ঢাকা থেকে কলকাতা বিমানবন্দরে নেমে ইমিগ্রেশন কাউন্টারে বসা অফিসারের দিকে পাসপোর্টটা এগিয়ে দিলেন বাংলাদেশি যুবক। সঙ্গে রয়েছে মেডিকেল ভিসা। কিন্তু ওই যুবককে দেখে সন্দেহ হয় ইমিগ্রেশন অফিসারের। দেখতে চান ওই যুবকের মেডিকেল সার্টিফিকেট। একগাদা প্রেসক্রিপশন ও মেডিকেল সার্টিফিকেটে লেখা কঠিন সব অসুখ। কিন্তু ওই যুবককে দেখে মনে হচ্ছে না সে গুরুতর অসুস্থ। ফলে শুরু হয় জিজ্ঞাসাবাদ। তাতেই সামনে আসে আসল রহস্য। জানা যায়, অসুখ-বিসুখ স্রেফ ভাঁওতা। যুবক সোজা পথে ভারতের ভিসা পাচ্ছিলেন না। তাই দালাল ধরে কাড়ি কাড়ি টাকা খরচ করে জাল মেডিকেল সার্টিফিকেট বের করে দিল্লি যাওয়ার পরিকল্পনা ছিল। শেখান থেকে বালটিক সমুদ্রের ধারে ছোট একটি দেশ এস্টোনিয়ার ভিসা নিয়ে ওই দেশে ডাক্তারি পড়তে পড়তে যাওয়ার কথা। কারণ বাংলাদেশে এস্টোনিয়ার দূতাবাস নেই, যা দিল্লিতে আছে। জানা যায়, ইউরপের বহু দেশের ভিসার অনলাইনে আবেদন করলেও, তাঁদের সীমান্ত টপকে সেই ভিসার ইন্টারভিউ দিতে একবার অন্তত দিল্লিতে আসতেই হয়। আসলে এস্টোনিয়ায় পড়ার খরচ তুলনায় কম। পাশাপাশি ফিনল্যান্ড, পোল্যান্ড, পর্তুগাল, রোমানিয়া, অস্ট্রিয়া, লিথুয়ানিয়া, স্লোভাকিয়ার মতো অনেক দেশেও কম খরচে পড়াশোনা করা যায়। কিন্তু অন্তরায় ভারতের ভিসা না দেওয়ার সিদ্ধান্ত। তাতেই বেশ চাপে পড়েছে বাংলাদেশী যুবক যুবতীরা।
ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলির শেনজেন ভিসা ইনফোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে সবচেয়ে বেশি ভিসা বাতিলের তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে বাংলাদেশ, তিন নম্বরে পাকিস্তান। ফলে ভারতকে এড়িয়ে ইউরোপীয় দেশ গুলিতে যাওয়ার ভিসা নিতে হলে বাংলাদেশীদের পাকিস্তান গিয়েও লাভ হচ্ছে না। পরিসংখ্যান বলছে, সবচেয়ে বেশি ভিসা প্রত্যাখ্যান করা দেশ হল পশ্চিম আফ্রিকার অখ্যাত একটি দেশ কমোরোসে। তারপরেই বাংলাদেশ ও পাকিস্তান। কমোরোসের ১ হাজার ৭৫৪ নাগরিকের ভিসা আবেদন প্রত্যাখ্যান করা হয়েছিল। শতাংশের বিচারে যা ৬২ দশমিক ৮ শতাংশ। আর বাংলাদেশের মোট ৩৯ হাজার ৩৪৫টি ভিসা আবেদনের মধ্যে বাতিল হয়েছে ২০ হাজার ৯৫৭টি আবেদন। অর্থাৎ মোট আবেদনের ৫৪ দশমিক ৯০ শতাংশ। অপরদিকে পাকিস্তানিদের ৭৮ হাজার ৩৬২টি আবেদনের মধ্যে ৩৫ হাজার ১৩৯টি আবেদন প্রত্যাখ্যান করা হয়েছিল। যা মোট আবেদনের ৪৭ দশমিক ৫ শতাংশ। এই পরিসংখ্যান বলে দিচ্ছে বাংলাদেশি ও পাকিস্তানিদের ভিসা দিতে চাইছে না সেনজেন গোষ্ঠীভুক্ত দেশগুলি। প্রসঙ্গত ইউরোপের ২৯টি দেশের জোট হলো শেনজেন। এসব দেশের মানুষ ভিসা ছাড়াই একে অপরের দেশে যেতে পারেন। এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন অদ্ভুত যুক্তি দিয়েছেন। তাঁর দাবি, বাংলাদেশি নাগরিকরাই নাকি এর জন্য দায়ী।