বাংলাদেশের রাজনীতিতে ১৭ মাস মানে একটি যুগ। দীর্ঘ নীরবতা ভেঙে সামনে আসবেন শেখ হাসিনা। এমনটাই আশা করছিলেন দলের নেতা কর্মীরা। ২৩ জানুয়ারি, ২০২৬। স্থান নয়াদিল্লি। কূটনৈতিক এই শহরের এক গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ‘ফরেন করেসপন্ডেন্স ক্লাব অব সাউথ এশিয়া’। ঘর ভর্তি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধি, কূটনীতিক, বিশ্লেষক। আলোচনার শিরোনাম ‘Safe democracy in Bangladesh’. আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে একটি প্রশ্ন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ঠিক কী হচ্ছে? আর এটিই ছিল ২০২৪-য়ের ৫ অগাস্টের পর ভারতের মাটিতে আওয়ামী লীগ নেতাদের প্রথম সংবাদসম্মেলন। সবার অপেক্ষা ছিল একটি কণ্ঠের জন্য। একটি কণ্ঠ, যাকে গত ১৭ মাস ধরে প্রকাশ্যে শোনেনি। হঠাৎ অডিও চালু হয় – বাংলাদেশ আজ এক গভীর অতল গহ্বরের কিনারায়। মুহুর্তে মিলনায়তন নিস্তব্ধ। চির চেনা কণ্ঠস্বর।
১৭ মাস পর এই প্রথম কোনও আনুষ্ঠানিক বা জনসমক্ষে শোনা গেল ক্ষমতাচ্যূত বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কণ্ঠস্বর। তিনি মঞ্চে বা ক্যামেরায় ছিলেন না । ছিল শুধু তাঁর কণ্ঠ। মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশের সাবেক শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হক চৌধুরি নওফেল, সাবেক সংসদ সদস্য এ আরাফাত, ড. হাসান মাহমুদ। ভার্চুয়াল মাধ্যমে যোগ দিয়েছিলেন প্রাক্তন মন্ত্রী মোহাম্মদ আলি আরাফত।
প্রকাশ্যে না থেকেও হাসিনা আলোচনার মধ্যমণি হয়ে ওঠেন। দেশ ছাড়ার কয়েক মাস পর থেকেই তিনি ভার্চুয়াল মাধ্যমে দেশবাসী এবং আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের উদ্দেশ্য ভাষণ দিয়েছেন। হোয়াইটস অ্যাপ, টেলিগ্রাম এবং সিগন্যালের মত একাধিক প্লাটফর্মে তিনি নিয়মিত দলের তৃণমূল স্তরে নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলেন। এছাড়া আওয়ামী লিগের ফেসবুক পেজের নিয়মিত অনুষ্ঠান দায়মুক্তিতে অংশ নেন শেখ হাসিনা। তবে কোথাও তিনি ক্যামেরার মুখোমুখি হননি। শুক্রবারের অনুষ্ঠানেও তাঁকে ক্যামেরার সামনে আসতে দেখা যায়নি। তবে এই প্রথম দিল্লির কোন অনুষ্ঠানে সংযুক্ত হয়ে বিদেশি সাংবাদিকদের সামনে দেশের দূরবস্থার কথা তুলে ধরলেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী।
বক্তব্যের শুরুতেই হাসিনা বাংলাদেশকে আঁকেন এক অন্ধকার চিত্রে। তাঁর কথায় বাংলাদেশ এখন বিদ্যমান নৈরাজ্য। ইউনূসের নেতৃত্বাধীন ১৮ মাসের সরকারের সময় গোটা বাংলাদেশ এখন জেলখানায় পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধানকে কখনও ‘খুনি ফ্যাসিবাদী’, কখনও ‘সুদখোর’, কখনও ‘টাকা পাচারকারী’, আবার কখনও ‘ক্ষমতালোভী বিশ্বাসঘাতক’ বলেও আক্রমণ শানান হাসিনা। বাংলাদেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রীর আরও দাবি, ষড়যন্ত্র করেই ২০২৪ সালের অগাস্টে তাঁকে ক্ষমতা থেকে সরানো হয়েছে বস্তুত গত এক বছরের বেশি সময় ধরে বিভিন্ন ভার্চুয়াল সভায় দলীয় কর্মী সমর্থকদের সঙ্গে কথাও বলেন তিনি। তবে দিল্লিতে আয়োজিত কোনও কর্মসূচিতে শ্রোতাদের উদ্দেশ্য এমন অডিও বার্তা সাম্প্রতিক অতীতে ঘটেনি।
হাসিনার এই ভার্চুয়াল ভাষণ নিয়ে যে ঢাকা কড়া প্রতিক্রিয়া দেবে, তা নিয়ে কোনও সন্দেহ ছিল না। তাদের বিদেশ মন্ত্রক বিবৃতি জারি করে বলেছে, “ ২৩ জানুয়ারি নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত ওই অনুষ্ঠানে শেখ হাসিনা প্রকাশ্যে বাংলাদেশ সরকারের বিরুদ্ধে অবস্থান নেন এবং তাঁর দলের অনুসারী ও সাধারণ জনগণকে নির্বাচনকে ভণ্ডুল করতে সহিংস কর্মকাণ্ডে জড়ানোর আহ্বান জানান। বাংলাদেশ সরকার ও জনগণ এই ঘটনায় গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। ”
অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ‘‘আওয়ামি লিগ নেতৃত্বের এই বেপরোয়া উসকানি প্রমাণ করে কেন অন্তর্বর্তী সরকার দলটির কার্যক্রম নিষিদ্ধ করতে বাধ্য হয়েছে। আসন্ন নির্বাচনের আগে ও নির্বাচনের দিনে সংঘটিত যে কোনো সহিংসতা ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের জন্য সরকার আওয়ামি লীগকে দায়ী করবে এবং তাদের ষড়যন্ত্র প্রতিহত করতে প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’












Discussion about this post