্র্যাসি। আর বাংলায় মৌদুদিবাদ।
বিগত ১৮ মাসের ধ্বংসযজ্ঞের কিছু নমুনা কিছু এখানে তুলে ধরা যেতে পারে। গত ১৮ মাসে দেশ চলেছে মব আর মৌদুদিবাদে। কয়েক লক্ষ ঘটনা ঘটেছে। পত্রিকা অফিসে আগুন, উদিচিতে আগুন, ছায়ানটে আগুন। ৩২ নম্বর ধানমন্ডী ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া। জাতীয় চার নেতা সহ মুক্তির যুদ্ধের সব স্মৃতি ধ্বংস করা হয়েছে। ৭ মার্চ জাতির উদ্দেশ্য বঙ্গবন্ধুর দেওয়া ভাষণ মুছে ফেলা হয়েছে। বাতিল করা হয়েছে জাতীয় শোক দিবস। গোপালগঞ্জে রাষ্ট্রের মদত হয়েছে সন্ত্রাস। আদিবাসীদের হত্যা করা হয়েছে। খুন করা হয়েছে সংখ্যালুঘুদের। বাংলাদেশের একমাত্র টায়ার কোম্পানিকে জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে। গত ১৮ মাসে দেশের ভিতরে দুই শতাধিক মানুষকে পুড়িয়ে মারা হয়েছে। আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের জীবনে চালানো হয়েছে বুলডোজার। জেলবন্দি অবস্থায় মৃত্যু হয়েছে এক হাজারের বেশি মানুষের। প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে ইউনূস ক্ষমতা গ্রহণ করে ২০২৪-য়ের ৮ অগাস্ট। অগাস্ট শব্দের অর্থ পবিত্র। ১৮ মাসের মবক্র্যাসি সেই মাসটাকে শুধু অপবিত্র করেনি। করেছে কলুষিত। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের একটি গণমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকের বলেছিলেন, জনতা বিপ্লবের মুডে রয়েছে। তাই বাংলাদেশে যা কিছু হচ্ছে সেটা বৈপ্লবিক আন্দোলনের বহিঃপ্রকাশ। অর্থাৎ তিনি বোঝাতে চেয়েছেন, বিপ্লবীদের সহজাত ধর্ম হল তারা তাঁদের বিদ্রোহীদের খুঁজে বের করে হত্যা করবে। ভয়েস অব আমেরিকার এক সাংবাদিক ইউনূসকে প্রশ্ন করেছিলেন – “ বঙ্গবন্ধুর বাসভবন, জাদুঘর পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। ১৫ অগাস্টের ছুটি বাতিল করা হয়েছে। বঙ্গবন্ধুকে ফ্যাসিস্টের রোলমডেল হিসেবে চিহ্নিত করে তাঁর ভাস্কর্য ভাঙা হয়েছে কেন ?” প্রশ্নটি করা হলে ইউনূস স্বভাবতই বিরক্তি প্রকাশ করেন। উত্তর দেওয়ার সময় গলার স্বর সপ্তমে তোলেন। বলেন, “ বিপ্লবীরা রিসেট বাটন চাপ দিয়ে আগের সব কিছু মুছে দিয়েছে। আগের ইতিহাস নিয়ে আর ভাবনার অবকাশ নেই। সব বাদ। ৫ অগাস্টের পর থেকে সব কিছু নতুন করে শুরু হয়েছে। ”
বিশ্লেষকরা বলছেন, অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে মব সন্ত্রাস, যাদের হামলায় গত দেড় বছরে আক্রান্ত হয়েছে দেশের শীর্ষস্থানীয় দুই সংবাদপত্র প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার ভবন থেকে শুরু করে বহু মাজার, সাংস্কৃতিক কেন্দ্র এবং মুক্তিযুদ্ধের স্মারক।মানবাধিকার সংস্থা অধিকারের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের অগাস্ট থেকে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর – অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে ১৪ মাসে দেশে অন্তত ৪০টি বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ এসেছে।












Discussion about this post