বাংলায় একটা প্রবাদ আছে, “যত দোষ নন্দ ঘোষ”। এই নন্দ ঘোষটি আসলে কে, তা আমরা কেউ জানি না। কিন্তু কোনও একজনের উপর দোষ চাপিয়ে যখন অনেক গুরুতর অপরাধ থেকে রেহাই পাওয়া যায়, তখনই এই প্রবাদটা বলেন অনেকে। ঠিক যেমন বাংলাদেশের বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। যারা উঠে পড়ে লেগেছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানকে অপমানিত করতে, অসম্মানিত করতে। কখনও তাঁর বঙ্গবন্ধু স্বীকৃতি কেঁড়ে নেওয়া হচ্ছে, কখনও তাঁর লেখা গল্প পাঠ্যপুস্তক থেকে সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে, কখনও ইতিহাসের পাতা থেকে তাঁর জীবনী, বক্তৃতা বা গল্প মুছে ফেলা হচ্ছে। এবার তো তাঁকেই মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে বাতিল করে দেওয়া হল রীতিমতো অধ্যাদেশ জারি করে। তারপর দেশ ও বিদেশে ঢিঁ ঢিঁ পড়তেই পাল্টি। যত দোষ নন্দ ঘোষ হিসেবে সামনে নিয়ে আসা হল সংবাদমাধ্যমকে। যে সংবাদ মাধ্যমের কোমড় ভেঙে দিয়েছে ইউনূস সরকার। যে সংবাদ মাধ্যম সত্যনিষ্ঠ খবর পরিবেশন করলেই তাঁদের দফতর ভাঙচুর করে আসে মব জাস্টিসের নামে একদল উশৃঙ্খল জনতা। সেই নখদন্তহীন বাংলাদেশের মিডিয়াকে শীখণ্ডী খাঁড়া করে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ফারুক ই আজম জানিয়ে দিলেন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান-সহ সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দিন আহমেদ, মো. মনসুর আলি ও এএইচএম কামরুজ্জামানের মুক্তিযোদ্ধা স্বীকৃতি থাকবে। তাঁরা ‘বীর মুক্তিযোদ্ধা’ হিসেবে বিবেচিত হবেন। তাঁর হাস্যকর দাবি, ‘সংবাদ মাধ্যম ‘মিসলিড’ হয়েছে অর্থাৎ, ভুল পথে চালিত হচ্ছে।
প্রসঙ্গত, গত মঙ্গলবারই এক অধ্যাদেশ জারি করে, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দেওয়া শেখ মুজিবুর রহমান, সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দিন আহমদ-সহ ৪০০-র বেশি রাজনীতিকের মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি বাতিল করে দিয়েছিল ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। বাংলাদেশের জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল “জামুকা” ওই অধ্যাদেশ জারি করেছিল। মঙ্গলবার রাতে রাষ্ট্রপতির আদেশে এই অধ্যাদেশ পাশ হয় লেজিসলেটিভ ও সংসদ বিভাগ থেকে। ওই অধ্যাদেশ অনুযায়ী, শুধু মুক্তিযুদ্ধকালীন প্রবাসী সরকারই নয়, আরও চার ধরনের স্বীকৃতি থাকা মুক্তিযোদ্ধার পরিচয় ‘মুক্তিযুদ্ধের সহকারী’ হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছিল। অর্থাৎ, তাঁরা মুক্তিযোদ্ধা নন, তাঁরা হলেন মুক্তিযুদ্ধের সহকারী। ২০২২ সালের জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল আইন অনুযায়ী, শেখ মুজিবুর রহমান-সহ প্রবাসী সরকারের এমএনএ, এমপিএ এবং উল্লিখিত চার শ্রেণির লোকজন ‘বীর মুক্তিযোদ্ধা’ হিসেবে স্বীকৃত ছিলেন। নতুন অধ্যাদেশে তাঁরা সহকারী হয়ে গেলেন। এই অধ্যাদেশ সামনে আসতেই বাংলাদেশ জুড়ে বিতর্ক সৃষ্টি হয়। এমনকি ভারত ও অন্যান্য দেশেও ছি ছি পড়ে যায়। চারদিক থেকে চাপ আসতে শুরু করে মুহাম্মদ ইউনূসের সরকারের বিরুদ্ধে। ফলে তড়িঘড়ি ড্যামেজ কল্ট্রোলের ব্যবস্থা করেন মুহাম্মদ ইউনূস।
পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে যারা অসম সাহসীকতার পরিচয় দিয়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন, বাংলাদেশের তদারকি সরকার তাঁদেরই স্বীকৃতি বাতিল করতে মরিয়া চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। প্রথমে কোটা বিরোধী আন্দোলন দিয়ে যার শুরু, তারপর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের কন্যা শেখ হাসিনার সরকারের পতন দিয়েই শেষ হয়নি। কোটা বিরোধী আন্দোলনও ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের দেওয়া সরকারি চাকরি বাতিলের দাবিতে। যারা এই আন্দোলন পরিচালনা করেছিল, যেমন জামায়তে ইসলামী এবং বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতারা ঘোষিতভাবেই মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী। বাংলাদেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একটা অংশ সরাসরি দাবি করেন, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র নেতারা আসলে রাজাকারদের বংশধর। এই রাজাকাররাই মুক্তিযুদ্ধের সময়ে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে সাহায্য করেছিল। আবার তৎকালীন জামাত নেতৃত্ব আল বদর এবং আল সামস নামে তাঁদের দুই ছায়া সংগঠনের মাধ্যমে পাকিস্তানী সেনাদের যেমন সাহায্য করেছিল, তেমনই মহিলাদের উপর অকথ্য অত্যাচার ও ধর্ষণের জন্য সরবরাহ করেছিল। মুহাম্মদ ইউনূস ক্ষমতায় আসার পর একে একে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী তৎকালীন জামাত নেতাদের জেল থেকে ছেড়ে দিয়েছে সরকার। এখানেই শেষ নয়, বাংলাদেশে রাষ্ট্রসংঘের আবাসিক প্রতিনিধি গোয়েন লুইস বুধবার ঢাকায় এক অনুষ্ঠানে মন্তব্য করলেন, আওয়ামী লিগকে অংশ নিতে না দিলেও নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক বলে ধরা যেতেই পারে। এই মন্তব্য নিয়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক মহলে বিতর্কের ঝড় উঠেছে। অর্থাৎ, ইউনূস সরকার চাইছে, মুক্তিযুদ্ধ এবং আওয়ামী লীগকে বাংলাদেশ থেকে মুছে দিতে চাইছে।












Discussion about this post