বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন আর দিন ১৫ বাকি নেই। যদিও আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি একই দিনে বহুল প্রতীক্ষিত ও চর্চিত গণভোট অনুষ্ঠিত হবে বাংলাদেশে। বাংলাদেশের ওয়াকিবহাল মহলের ধারণা প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস, জাতীয় নির্বাচন নিয়ে যতটা না তৎপর তার থেকে কয়েক গুণ বেশি তৎপর গণভোট নিয়ে। কারণ এই গণভোট হল আসলে তাঁর তুরূপের শেষ তাস। আগামী দিনে তার বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হওয়ার স্বপ্ন পূরণ করতে পারে গণভোটে বিপুল সংখ্যায় “হ্যাঁ” ভোট পড়লে। তাই তিনি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে থাকা প্রায় সমস্ত প্রতিষ্ঠানকেই হ্যাঁ ভোট দেওয়ার বিষয়ে ব্যাপক মাত্রায় বিজ্ঞাপন দিতে কাজে লাগিয়েছেন। এমনকি তিনি নিজেও সরাসরি ভাষণে বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এই দিকেই প্রচার চালাচ্ছেন। আওয়ামী লীগ কে বাইরে রেখে প্রায় ত্রয়দশ জাতীয় নির্বাচন করানোর যে উদ্যোগ ইউনূস সাহেব নিয়েছেন তা হয়তো প্রাথমিকভাবে সফল। কিন্তু ভোটের মাত্র কয়েকদিন আগেই তিনি প্রবল ধাক্কা খেলেন। কারণ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবার ১৮০ ডিগ্রি ঘুরে গেল। বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আনুষ্ঠানিকভাবে পর্যবেক্ষক পাঠাবে না যুক্তরাষ্ট্র, যা তাঁরা স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিল। কূটনৈতিক পরিভাষায় এর অর্থ দাঁড়ায় যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এই নির্বাচনকে গুরুত্ব দিতে নারাজ।
যদিও বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যম গুলির দাবি, জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আনুষ্ঠানিকভাবে পর্যবেক্ষক না পাঠালেও যুক্তরাষ্ট্র থেকে একটি ‘ইনডিপেনডেন্ট’ বা স্বাধীন পর্যবেক্ষক দল আসবে। তাঁরা ঢাকা, সিলেট, চট্টগ্রাম ও খুলনায় নির্বাচন পর্যবেক্ষণে যাবেন স্বাধীনভাবে, এবং নিজ উদ্যোগে। তাঁরা কেবলমাত্র “ভোট” দেখতে যাবেন। এটাই কার্যত চাপে ফেলেছে মুহাম্মদ ইউনূসকে। বুধবার দুপুরে বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান।
জানা যাচ্ছে এর আগে বাংলাদেশের প্রধান নির্বাচন কমিশনার এম এম নাসির উদ্দীনের সঙ্গে বৈঠক করেন ঢাকায় নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেন। ওই বৈঠকে ইসি সচিবও উপস্থিত ছিলেন। এই বৈঠকের পরই বাংলাদেশের ইসি সচিব মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মনোভাব জানিয়ে দেন। এর থেকে একটাই বিষয় সামনে আসে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবার পুরোপুরি পাল্টি খেল। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হল, বাংলাদেশের ইসি সচিব আখতার আহমেদ জানিয়েছেন, কোনও জায়াগায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বাড়াবাড়ির খবর আছে কি না, সেটা মার্কিন রাষ্ট্রদূত জানতে চেয়েছিলেন। বাংলাদেশ রাজনৈতিক ওয়াকিবহাল মহলের মতে, এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটা দিক। এমনিতেই নির্বাচন হচ্ছে একমুখী বা একপেশে। আওয়ামী লীগ এবং তাঁদের সহযোগী কয়েকটি দলকে কার্যত নির্বাচনের বাইরে রেখেই ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এটা ভারত মেনে নিতে পারছে না। ভারত প্রথম থেকেই চেয়ে এসছে বাংলাদেশের নির্বাচন হোক অন্তর্ভুক্তিমূলক ও অংশগ্রহণমূলক। ভারতের পাশাপাশি বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন এবং ইউরোপের কয়েকটি দেশ একই দাবি তুলেছে। একমাত্র চুপ ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। তাঁরা এর আগেই ঘোষণা করেছে বাংলাদেশের আসন্ন নির্বাচনে ওয়াশিংটন নিরপেক্ষ অবস্থান গ্রহণ করবে, অর্থাৎ কোনও একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দল বা জোটের পক্ষে তাঁরা অবস্থান নেবে না। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নতুন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট ক্রিস্টেনশন এখনও পর্যন্ত জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ এবং জাতীয় নাগরিক পার্টি বা এনসিপি নেতাদের সঙ্গে কোনও বৈঠক করেননি। কূটনৈতিক পরিভাষায় এটা ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম বার্তা, আর বাংলাদেশে নির্বাচনের পর্যবেক্ষক না পাঠানোর সিদ্ধান্ত হল দ্বিতীয় বার্তা।
ঘটনাচক্রে মুহাম্মদ ইউনূস দাবি করছেন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন হতে চলেছে বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে ঐতিহাসিক নির্বাচন। কিন্তু বাংলাদেশের প্রায় ৫০ শতাংশ সমর্থকপুষ্ট আওয়ামী লীগ এই নির্বাচনে অংশ নিতে না পারার জন্য ইতিমধ্যেই বিশ্বজুড়ে শুরু হয়েছে সমালোচনা। একমাত্র মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এই বিষয়ে মুখ খোলেনি, যা ছিল ইউনূসের জন্য একটা স্বস্তির বার্তা। কিন্তু কূটনৈতিক দিক থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যে খেলাটা খেলছে তা আদতে ভারতের সমর্থন বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্ট মহল। এর আগে জাতিসংঘ জানিয়েছে তারা কোনও নির্বাচনী পর্যবেক্ষক পাঠাবে না বাংলাদেশে, এবার জানিয়ে দিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। সব মিলিয়ে ক্রমশ এক ঘরে হচ্ছেন ইউনূস সাহেব। বোঝাই যাচ্ছে আসন্ন নির্বাচন বা গণভোট দুটোই একটা লোক দেখানো প্রক্রিয়ায় পর্যবসিত হয়েছে।












Discussion about this post