বাংলাদেশের জনগণের একটা অংশ যেখানে ভারতের বিরোধিতা করতে ব্যাস্ত। ওই দেশের তদারকি সরকারের অভ্যন্তরেও যেখানে ভারত বিদ্বেষী কয়েকজন উপদেষ্টা আছেন। সেখানে দাঁড়িয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে বৈঠকে বসতে বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের আকুতি ছিল বেশ চোখে পড়ার মতো। আর তাৎপর্যপূর্ণভাবে লুকোচাপা করে তিনি এই আগ্রহ প্রকাশ করেননি। রীতিমতো ঘোষণা করে তাঁর সরকার জানিয়েছিল নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে বৈঠকে বসতে আগ্রহী মুহাম্মদ ইউনূস। একবার নয়, বারংবার। কিন্তু ভারত কোনও ভাবেই সাড়া দিচ্ছিলো না সেই প্রস্তাবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত নরেন্দ্র মোদি রাজি হলেন, বহু প্রতিক্ষিত বৈঠকটিও হল থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাঙ্ককে।
যদিও এই বৈঠক ঘিরে পরস্পর বিরোধী দাবি পরিস্থিতি আরও ঘোরালো করে তুলেছে। থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যঙ্ককে বিমসটেকের সম্মেলনের ফাঁকে শুক্রবার মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে আচমকাই বৈঠকে বসেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। এই বৈঠক কোনওভাবেই পূর্ব নির্ধারিত ছিল না। কারণ, ভারতের বিদেশমন্ত্রকের জারি করা প্রধানমন্ত্রীর সফরসূচিতে বাংলাদেশের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠকের কথা উল্লেথ ছিল না। এমনকি বাংলাদেশের তরফেও দাবি করা হয়েছিল, তাঁরা প্রস্তাব দিয়েছে, ভারত কোনও জবাব দেয়নি। তবে তাঁরা আশাবাদী বলেই দাবি করেছিলেন। এবার প্রশ্ন হল, বাংলাদেশের জোরাজুরিতে যদিও বা এই বৈঠক হল, তাতে কার কতটা লাভ হল?
বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যম এবং সে দেশের প্রেস সচিব অবশ্য দাবি করছে এই বৈঠক যথেষ্টই ফলপ্রসু। তাঁদের আরও দাবি, প্রথম বৈঠকেই মুহাম্মদ ইউনূস ভারতের প্রধানমন্ত্রীর কাছে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ চেয়েছেন, তিস্তা, গঙ্গার ন্যয্য জলবন্টন চুক্তি দাবি করেছেন। অর্থাৎ, গত বছরের ৫ আগস্ট পরবর্তী সময় থেকে আট মাস পর ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে এই প্রথম সাক্ষাতেই ছক্কা মেরেছেন মুহাম্মদ ইউনূস। অন্যদিকে ভারতের বিদেশসচিবের সাংবাদিক সম্মেলনে ঠিক পাল্টা দাবি শোনা গেল। শেখ হাসিনার প্রসঙ্গ উঠতেই ভারতের বিদেশসচিব বললেন, প্রসঙ্গ উঠেছিল দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে, তবে তা বলার মতো কিছু নেই। অন্যদিকে তাঁর দাবি, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টাকে বেশ কয়েকটি বিষয়ে ভারতের উদ্বেগের কথা জানিয়েছেন। সেই সঙ্গে আশা প্রকাশ করেছেন বাংলাদেশ ভারতের এই উদ্বেগ মেটাতে উদ্যোগী হবে। বিশেষ করে হিন্দুদের উপর অত্যাচার বন্ধ এবং তাঁদের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করার বিষয়টি নিয়ে সরব হন নরেন্দ্র মোদি। পাশাপাশি, তিনি দুই দেশের জনগণের স্বার্থভিত্তিক সুসম্পর্ক চেয়েছেন। ফলে বোঝাই যাচ্ছে, শীর্ষ বৈঠকের শেষে দুই দেশের তরফে দেওয়া বিবৃতিতে যথেষ্টই ফারাক রয়েছে। আরও তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল কোনও যৌথ বিবৃতি জারি করা হয়নি।
