নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন ইউনাইটেড লিবারেশন ফ্রন্ট অফ আসাম-ইন্ডিপেন্ডেন্ট বা উলফা-আই অভিযোগ করল তাঁদের সদর ঘাঁটি-সহ একাধিক জায়গায় ড্রোন হামলা হয়েছে। রবিবার জারি করা এক প্রেস বিবৃতিতে, উলফা-আই দাবি করেছে যে ভোররাতে ভারতীয় সীমান্তের কাছে মায়ানমারের ভূখণ্ডে তাদের বেশ কয়েকটি ঘাঁটি লক্ষ্য করে ভয়াবহ ড্রোন হামলা চালানো হয়েছে। তাঁদের অভিযোগের তির ভারতীয় সেনার দিকে। যদিও ভারতীয় সেনা বা বিমানবাহিনী কেউই এই ধরণের কোনও হামলা চালানোর দাবি নস্যাৎ করে দিয়েছে। সবমিলিয়ে একটা ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে এই হামলা ঘিরে। কে বা কারা উলফা-আই ঘাঁটিতে হামলা চালালো, তা নিয়ে রহস্য থেকেই গেল।
মায়ানমারের পূর্ব সীমান্তে গভীর জঙ্গলের ভিতর তাদের সদর দফতরে হামলা হয়েছে বলে রবিবার দাবি করেছে উলফা-আই। বিবৃতি প্রকাশ করে ওই নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন জানিয়েছে, ভারতের হামলায় তাঁদের ১৯ জন ক্যাডার নিহত হয়েছে। এমনকি একজন শীর্ষ কমান্ডার নয়ন মেধিও রয়েছে নিহতদের তালিকায়। ওই বিবৃতিতে বলা হয়েছে যে মণিপুরের পিপলস লিবারেশন আর্মির বা পিএলএ-এর রাজনৈতিক শাখা রেভোলিউশনারি পিপলস ফ্রন্ট-সহ অন্যান্য বিদ্রোহী সংগঠনের সদস্যরাও ওই ক্যাম্পে উপস্থিত ছিল। এবং হতাহতদের মধ্যে তাদেরও অনেকে আছে। প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এমন নিখুঁদ বহুমুখী হামলা একমাত্র ভারতীয় সেনার পক্ষেই সম্ভব। মিয়ানমার সেনার পক্ষে এই ধরণের হামলা চালানোর ক্ষমতা নেই। কিন্তু ভারত সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছে কোনও ড্রোন হামলা নিয়ে।
বিভিন্ন সূত্র মারফত জানা যাচ্ছে, মিয়ানমার ভুখন্ডে ভারতের সীমান্তের নিকটবর্তী জঙ্গলে পলাতক জঙ্গিনেতা পরেশ বড়ুয়ার নেতৃত্বে উলফা-আইয়ের সীমিত অপারেশনাল ঘাঁটি রয়েছে। অরুণোদয় দোহোটিয়াই এই অঞ্চলে সক্রিয় একমাত্র সিনিয়র কমান্ডার। আরেকজন গুরুত্বপূর্ণ উলফা নেতা রূপম অসমকে চলতি বছরের মে মাসে আসাম পুলিশ গ্রেফতার করেছিল। মনে করা হচ্ছে, তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করেই মিয়ানমারের অভ্যন্তরে উলফা ও অন্যান্য জঙ্গি সংগঠনের ঘাঁটিগুলির অবস্থান সম্পর্কে নিখুঁদ তথ্য ভারতীয় সেনার হাতে এসেছিল। এরপরই এই সার্জিকাল স্ট্রাইক।
ভারত-মিয়ানমার সীমান্ত দীর্ঘদিন ধরে বিদ্রোহী কার্যকলাপের জন্য একটি হটস্পট হয়ে দাঁড়িয়েছে। যেখানে জঙ্গি গোষ্ঠীগুলি প্রায়শই ঘাঁটি স্থাপনের জন্য কাঁটাতার বিহীন সীমান্ত ব্যবহার করে। কিন্তু ওই অঞ্চলগুলি এতটাই দুর্গম ও ঘন জঙ্গলের মধ্যে অবস্থিত যে মিয়ানমারের নিরাপত্তাবাহিনী সেখানে পৌঁছতেই পারে না। ভারতও এতদিন নিজেদের ভুখন্ডেই অপারেশন চালিয়ে এসেছে। কিন্তু অপারেশন সিঁদুরের পর, পরিস্থিতি বদলেছে। নরেন্দ্র মোদি সরকার স্পষ্ট করে দিয়েছে যে ভারতের বিরুদ্ধে যে কোনও জঙ্গি কার্যকলাপ যুদ্ধের হুমকি হিসেবে দেখা হবে, এবং সেটা যে কোনও দেশেই হোক ভারত প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। ভারত এর আগে পাকিস্তানে সার্জিকাল স্ট্রাইক করেছে, সম্প্রতি অপারেশন সিঁদুর চালিয়েছে পাকিস্তানের ভুখন্ডে। এবার কি তবে মিয়ানমার ভুখন্ডেও সার্জিকাল স্ট্রাইক হল?
মিয়েনমারে এই ড্রোন হামলা অনেকগুলি দেশকে বার্তা দেওয়া গেল বলে মনে করছেন প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞরা। সম্প্রতি বাংলাদেশে পাকিস্তান আইএসআই কর্তাদের আনাগোনা বেড়ে গিয়েছে। তারা বিভিন্ন জঙ্গি সংগঠন গুলিকে প্রশিক্ষণ ও অস্ত্রশস্ত্র দিয়ে সাহায্য করছিল বলেও গোয়েন্দাদের কাছে রিপোর্ট ছিল। অন্যদিকে ঊলফা প্রধান পরেশ বড়ুয়ার যাবজ্জীবন সাজা কমিয়ে ১৪ বছর করেছে বাংলাদেশের হাইকোর্ট। মুহাম্মদ ইউনূস ক্ষমতায় আসার পর বাংলাদেশের অন্তরবর্তীকালীন সরকার পরেশ বড়ুয়া নিয়ে নরম মনোভাব ব্যক্ত করেছে। যা ভারতের নজর এড়ায়নি। কিন্তু পরেশ বড়ুয়া পলাতক। ভারতীয় গোয়েন্দাদের ধারণা তিনি মিয়ানমার সীমান্তেই রয়েছেন। এই হামলার নিশানা তিনিই ছিলেন। রবিবার ভোররাতে চালানো এই ড্রোন হামলায় প্রায় ২২ জন জঙ্গির মৃত্যু হয়েছে বলে খবর। অন্তত ১৭টি জঙ্গি ঘাঁটি গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। উলফা-সহ একাধিক জঙ্গি সংগঠনের অস্ত্রভান্ডার ধ্বংস হয়েছে। জানা যাচ্ছে, উলফা সদর দফতরে এক শীর্ষ জঙ্গি নেতার মরদেহে শ্রদ্ধা জানাতে একাধিক শীর্ষ জঙ্গি জড়ো হয়েছিল। সেখানেই ড্রোন হামলা হয়েছে। ফলে বোঝাই যাচ্ছে, কতটা নিখুঁত পরিকল্পনা ছিল। এই এক হামলায় বাংলাদেশকে একটা বড় বার্তা পাঠানো গেল বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞ মহল। কারণ, মিয়ানমারে যদি ভারত সার্জিকাল স্ট্রাইক করতে পারে, তাহলে পরের লক্ষ্যই হবে বাংলাদেশ।












Discussion about this post