শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত শেখ হাসিনার প্রত্যর্পনই যেন বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টার মূল উপলক্ষ ছিল। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে তাঁর বৈঠকের এই আকাঙ্ক্ষা সেই বিষয়টিই যেন তুলে ধরছে। জুন জুলাইয়ের গণবিপ্লবে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন এবং শেখ হাসিনার শাস্তি বা বিচার ছিল এক দফা দাবি। সেটা তো হলো কিন্তু হলো না শেখ হাসিনার বিচার। যা আজও বুকের মধ্যে একটু খচখচ করছে বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতাদের। তারা যাকে ফ্রান্স থেকে উড়িয়ে নিয়ে এসে বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টা করেছিলেন সেই মুহাম্মদ ইউনূসকে তাঁরা ক্রমাগত চাপ দিয়ে গিয়েছেন বাংলাদেশে হাসিনাকে ফেরত আনার জন্য। যাতে তদারকি সরকার ভারতের উপর চাপ সৃষ্টি করে হাসিনার প্রত্যর্পণ আদায় করতে পারে। কিন্তু সে গুড়ে বালি, ভারত এখনও হাসিনাকে নিয়ে কোনও কথাই বলেনি। এমনকি বাংলাদেশের তদারকি সরকারের দেওয়া একটি চিঠিরও জবাব দেয়নি।
ফলে অসহায় মুহাম্মদ ইউনুছের সামনে একটাই রাস্তা খোলা ছিল সেটা হল নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে সরাসরি সাক্ষাৎ। তাই সেই সেপ্টেম্বর মাস থেকে অন্তত তিনবার তিনি নরেন্দ্র মোদির সাক্ষাৎ প্রার্থনা করেছেন এবং শেষ পর্যন্ত সেই সাক্ষাৎ আদায় করতে সক্ষম হলেন। এর আগে নিউইয়র্কে রাষ্ট্রপুঞ্জের সাধারণ সভার বৈঠক তারপর চীন সফরের আগে দিল্লিতে নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে বৈঠকের আর্জি দুটোই নাকচ করেছেন নরেন্দ্র মোদি। এবার থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে বিমসটেক সম্মেলনের ফাঁকে একটা দ্বিপাক্ষিক বৈঠকের জন্য কাতর আর্জি জানিয়েছিল বাংলাদেশ সরকার। এখানেই শেষ নয় , বাংলাদেশের একাধিক আমলা ব্যাংককে ভারতীয় প্রতিনিধিদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করে মোদী ইউনুস বৈঠকের সম্ভাবনা উজ্জ্বল করার চেষ্টা করে গিয়েছেন। জানা যাচ্ছে বাংলাদেশের হাই রিপ্রেজেন্টেটিভ খলিলুর রহমান বৃহস্পতিবার রাতে কথা বলেন ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত ডোভালের সঙ্গে। তারপরেই বরফ গলে। শুক্রবার বৈঠকে বসতে রাজি হলেন নরেন্দ্র মোদি। বাংলাদেশের দাবি প্রথম বৈঠকেই মুহাম্মদ ইউনূস শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ চেয়ে বসেন ভারতের প্রধানমন্ত্রীর কাছে। এমনকি হাসিনা যে ভারতে বসে নানা ধরনের উস্কানিমূলক মন্তব্য করছেন সেটা নিয়েও প্রতিবাদ জানানো হয়।
অপরদিকে, শনিবার তিনি একটি ফেসবুক পোস্ট করেছেন। সেখানেও তিনি শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ চেয়ে প্রধান উপদেষ্টার জোরালো দাবির কথা তুলে ধরেছেন। ওই ফেসবুক পোস্টে ইউনূসকে উদ্দেশ্য করে মোদির দেওয়া আলাপ উদ্ধৃত করে তিনি লিখছেন “বৈঠকে তিনি বলেছেন যে শেখ হাসিনার সঙ্গে ভারতের ভালো সম্পর্ক থাকলেও, ‘আমরা আপনার প্রতি তার অসম্মানজনক আচরণ দেখেছি। তবুও আমরা আপনাকে সবসময় সম্মান ও মর্যাদা দিয়ে গেছি”। সেই সঙ্গে তিনি আরও লেখেন, “যখন অধ্যাপক ইউনূস শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের বিষয়টি উত্থাপন করেন, তখন মোদির প্রতিক্রিয়া নেতিবাচক ছিল না। আমরা আশাবাদী, শেখ হাসিনা একদিন ঢাকায় প্রত্যর্পণ হবেন এবং আমরা শতাব্দীর সেরা বিচার দেখব”। বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিবের এ হেন ফেসবুক পোস্ট দেখে বোঝাই যাচ্ছে, নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে ইউনূসের বৈঠক আয়োজনের মূল উদ্দেশ্যই ছিল সরাসরি হাসিনার প্রত্যর্পণ চাওয়া।
কিন্তু একটা বিষয়ে খটকা থেকেই গেল, হাসিনার বিষয়টি আলোচনার টেবিলে উঠেছিল স্বীকার করেও ভারত যেমন সরাসরি কোনও প্রতিক্রিয়া দেয়নি। তেমনই বাংলাদেশ ওই বিষয়টি বারবার উৎসাহ এবং উদ্দীপনার সঙ্গে উত্থাপন করলেও সরাসরি কিছু জানাচ্ছে না ভারত কি জবাব দিয়েছে। যা বলা হচ্ছে ভাববাচ্যে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক এবং কূটনৈতিক মহলের একাংশ দাবি করছেন, নরেন্দ্র মোদি তাঁর ফেসবুক পোস্টে মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে তাঁর বৈঠকের ছবি শেয়ার করে লিখেছেন, ভারত বাংলাদেশে ইনক্লুশিভ অর্থাৎ অন্তর্ভূক্তিমূলক গণতন্ত্র চায়। অর্থাৎ নির্বাচনের কথা সরাসরি না বলেও ভারত আওয়ামী লীগকে রেখেই নির্বাচনের নির্দেশ দিয়ে রাখলো। এটাই শেখ হাসিনাকে নিয়ে ভারতের অবস্থান। ফলে যতই লম্ফঝম্ফ করো না কেন, ভারত শেখ হাসিনাকেই চায় বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে।
Discussion about this post