ঢাকায় নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের নতুন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেনের একটি মন্তব্য এখন রাতের ঘুম কেড়েছে বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের। ঢাকায় সদ্য নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেন গত বুধবার সাংবাদিকদের সঙ্গে এক আলাপচারিতায় ফের দাবি করলেন, কিছু নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে চিনের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার ঝুঁকিগুলো আমি স্পষ্টভাবে তুলে ধরব। যেমনটা তিনি গত বছরের অক্টোবর মাসে মার্কিন সিনেটে রাষ্ট্রদূত নিয়োগের শুনানিতে বলেছিলেন। তাৎপর্যপূর্ণভাবে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব নিয়েই তিনি ফের সে কথা স্মরণ করিয়ে দিলেন। মার্কিন রাষ্ট্রদূতের এই মন্তব্য সামনে আসতেই প্রবল চটল বেজিং। ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই তাঁরা তীব্র ভাষায় এই মন্তব্যের বিরোধিতা করেছে। বৃহস্পতিবার ঢাকায় অবস্থিত চিনা দূতাবাসের মুখপাত্র এক বিবৃতিতে বলেন, মার্কিন রাষ্ট্রদূতের বক্তব্য দায়িত্বজ্ঞানহীন, সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন এবং গোপন উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। তাতে আরও বলা হয়েছে, গত ৫০ বছরে চিন ও বাংলাদেশ সবসময় পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সমতা ও সহযোগিতার ভিত্তিতে সম্পর্ক বজায় রেখেছে। দু’দেশের মধ্যে সহযোগিতা উভয় দেশের জনগণের জন্য বাস্তব সুফল বয়ে এনেছে এবং ব্যাপক জনসমর্থন লাভ করেছে। এ সহযোগিতা আঞ্চলিক উন্নয়ন ও স্থিতিশীলতায় ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে। সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, চিন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে কূটনৈতিক বৈরিতা এখন এমন একটা পর্যায়ে রয়েছে যার জেরে বিশ্বের বহু দেশই এক অদ্ভুত উভয় সংকটে পড়ছে। যেমনটা পড়তে হল বাংলাদেশকে। দুই বৃহৎ শক্তিশালী দেশের মধ্যে সামগ্রিক লড়াইয়ের ফাঁকে পড়েছে বাংলাদেশ। যা অনেকটাই সামলে ছিলেন শেখ হাসিনা, কিন্তু মুহাম্মদ ইউনূসের সেই কূটনৈতিক দক্ষতা নেই। ফলে মহা ফাঁপরে পড়েছেন তিনি।
ঠিক এই আবহেই যে খবরটা সামনে এল তা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে বাংলাদেশের ওপর যে আরও চটিয়ে দেবে, তা নিয়ে কোনও দ্বিমত নেই। সেটা হল, চিনের সঙ্গে বাংলাদেশের সামরিক ড্রোন কারখানা তৈরির এক বৃহৎ চুক্তি। বলা হচ্ছে, বাংলাদেশের আকাশ প্রতিরক্ষা সক্ষমতা জোরদার করতে সামরিক ড্রোন উৎপাদন কারখানা স্থাপনের জন্য চিনের সঙ্গে ‘সরকার টু সরকার’ চুক্তি করছে মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। তার আগেই গত ৬ জানুয়ারি বাংলাদেশের অর্থ মন্ত্রণালয় “এস্টাবলিশমেন্ট অব ম্যানুফ্যাকচারিং প্ল্যান্ট এন্ড ট্রান্সফার অব