বাংলাদেশকে কেন্দ্র করে ভূ-রাজনীতি ক্রমশ জটিল হচ্ছে। বাংলাডশের ভুখন্ড ব্যবহার করে মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশে ত্রাণ ও জরুরি সহায়তা পাঠানোর জন্য একটি মানবিক করিডোর দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল মুহাম্মদ ইউনূস সরকার। যা রীতিমতো খারিজ করে দিয়েছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। বাংলাদেশের অন্তরবর্তীকালীন সরকারকে সেনা স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছে এই ধরণের কোনও করিডোর দিতে রাজি হবে না সেনাবাহিনী। যা নিয়ে ক্রমশ জটিল হচ্ছে বাংলাদেশের রাজনীতি।
রাখাইন মানবিক করিডোর কেন দিতে চায় বাংলাদেশ সরকার? তাঁদের বক্তব্য, জাতিসংঘ এই করিডোর তৈরি করে মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশে মানবিক সাহায্য ও ত্রাণ পাঠাতে চায়। কিন্তু এর পিছনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উৎসাহ যে সবচেয়ে বেশি, সেটা বুঝতে বাকি নেই করোও। এই করিডোর দিতে হলে বাংলাদেশের চট্টগ্রামের কক্সবাজারে একটি লজিস্টিক হাব তৈরি করতে হবে। যা তৈরি করছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। মূল আপত্তি এখানেই। কারণ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যদি কক্সবাজারে লজিস্টিক হাবের আড়ালে তাঁদের সামরিক ঘাঁটি তৈরি করে নেয়, তাহলে তা হবে গোটা দক্ষিণ এশিয়ার জন্যই বিপজ্জনক। ফলে গোটা প্রক্রিয়ার দিকে নজর রাখছে ভারত, চিন ও রাশিয়ার মতো শক্তিশালী দেশগুলি। বাংলাদেশ সেনা এই বিষয়ে সচেতন, তাই তাঁরা খারিজ করেছে মুহাম্মদ ইউনূস, খলিলুর রহমানদের এই সিদ্ধান্ত। এখন প্রশ্ন হল, বাংলাদেশ সেনার থেকে বাঁধা পেয়ে কি পিছিয়ে এলেন ইউনূসরা? আজ্ঞে না, এই করিডোর নিয়ে তাঁরা এখনও আশা ছাড়েননি। বরং, যত আলাপ আলোচনা এবার শুরু হয়েছে বাংলাদেশ থেকে কয়েক হাজার কিলোমিটার দূরে কাতারে।
বলা হচ্ছে, বাংলাদেশকে কেন্দ্র করে ভূ-রাজনীতি এবং রাখাইন রাজ্যে “মানবিক করিডোরের” বিতর্কিত প্রস্তাব ও পরিকল্পনার সাথে এখন অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত হয়ে গিয়েছে কাতার। উল্লেখ্য, ঢাকায় অবস্থিত মার্কিন চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স ট্রেসি অ্যান জ্যাকবসন গত ২২ মে কাতারের রাজধানী দোহায় পৌছোন। জানা যায় ওই একই ফ্লাইট বা পরদিন দোহায় পৌঁছয় বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমান। কাতারের রাজধানী ঢাকায় ২৬ ও ২৭ মে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে যোগ দেন তাঁরা। ওই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন, মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থার কয়েকজন শীর্ষ আধিকারিক, জাতিসংঘের জেনারেল সেক্রেটারির অফিসের শীর্ষ আধিকারিক এবং ওপেন সোসাইটির কয়েকজন কর্মকর্তা। এই ওপেন সোসাইটি হল মার্কিন ধনকুবের জর্জ সোরসের একটি সংস্থা, যারা মার্কিন ডিপ স্টেস্টের হয়ে কাজ করে। সূত্রের খবর, ওই বৈঠকে রাখাইন মানবিক করিডোর নিয়ে পরবর্তী পদক্ষেপ কি হতে পারে সেটা নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
আরও জানা যাচ্ছে, দোহা উড়ে গিয়েছেন বাংলাদেশ জামায়তে ইসলামীর আমীর ডঃ শফিকুর রহমানও। যদিও তিনি এই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন কিনা জানা যায়নি। তবে গত শনিবার তিনি সাক্ষাৎ করেছিলেন বাংলাদেশের সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার উজ জামানের সঙ্গে। ফলে নির্দিষ্ট কোনও মধ্যস্ততা যদি হয়েই থাকে, বা তাঁদের মধ্যে কি আলোচনা হয়েছে সেটা নিয়েও দোহায় আলাদা বৈঠক করতে পারেন জামাত আমীর। তবে এ ব্যাপারে স্পষ্ট যে রাখাইন মানবিক করিডোর নিয়ে এখনও আশা ছাড়েনি মুহাম্মদ ইউনূস ও খলিলুর রহমানরা। আশা ছাড়েনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও।
অন্যদিকে প্রস্তাবিত এই করিডোর নিয়ে মিয়ানমার যে যথেষ্টই বিরক্ত, সেটা এখন পরিষ্কার। কারণ রাখাইন প্রদেশের দখল যতই আরাকান আর্মির হাতে চলে যাক, মিয়ানমারের প্রকৃত শাসক এখনও জুন্টা বাহিনী। ফলে তাঁদের এড়িয়ে আরাকান আর্মিকে কি সহায়তা দেওয়া হচ্ছে, বা কেনই দেওয়া হচ্ছে সেটা নিয়ে উঠছে প্রশ্ন। সূত্রের খবর, এর আগে মিয়ানমারে বাংলাদেশ দূতাবাসের সামরিক কর্মকর্তাকে দেশ ছাড়তে বলেছিল মিয়ানমার। এবার বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মো. মনোয়ার হোসেনকেই অবাঞ্ছিত ঘোষণা করে ছয় ঘন্টার মধ্যে দেশ ছাড়তে বলেছে মিয়ানমার। যা বাংলাদেশের ইতিহাসে এই প্রথমবার ঘটল, যে কোনও দেশ তাঁদের রাষ্ট্রদূতকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করে দেশ থেকে তাড়িয়ে দিল। এতেই স্পষ্ট মিয়ানমারের সেনাশাসকদের মনোভাব। ফলে করিডোর ইস্যুতে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এগোলেও বিপদ, পিছলেও বিপদ। এখন দেখার, কিভাবে এই পরিস্থিতি মোকাবিলা করেন খলিলুর রহমান।












Discussion about this post