ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ঠিক তিনদিন আগেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের শুল্ক চুক্তি স্বাক্ষর নিয়ে আজও আলোচনা হচ্ছে। বাংলাদেশে গত ১২ ফেব্রুয়ারি ছিল জাতীয় নির্বাচন এবং গণভোট। তার তিনদিন আগে ৯ ফেব্রুয়ারি ওয়াশিংটনে এই চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠান হয়েছে। এই বাণিজ্যচুক্তি স্বাক্ষর করে মুহাম্মদ ইউনূসের বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। এমনই একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়ে কঠোর গোপনীয়তা বজায় রেখে এই চুক্তি স্বাক্ষরের ঘটনা নানা কারণে উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। কিন্তু এই চুক্তিতে বাংলাদেশের স্বার্থ কতটা রক্ষিত হয়েছে, তা নিয়ে বহু প্রশ্নের জন্ম হয়েছে। প্রথমত বিগত ৯ ফেব্রুয়ারির চুক্তিতে বাংলাদেশের পণ্য রফতানির ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত পাল্টা শুল্কহার মাত্র ১ শতাংশ কমিয়ে ১৯ শতাংশ করা হয়েছে। আবার যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের পণ্য প্রবেশে বিদ্যমান সাধারণ গড় শুল্কহার সাড়ে ১৫ শতাংশ। অর্থাৎ দেশটির বাজারে বাংলাদেশি পণ্যে মোট শুল্কের পরিমাণ দাঁড়াচ্ছে সাড়ে ৩৪ শতাংশ। এর ফলে কতটা লাভ হল বাংলাদেশের, তা নিয়ে ইতিমধ্যেই প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক মহলে। অপরদিকে ইউনূস সরকার প্রচার করছিল, যুক্তরাষ্ট্রের তুলা বা সুতা ব্যবহার করে তৈরি পোশাক রফতানির ক্ষেত্রে এই ‘পাল্টা শুল্ক’ অব্যাহতি পাবে। কিন্তু তাও যে নানা শর্তযুক্ত, সেটা প্রথমে বলা হয়নি। সবমিলিয়ে একটাই প্রশ্ন দাঁড়াচ্ছে তা হল, সবমিলিয়ে সমস্ত শর্ত মেনে বাংলাদেশ ঠিক কতটা সুবিধা আদায় করতে পারলো!
নির্বাচনি ডামাডোলের মধ্যে বিগত ইউনূস সরকার গত ৯ ফেব্রুয়ারি যে চুক্তি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পন্ন করেছে, তা বাংলাদেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা সবচেয়ে বড় গোলামীর চুক্তি বলে আখ্যায়িত করছেন। এই চুক্তি নিয়ে নানা জন নানা কথা বললেও প্রায় সকলেরই মত হল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সর্বনাশা চুক্তি করে গিয়েছেন মুহাম্মদ ইউনূস। এই চুক্তিতে থাকা শর্তগুলো বিশ্লেষণ করে দেখা হচ্ছে তাতে বাংলাদেশের স্বার্থ কতটা রক্ষিত হয়েছে। জানা যায়, এই চুক্তির মাধ্যমে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের ৬ হাজার ৭১০টি পণ্যে শুল্কছাড় দেবে। উল্টোদিকে বাংলাদেশ পাবে মাত্র ১ হাজার ৬৩৮ পণ্যে পাল্টা শুল্কছাড়ের সুবিধা। পাশাপাশি এই চুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের পণ্য রফতানিতে অশুল্ক বাধা কমানোর ব্যাপারে গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। যেমন কিছু মার্কিন শিল্প ও চিকিৎসাপণ্য বাংলাদেশে রপ্তানির ক্ষেত্রে আবার পরীক্ষা ও বিপণন অনুমোদন নিতে হতো। যুক্তরাষ্ট্র এটাকে অশুল্ক বাধা হিসেবে চিহ্নিত করে দূর করার প্রতিশ্রুতি বাংলাদেশের কাছ থেকে আদায় করেছে। এখন বাংলাদেশকে যেসব ছাড় দিতে হবে, তার মধ্যে রয়েছে চিকিৎসা সরঞ্জাম ও ওষুধের ক্ষেত্রে এফডিএ সনদ ও পূর্ববর্তী বিপণন অনুমোদন গ্রহণ করা । মার্কিন ফেডারেল মোটরযান নিরাপত্তা ও নির্গমন মান অনুযায়ী নির্মিত যানবাহন গ্রহণ করা এবং মার্কিন কৃষি ও জৈব প্রযুক্তি পণ্যের প্রবেশের ক্ষেত্রেও পরীক্ষা–নিরীক্ষা বাদ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বাংলাদেশ। এই প্রতিশ্রুতিগুলোর মধ্যে রয়েছে মার্কিন খাদ্য ও কৃষিপণ্যের ক্ষেত্রে মার্কিন স্যানিটারি ও ফাইটোস্যানিটারি ব্যবস্থা এবং অন্যান্য মানদণ্ডকে বাংলাদেশের মানদণ্ডের বিকল্প হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া। যেমন মাংস-পোলট্রি-ডিম ইত্যাদির ক্ষেত্রে ইউএসডিএ ফুড সেফটি অ্যান্ড ইন্সপেকশন সার্ভিসের মানদণ্ডকে স্বীকৃতি দেওয়া বা বিভিন্ন জৈব প্রযুক্তি পণ্য বিনা পরীক্ষা ও বাড়তি কোনো লেবেলিং ছাড়াই বাংলাদেশে প্রবেশ করতে পারে সেটা নিশ্চিন্ত করা। এ সমস্ত অশুল্ক বাধা দূর করার অর্থ হল খাদ্য ও কৃষিপণ্য আমদানিতে জৈব নিরাপত্তা নিশ্চিতের ক্ষমতা হারানো। বলা হচ্ছে, আগে মার্কিন তুলা বাংলাদেশে আসার পর পোকা মারার রাসায়নিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হতো। এখন সেটা সম্ভব হবে না। আরও একটা প্রশ্ন উঠছে, সেটা হল ভারতের ট্রান্সশিপমেন্ট বাতিলের পর মার্কিন তুলা বা অন্যান্য পণ্য আমদানি এবং রফতানি খরচ কমবে কিভাবে! অর্থাৎ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শুল্ক চুক্তি এবং তার আগে করা অপ্রকাযশযোগ্য বাণিজ্যচুক্তি খুব একটা ফায়দা দেয়নি বাংলাদেশকে। কিন্তু মুহাম্মদ ইউনূস সরকার নিজ স্বার্থ সুরক্ষিত রাখতে সে সব চুক্তি করে রেখেছে মার্কিন যুক্তরাষ্টের সঙ্গে। যা তারেক রহমান সরকারের জন্য অবশ্যই মাথাব্যাথার কারণ।











Discussion about this post