সম্প্রতি বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও যুক্তরাষ্ট্রের প্যাসিফিক আর্মি কমান্ড যৌথ সামরিক এক্সারসাইজ করল। মিশন টাইগার লাইটনিং-২০২৫ নামে ওই যৌথ মহড়ার শেষ হল ৩০ জুলাই। বাংলাদেশের সিলেটে জালালাবাদ সেনানিবাসে অনুষ্ঠিত হয় এর সমাপনী অনুষ্ঠান। অনুষ্ঠানে অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ১৭ পদাতিক ডিভিশনের জিওসি ও সিলেট এরিয়ার এরিয়া কমান্ডার এবং ঢাকায় নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাসের চার্জ দ্যা অ্যাফেয়ার্স ট্রেসি এ্যান জ্যাকবসন। ২৪ জুলাই শুরু হওয়া এক সপ্তাহব্যাপী এই মহড়াটি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্যারা কমান্ডো ব্রিগেড এবং যুক্তরাষ্ট্রের নেভাডা ন্যাশনাল গার্ডের সদস্যরা অংশগ্রহণ করেছিলেন। যা নিয়ে বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যম উচ্ছ্বসিত। বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স ট্রেসি অ্যান জ্যাকবসন এই অনুষ্ঠানে বলেন, যৌথ সামরিক মহড়া টাইগার লাইটনিং বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে গভীর সহযোগিতার প্রতীক হিসেবে দাঁড়িয়েছে, যা বঙ্গোপসাগর এবং ইন্দো-প্রশান্ত মহাসাগরে নিরাপত্তা, শান্তি এবং সমৃদ্ধির জন্য অভিন্ন আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটায়।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আচমকা কেন বাংলাদেশের দিকে এতটা ঝুঁকলো? বর্তমান ভূ-রাজনীতিতে ইন্দো-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের গুরুত্ব অনেকটাই বেশি। বিদেশ করে দক্ষিণ এশিয়ার বাণিজ্যিক সমুদ্রপথে ভারত মহাসাগর ও বঙ্গোপসাগরের ভূমিকা অনেক। এই অঞ্চলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত অংশীদার হল ভারত। এই অঞ্চলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি কোনও সামরিক বা নৌঘাঁটি নেই। ওয়াশিংটন দীর্ঘদিন ধরেই এই অঞ্চলে একটা ঘাঁটি তৈরি করতে উদ্যোগী। যার জন্য তাঁরা টার্গেট করেছে বাংলাদেশকে। কারণ, মিয়ানমারে রাশিয়া ও চিনের ঘাঁটি রয়েছে। বাংলাদেশের সেন্ট মার্টিন দ্বীপের অবস্থান ভৌগলিকভাবে এতটাই সুবিধাজনক যে এখানে একটা মার্কিন ঘাঁটি তৈরি হলে, তাঁরা অনেকটাই কৌশলগত সুবিধা পাবে। তাই দীর্ঘদিন ধরেই আমেরিকা সেই চেষ্টায় আছে। কিন্তু আমেরিকার সেই ইচ্ছায় একমাত্র অন্তরায় ছিলেন শেখ হাসিনা। তিনি ভারত ও চিনের সঙ্গে সম দূরত্ব ও সম বন্ধুত্ব বজায় রেখে দক্ষিণ এশিয় অঞ্চলে একটা ভারসাম্য বজার রাখতেন। অন্যদিকে আমেরিকার সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক রাখলেও তাঁদের বাংলাদেশে ঘেঁষতে দিতেন না। এটা হাসিনার কূটনৈতিক দৃঢ়তার উদারহণ। তাই মার্কিন ডিপ স্টেটের এক চক্রান্তে তাঁকে সরতে হল। মুহাম্মদ ইউনূস ক্ষমতায় এসেই একটা ধাক্কা খেয়েছিলেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জো বাইডেনের দল ডেমোক্রাট প্রার্থী কমলা হ্যারিস হেরে যান আর রিপাবলিকান প্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্প জিতে যান। আর ট্রাম্প ও মুহাম্মদ ইউনূসের মধ্যে ব্যক্তিগত সম্পর্ক খুবই খারাপ। ফলে প্রথম দিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের মধ্যে সম্পর্কে কিছুটা ভাটা ছিল। কিন্তু সেন্ট মার্টিন প্রসঙ্গে তাতে ফের জোয়ারের জল ঢোকে। এই মিশন লাইটনিং টাইগার হল সেই জোয়ারের জল। অন্তত বিশেষজ্ঞ মহল তাই মনে করছেন।
অপরদিকে, ইউনূস সরকারের শেষ কয়েকমাসে বাংলাদেশে ঘনঘন মার্কিন সেনা আধিকারিকদের পদার্পণ বেশ উল্লেখযোগ্য দিক। সেন্ট মার্টিনে মার্কিন ঘাঁটি তৈরির আড়ালে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে মানবিক করিডোর তৈরির একটা প্রচেষ্টা হয়েছিল। প্রাথমিকভাবে এই বিষয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেয় জামাত, বিএনপি-সহ বাংলাদেশের বামপন্থী দলগুলি। বাংলাদেশের সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার উজ জামানও এর তীব্র বিরোধিতা করেন। ফলে পিছু হটতে বাধ্য হয় অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এই সুযোগ ছাড়তে নারাজ। জানা যাচ্ছে, বাংলাদেশে ঘনঘন সেনা কর্তাদের পাঠিয়ে এবং কক্সবাজার, চট্টগ্রামের বহু এলাকায় মার্কিন সেনার জন্য তাঁদের কৌশলগত ঘাঁটি তৈরি করতে উদ্যোগী হয়েছে। আর বাংলাদেশের সঙ্গে এই যৌথ মহড়াও সেই কৌশলের একটি অংশ। যদিও ওয়াকিবহাল মহল মনে করছে, চিন, রাশিয়া ও ভারত কড়া নজর রাখছে বাংলাদেশের ওপর। যা দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে আশঙ্কার কালো মেঘ। মুহাম্মদ ইউনূস তাই এখন এক কঠিন সময়ের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছেন।












Discussion about this post