এবার আসা যাক, মোদ্দা কথায়। জানা গিয়েছে শেষ মুহূর্তে ঠিক হওয়া এই বৈঠক হয়েছে মাত্র ৪০ মিনিটের। জানা যাচ্ছে এর মধ্যে মুহাম্মদ ইউনূসের জন্য বরাদ্দ ছিল মাত্র ১২ মিনিট। আর নরেন্দ্র মোদি খুব কম কথা বলেছেন। বৈঠকে ভারতের তরফে বক্তব্য রেখেছেন বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর। ফলে বোঝাই যাচ্ছে, ভারত এই বৈঠককে ঠিক কি মর্যাদা দিয়েছে। এবার আসি নরেন্দ্র মোদির ফেসবুক পোস্টের বিষয়ে। সেখানে তিনি লিখেছেন, ভারত বাংলাদেশের সাথে গঠনমূলক এবং জনকেন্দ্রিক সম্পর্কের প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আমি বাংলাদেশে শান্তি, স্থিতিশীলতা, অন্তর্ভুক্তি এবং গণতন্ত্রের প্রতি ভারতের সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছি। পাশাপাশি তিনি লিখেছেন, অবৈধ সীমান্ত অতিক্রম রোধে ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা করেছি এবং হিন্দু এবং অন্যান্য সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা ও কল্যাণের জন্য আমাদের গুরুতর উদ্বেগ প্রকাশ করেছি। কূটনৈতিক মহলের ব্যাখ্যা, ভারতের প্রধানমন্ত্রী ওই ফেসবুক পোস্টে পরিস্কার বুঝিয়ে দিয়েছেন, বাংলাদেশে এই মুহূর্তে শান্তি নেই, স্থিতিশীলতা নেই এবং অন্তর্ভূক্তিমূলক গণতন্ত্র নেই। তাই ভারত এই বিষয়ে উদ্বিগ্ন।
আসলে এক ঢিলে দুটি পাখি মেরেছেন নরেন্দ্র মোদি। প্রথমত, বৈঠকে বসতে রাজি হয়ে নরেন্দ্র মোদি গোটা বিশ্বকে বার্তা দিলেন যে ভারত সবসময় সুসম্পর্ক বজায় রাখতে চায়। অন্যদিকে নিজে কম কথা বলে বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে আলোচনায় ভারতের বিদেশমন্ত্রীকে এগিয়ে দিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছেন, ভারত আসলে এই অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে একদমই পাত্তা দিতে নারাজ। না হলে এই শীর্ষ বৈঠকে কেন বিদেশমন্ত্রী কথা বলবেন? আর মাত্র ৪০ মিনিট সময়ে কিভাবে একটা দ্বিপাক্ষিক বৈঠক সুসম্পন্ন হয়? যেখানে বাংলাদেশ দাবি করেছে স্বার্থ সম্বলিত সবগুলি বিষয়েই আলোচনা হয়েছে। এত কম সময়ে এত বিষয়ে আলোচনা কি আদৌ সম্ভব? এমনটাই প্রশ্ন উঠছে কূটনৈতিক মহলে। আবার, বাংলাদেশ প্রসঙ্গ তুললেও শেখ হাসিনার প্রত্যর্পন নিয়ে যে সেভাবে আলোচনার অবকাশই দেয়নি ভারত, সেটাও এখন পরিস্কার। ফলে বাংলাদেশ যতই লম্ফঝম্ফ করুক না কেন, আসলে এই বৈঠকে ভারত চেয়েছিল সরাসরি বাংলাদেশকে একটা কড়া বার্তা দিতে। যা নরেন্দ্র মোদির সফল কূটনৈতিক একটা চাল।
Discussion about this post