টেকনোলজি ফর আনম্যানড এরিয়াল ভ্যাহিকেল” নামের এই প্রকল্পকে অনুমোদন দিয়েছে। এই প্রকল্পের অন্তর্গত বাংলাদেশে ৬০৮ কোটি ৮ লক্ষ টাকার একটি সামরিক ড্রোন ম্যানুফ্যাকচারিং প্ল্যান্ট তৈরি করবে চিন। চুক্তি অনুযায়ী বাংলাদেশকে পরবর্তী চার বছরে পরিশোধ করতে হবে ৫৭০ কোটি ৬০ লক্ষ টাকা। বাংলাদেশি সংবাদমাধ্যম দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড দাবি করেছে, প্রস্তাব অনুযায়ী, বাংলাদেশ বিমান বাহিনী চিনের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিরক্ষা ইলেকট্রনিক্স প্রতিষ্ঠান—চায়না ইলেকট্রনিক্স টেকনোলজি গ্রুপ করপোরেশন ইন্টারন্যাশনালের প্রযুক্তি ব্যবহার করে এই প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে। আরও জানা যাচ্ছে, এই কারখানার জন্য বাংলাদেশের নীলফামারি জেলায় জমিও চিহ্নিত করে ফেলেছে অন্তর্বর্তী প্রশাসন। যা ভারতের সবচেয়ে ঝুঁকিপ্রবণ শিলিগুড়ি করিডোরের খুব কাছেই অবস্থিত বলে জানা গিয়েছে। ওয়াকিবহাল মহলের মতে, ভারতকে চাপে রাখতেই চিনকে শিলিগুড়ি করিডোরের কাছে এই সামরিক ড্রোন কারথানা তৈরি করার সুযোগ করে দিতে চাইছিল ইউনূসের সরকার। সেই কারণেই নির্বাচনের জন্য অপেক্ষা না করেই তড়িঘড়ি চিনের সঙ্গে চুক্তি সম্পন্ন করে ফেলতে চাইছে তাঁরা। কিন্তু ভারতকে চাপে ফেলতে গিয়ে এখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিষ নজরে পড়ে গেল তাঁরা।
মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেন সেদিন সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপচারিতায় বিভিন্ন প্রসঙ্গের মধ্যে প্রতিরক্ষা বিষয়ে অংশীদারিত্ব নিয়েও কথা বলেছিলেন। তাঁর কথায়, অংশীদার দেশগুলোর সামরিক সক্ষমতার চাহিদা পূরণে যুক্তরাষ্ট্র কাজ করে এবং অন্য মিত্র দেশগুলো থেকে উপযুক্ত বিকল্প চিহ্নিত করতে সাহায্য করে। এটি বাংলাদেশি বাহিনীর প্রয়োজনের সঙ্গে আরও মানানসই বা তুলনামূলকভাবে সাশ্রয়ী হতে পারে বলেও উল্লেখ করেন তিনি। কূটনৈতিক মহলের মতে, এই মন্তব্য অত্যন্ত ইঙ্গিতবাহী মুহাম্মদ ইউনূসের জন্য। আসলে বাংলাদেশে সামরিক কেনাকাটায় যুক্তরাষ্ট্রের অবদান খুব কম। ঢাকার নির্ভরশীলতা চিনের প্রতিই। শেখ হাসিনা এই বিষয়টি সুন্দরভাবে রক্ষা করে এসেছেন। এখন ইউনূস সাহেব মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে বাংলাদেশে নাক গলানোর সুযোগ করে দিয়েছেন। ফলে চিনের সঙ্গে সামরিক প্রতিরক্ষা সংক্রান্ত যে কোনও চুক্তিই ওয়াশিংটনের গলার কাঁটা হবে, এটা বলাই বাহুল্য। ফলে ৬০৮ কোটি টাকার সামরিক ড্রোন কারখানা স্থাপনের চুক্তি, চিন কর্তৃক বাংলাদেশের সাবমেরিন ঘাঁটি ‘সংস্কার’ বা ‘২০টি চিনা যুদ্ধবিমান কেনার’ বিষয়গুলি যুক্তরাষ্ট্র ভালো চোখে দেখবে না এটাই স্বাভাবিক। ফলে বিপাকে ইউনূস, বিপাকে বাংলাদেশ। ওয়াশিংটনের চাপে যদি শেষ পর্যন্ত চুক্তি স্বাক্ষর পিছিয়েও যায়, তাহলে লাভ ভারতেরই।












Discussion about this post