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মুহাম্মদ ইউনূসের আমলে বাংলাদেশিদের বিদেশ ভ্রমণের সুযোগ দিন দিন কমে যাচ্ছে। অনেক দেশ ভিসা দেওয়া বন্ধ করে দিয়েছে, কেউ কেউ আবেদন ফিরিয়ে দিচ্ছে বা অতিরিক্ত কড়াকড়ি করছে। ফলে ট্যুরিস্ট ভিসা নিয়েও বিদেশ ভ্রমণের সুযোগ সীমিত হয়ে পড়েছে। সে দেশের ট্যুর অপারেটরদের বক্তব্য, আগে প্রতিবেশী দেশ ভারত ছিল ভ্রমণের জন্য সবচেয়ে জনপ্রিয় গন্তব্য। শুধু পর্যটন নয়, দিল্লির ভিসা সেন্টার থেকে ইউরোপ ও আমেরিকার ভিসা নিতেও যেতে হতো ভারতে। কিন্তু বাংলাদেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের কারণে ভারতের ভিসা পাওয়া প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে চরম সমস্যায় পড়ছেন বাংলাদেশিরা। কূটনৈতিক মহলের অভিমত, বৃহত্তম প্রতিবেশি ভারত বাংলাদেশিদের জন্য ভিসা বন্ধ করায় ইউরোপীয় দেশগুলি ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও কড়াকড়ি করছে। একইভাবে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলি ও থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, মালয়েশিয়াও এখন ভিসা নিয়ে কড়াকড়ি করছে। এমনকি মিশরও বাংলাদেশি পর্যটকদের জন্য ‘ওকে-টু বোর্ড’ অন-অ্যারাইভাল ভিসা সুবিধা স্থগিত করেছে। বাংলাদেশের অধিকাংশ ট্রাভেলস ম্যানেজারদের বক্তব্য, অনেক বাংলাদেশি ট্যুরিস্ট ভিসায় বিদেশ গিয়ে আর ফেরত আসেন না। পাশাপাশি বর্তমান রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ভিসা পেতে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সরকার পরিবর্তনের পর কূটনৈতিক সম্পর্কেও পরিবর্তন এসেছে, যা ভিসা প্রক্রিয়াকে আরও জটিল করেছে।
ট্যুর অপারেটর অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ যে পরিসংখ্যান দিচ্ছে তাতে দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশি পর্যটকদের ৪০-৪৫ শতাংশ প্রতিবছর ভারত ভ্রমণ করতেন, বিশেষ করে চিকিৎসা, ভ্রমণ ও কেনাকাটার উদ্দেশ্যে। ভারতের পর্যটন মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ভারতে ৪৭ লাখ ৮০ হাজার পর্যটক ভ্রমণ করেছেন। এর মধ্যে বাংলাদেশ থেকে এসেছে প্রায় ১০ লাখ, যা মোট পর্যটকের ২১.৫ শতাংশ। কিন্তু ২০২৪ সালের আগস্টে সরকার পরিবর্তনের পর ভারত বাংলাদেশিদের জন্য প্রায় সব ধরনের ভিসা বন্ধ করে দেয়। কেবলমাত্র গুরুতর রোগীদের ভিসা দেওয়া হচ্ছে। ভারতের ভিসা বন্ধের পর অনেকেই থাইল্যান্ডে যাওয়ার চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে থাইল্যান্ড প্রতিদিন ৮০০টি ভিসার পরিবর্তে মাত্র ৩৫০টি ভিসা মঞ্জুর করছে বাংলাদেশিদের জন্য। উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, থাইল্যান্ডের পর ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া, লাওসের মতো দেশগুলিও বাংলাদেশিদের ভিসা দিতে কড়াকড়ি শুরু করেছে। মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, ইন্দোনেশিয়াও একই পথে হেঁটেছে। ফলে ভারতের সঙ্গে বৈরিতা বাড়িয়ে ক্রমশ একঘরে হয়ে পড়ছে বাংলাদেশ। ফলে সে দেশের যুবক যুবতীরা যেমন বিদেশে পড়াশোনা করতে যেতে পারছেন না, তেমনই রোগীরাও চিকিৎসা করাতে যেতে পারছেন না। ব্যবসায়ীদের অবস্থাও অথৈবচ। ফলে দিন দিন ক্ষোভ বাড়ছে ইউনূস সরকারের ওপর।












Discussion about this post