রাশিয়ান প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন বৃহস্পতিবার থেকে দুই দিনের ভারত সফর শুরু করছেন। তাঁর এই ভারত সফর ঘিরে কৌতুহলের দৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়েছেন গোটা বিশ্বের কূটনৈতিক মহল। বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ট্রাম্প প্রশাসন। রাশিয়ার থেকে তেল কেনা নিয়ে মার্কিন আপত্তি এবং ভারতের উপর বাড়তি শুল্ক বা ট্যারিফ চাপিয়ে দেওয়ার বিষয়টি এখন সকলেই জানেন। এই আবহে কেউ কেউ দাবি করছেন, মার্কিন চাপের কারণে ভারতের তেল কম কেনায় রাশিয়ার ক্ষতিগ্রস্ত জ্বালানি ও প্রতিরক্ষা সম্পর্ক পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যেই পুতিন ভারতে আসছেন। কিন্তু সেটা যে ভ্রান্ত ধারণা তা স্পষ্ট। কারণ, পুতিনের ভারত সফর পূর্ব পরিকল্পিত। যদিও তাঁর ভারত সফর কিছুটা সময় এগিয়ে এসেছে বলেই জানা যাচ্ছে। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের দাবি অনুযায়ী, রাশিয়া কয়েক দশক ধরে ভারতকে অস্ত্র সরবরাহ করে আসছে। কিন্তু ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে মস্কো ইউক্রেনে আক্রমণ শুরু করার পর পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও নয়াদিল্লি সমুদ্রপথে তেলের শীর্ষ ক্রেতা হিসেবে নিজেকে তুলে ধরে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে রাশিয়ার উপর নিষেধাজ্ঞা কঠোর করার পর ভারত নাকি রাশিয়া থেকে তেল আমদানি কমিয়েছে। যদিও পুতিনের এই সফর দিল্লির জন্য মস্কোর সাথে ভারতের বিশেষ সম্পর্কের শক্তি পুনরুজ্জীবিত করার এবং নতুন অস্ত্র চুক্তিতে অগ্রগতি অর্জনের সুযোগ করে দিয়েছে।
সূত্রের খবর, রাশিয়ার সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য বৃদ্ধিতে মরিয়া ভারত। কিন্তু ইউক্রেনের যুদ্ধ ভারতীয় পররাষ্ট্রনীতির জন্য একটি গুরুতর চ্যালেঞ্জ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিল। এটা রাশিয়া এবং পশ্চিমা বিশ্বের সাথে ভারতের সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি সূক্ষ্ম ভারসাম্যমূলক নীতির একটা পরীক্ষা বলেই মনে করছেন ওয়াকিবহাল মহল। ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের জুলাইয়ের মধ্যে মনে হয়েছিল যে নয়াদিল্লির দৃষ্টিভঙ্গি রাশিয়ার দিক থেকে সরে আসবে না। কিন্তু মার্কিন দাবি অনেকটাই খেলা ঘুরিয়ে দিল। ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করে বসলেন, ভারত যদি রাশিয়ার থেকে তেল কেনে তাহলে ভারতের উপর ৩০০-৩৫০ শতাংশ ট্যারিফ চাপিয়ে দেওয়া হবে। কিন্তু ভারত পিছু হটলো না। ভারত যথারীতি রাশিয়া থেকে তেল কেনা চালিয়ে যায়। ২০২১-২২ অর্থবছরে বাণিজ্যের পরিমাণ ১৩.১ বিলিয়ন ডলার থেকে থেকে বেড়ে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৬৮.৭ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছে যায়। এই প্রবৃদ্ধি মূলত ভারতের বৃহত্তম তেল সরবরাহকারী হিসেবে রাশিয়ার আবির্ভাবের কারণে হয়েছে। যা মূল্যের দিক থেকে ভারতের মোট তেল আমদানির প্রায় ৩৫ শতাংশ বলেই জানা গিয়েছে ভারতের বাণিজ্য মন্ত্রকের সূত্র মারফত। এই আবহেই ২০২৪ সালের জুলাই এবং অক্টোবর মাসে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির মস্কো এবং কাজান সফর পরিস্থিতি পাল্টে যায়। পরবর্তী সময় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অনেকবার দাবি করেছেন যে ভারত নাকি রাশিয়া থেকে তেল কেনা কমিয়ে দিয়েছে। কিন্তু আদৌ কি তাই?
