বাংলাদেশের সব ধরণের রফতানি পণ্যের ওপর ৩৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ আরোপ করেছে। আগামী ১ আগস্ট থেকে মার্কিন বাজারে রফতানি হওয়া পণ্যের ওপর এই বাড়তি শুল্ক কার্যকর হবে। অর্থাৎ হাতে মাত্র কয়েকদিন, তার পরেই বাড়তি শুল্ক দিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পণ্য পাঠাতে হবে বাংলাদেশি ব্যবসায়ীদের। কিন্তু জানা যাচ্ছে, সব ধরণের সমঝোতা বৈঠকই ব্যর্থ হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের অর্থনীতি কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে সেটাই এখন চিন্তার কারণ। গত রবিবার বাংলাদেশের অন্যতম মিডিয়া হাউস প্রথম আলো আয়োজিত ‘যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা শুল্ক: কোন পথে বাংলাদেশ’ শীর্ষক এত গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে আমন্ত্রিত একাধিক অর্থনীতিবিদ এবং রফতানিকারক সংস্খার প্রতিনিধি ও শিল্পপতিরা এই বিষয়ে গভীর আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। ওই অনুষ্ঠানে সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং-এর নির্বাহী পরিচালক ড. সেলিম রায়হান জানান, বাংলাদেশের দর-কষাকষির সক্ষমতা সীমিত। শুল্কসংক্রান্ত আলোচনায় আমাদের প্রস্তুতি ও কৌশল দুর্বল, যা ভবিষ্যতে অর্থনৈতিকভাবে ব্যয়বহুল হয়ে উঠতে পারে। তবে তিনি একা নন, আরও অনেক বক্তা দাবি করেছেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের দর–কষাকষি হতাশ করেছে।
উল্লেখ্য, এর আগে যখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের ওপর ৩৭ শতাংশ ট্যারিফ ঘোষণা করেছিল, তখনই বাংলাদেশের শিল্প মহল দাবি করেছিল একটি উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধিত্বমূলক দল পাঠিয়ে ওয়াশিংটনের সঙ্গে সমঝোতা করার জন্য। কিন্তু বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ওয়াশিংটনে প্রতিনিধি দল পাঠিয়েছিল ঠিকই, কিন্তু তাতে বাণিজ্য অংশিদার ছিলেন না, বরং বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমানের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল যায়। তাঁরা আবার বাংলাদেশের বিভিন্ন শিল্প প্রতিষ্ঠান, রফতানিকারক সংস্থা, বা অর্থনীতিবিদদের সঙ্গে কোনও আলোচনাও করেননি। ফলে যা হাওয়ার তাই হল, বাংলাদেশের ওপর চেপে গেল বাড়তি ৩৫ শতাংশ ট্যারিফ। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বিশ্বের যে যে দেশের ওপর সবচেয়ে বেশি শুল্ক আরোপ করেছেন, তার মধ্যে বাংলাদেশ প্রথমসারিতে রয়েছে। অর্থাৎ, বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন প্রবল ঝুঁকির মুখে এ কথা বলাই বাহুল্য।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে যে সমস্ত পণ্য রফতানি করে বাংলাদেশ তাঁদের মধ্যে রেডিমেড গার্মেন্টস, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য সবচেয়ে বেশি। নতুন শুল্ক হার কার্যকর হলে সরাসরি প্রতিযোগিতার বাইরে চলে যাবে এই পণ্যগুলি। বাংলাদেশের অর্থনীতিবিদদের দাবি, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবিত ৩৫ শতাংশ পাল্টা শুল্ক আমাদের জন্য উদ্বেগজনক। এ ধরনের শুল্ক চাপ শুধুই বাণিজ্য নয়, এটি কর্মসংস্থান, বৈদেশিক মুদ্রা এবং শিল্পগুলি টিকে থাকার প্রশ্নেও বড় হুমকি হয়ে উঠবে। কারণ, প্রতিযোগিতার বাজারে ভারত, ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ডের পোশাক রফতানিকারকরা অনেকটাই সুবিধা পেয়ে যাবে তাঁদের জন্য অনেক কম শুল্ক থাকায়। বাংলাদেশের শিল্প মহলের দাবি, মার্কিন শুল্ক চাপে তাঁরা প্রায় ২ বিলিয়ন ডলারের ব্যবসা হারাতে পারেন। এর আগে ভারত ঘুরপথে আমদানি বন্ধ করায় এবং ট্রান্সশিপমেন্ট সুবিধা বাতিল করায় প্রায় ২ বিলিয়ন ডলারের ব্যবসা হারিয়েছে বাংলাদেশ। এবার মার্কিন চাপে দ্বিগুণ লোকসানের মুখে পড়তে হচ্ছে তাঁদের। এর ফলস্বরূপ আগামী কয়েকমাসেই বাংলাদেশের পোশাক শিল্প, চামড়াজাত শিল্প মুখ থুবড়ে পড়বে। এ ছাড়া তৈরি পোশাক খাতের সহায়ক শিল্প, যেমন প্যাকেজিং, পরিবহন এবং এর সঙ্গে যুক্ত স্থানীয় ব্যবসায়ীরাও এই চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে চলেছে। যার প্রভাব সরাসরি বাংলাদেশের অর্থনীতিতে পড়বে। যদিও প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সেক্রেটারি শফিকুল আলম গতকাল মঙ্গলবার এক ফেসবুক পোস্টে জানান, শুল্ক নিয়ে আলোচনা এখনো চলমান। বাংলাদেশের বাণিজ্য উপদেষ্টা সেখ বশির উদ্দিন ওয়াশিংটন ডিসিতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য আলোচনায় নেতৃত্ব দিচ্ছেন। জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ড. খলিলুর রহমানও এই প্রতিনিধিদলে রয়েছেন। কিন্তু তাঁদের এই অভয়বাণীতে কেউই কর্ণপাত করতে নারাজ। ভারত যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চোখে চোখ রেখে বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে সমঝোতা করে চলেছে। ভিয়েতনামের মতো দেশ যদি কম শুল্কে বাণিজ্য চুক্তি সেরে ফেলতে পারে। তাহলে বাংলাদেশের এই প্রতিনিধি দল এতদিন ধরে সরকারি খরচে যুক্তরাষ্ট্রে বসে কি করলেন? ইতিমধ্যেই প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে বাংলাদেশে।












Discussion about this post