সূত্রের খবর, প্রধান রাশিয়ান তেল কোম্পানি রোসনেফ্ট এবং লুকোয়েলের উপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা আরোপের পরও ভারতের কয়েকটি রাষ্ট্রায়ত্ত এবং বেসরকারি তেল পরিশোধকরা অনুমোদনবিহীন অপরিশোধিত তেল সংগ্রহ করছে। এবং তাও লাভজনক ছাড়ে! আর এটা করা হচ্ছে এমন একটা উপায়ে, যা কার্যত নজিরবিহীন। যেহেতু রাশিয়ার সমস্ত তেল সংস্থা নিষেধাজ্ঞার আওতায় আসে না, তাই ভারত অ-অনুমোদিত সংস্থাগুলি থেকে অপরিশোধিত তেল সংগ্রহের দিকে মনোনিবেশ করেছে বলে মনে হচ্ছে। বিশ্লেষকদের প্রশ্ন, চলতি মাসে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লদিমির পুতিন ভারতে এসে কোন কোন বিষয়ে চুক্তি করতে চলেছেন?
যেটা জানা যাচ্ছে, ২৩তম ভারত-রাশিয়া বার্ষিক শীর্ষ সম্মেলনে যোগদানের জন্য ৪-৫ ডিসেম্বর ২০২৫ ভারতে থাকবেন পুতিন। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে রুশ প্রেসিডেন্টের বৈঠকে দুই দেশের প্রতিরক্ষা সহযোগিতার বিষয়ে আলোচনা হবে। যেটা মনে করা হচ্ছে অপারেশন সিঁদূরের সময় মূলত পাকিস্তানকে সায়েস্তা করা ‘সুদর্শন চক্র’বা এস-৪০০ নিয়ে নয়া চুক্তির বিষয়ে কথা হতে পারে। এই বিষয়ে দিল্লি রাজি হলে রুশ সমরাস্ত্রে নির্ভরতা বাড়াবে মস্কো। তবে বেশিরভাগটাই হবে প্রযুক্তি হস্তান্তরের মাধ্যমে অর্থাৎ এস ৪০০ হোক বা অন্যান্য সমরাস্ত্র ভারতেই তৈরি হবে রুশ সহযোগিতায়। এর মধ্যে পঞ্চম প্রজন্মের ফাইটার জেট এসইউ-৫৭ নিয়েও চুক্তি হতে পারে ভারত ও রাশিয়ার। যদিও অনেক প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞরা দাবি করেছেন, এসইউ-৫৭ যুদ্ধবিমানে কিছু ত্রুটি রয়েছে, তবে তা হয়তো ভারতের সাথে চুক্তি হতে বাঁধা হয়ে দাঁড়াবে না। কারণ, যে ত্রুটি রয়েছে সেটা ভারতের গবেষণা সংস্থা ডিআরডিও মিটিয়ে নেবে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির আত্মনির্ভর ভারতের উপর যে জোর দিয়েছেন, তাঁকে সমর্থন করেছেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লদিমির পুতিন। সূত্রের খবর, পুতিন ভারতে আসার আগেই রাশিয়ার পার্লামেন্ট থেকে ভারতের সঙ্গে প্রতিরক্ষা চুক্তি নিয়ে প্রস্তাব পাস করে আসছেন। অর্থাৎ, তৈরি হয়েই আসছেন পুতিন। যা কার্যত হৃদকম্প বাড়াতে পারে পাকিস্তান ও বাংলাদেশের।












Discussion about this post