বাংলাদেশের আসন্ন নির্বাচন যত এগিয়ে আসছে, রাজনৈতিক পরিস্থিতি ততই জটিল ও ঘোলাটে হয়ে উঠছে। ভোটের আগে একের পর এক হিংসাত্মক ঘটনার খবরে রাজনৈতিক মেরুকরণ এবং পরস্পরবিরোধী প্রচারভাষ্য গোটা নির্বাচনী পরিবেশকে অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে নির্বাচন কেবল ক্ষমতার লড়াই নয়, বরং দেশের রাজনৈতিক দিকনির্দেশ, মুক্তিযুদ্ধের উত্তরাধিকার এবং রাষ্ট্রের চরিত্র নিয়ে এক গভীর সংঘর্ষের রূপ নিচ্ছে।
ভোটের আগে হিংসা নতুন নয়, কিন্তু এবারের পরিস্থিতি আলাদা করে নজর কাড়ছে। রাজনৈতিক কর্মসূচি, প্রচার এবং সংগঠনের পরিসর ক্রমশ সংকুচিত হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠছে একাধিক মহল থেকে। হিংসাত্মক ঘটনাগুলি শুধু প্রাণহানি বা সম্পত্তির ক্ষতিতেই সীমাবদ্ধ নয়, এগুলি সাধারণ ভোটারের মনে ভয় ও অনিশ্চয়তা তৈরি করছে।
এরই মধ্যে দাঁড়িয়ে আবার ইউনচস ওয়াকার দ্বন্দ্ব দিনের মতন পরিষ্কার হচ্ছে। আসলেই বাংলাদেশের ক্ষমতার অলিন্দে কে শেষে জয়ী হবে এবারের নির্বাচন হয়তো তারই ফল প্রকাশ। যমুনা এবং সেনা ক্যান্টনমেন্ট যেন দুটো মেরুতে এসে দাঁড়িয়েছে।যে কোনও নির্বাচনের মূল শর্ত হল ভয়মুক্ত পরিবেশে মতপ্রকাশের সুযোগ। সেই পরিবেশ বিঘ্নিত হলে ভোটের বিশ্বাসযোগ্যতা স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্নের মুখে পড়ে।এই প্রেক্ষাপটে বিএনপির প্রচার কৌশল বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। দলটি জামায়াতে ইসলামীকে সরাসরি মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি হিসেবে চিহ্নিত করে প্রচার চালাচ্ছে। এই বক্তব্যের মাধ্যমে বিএনপি একদিকে মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহাসিক স্মৃতিকে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে, অন্যদিকে নিজেদের অবস্থানকে ধর্মভিত্তিক রাজনীতির বাইরে দেখানোর চেষ্টা করছে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে মুক্তিযুদ্ধের প্রশ্নটি অধিকাংশ নাগরিকের কাছেই আবেগজড়িত এবং সংবেদনশীল। সেই আবেগকে সামনে এনে জামায়াতকে কোণঠাসা করার কৌশল বিএনপির জন্য স্বল্পমেয়াদে লাভজনক হলেও, তা রাজনৈতিক বিভাজন আরও তীব্র করতে পারে।বিএনপির নির্বাচনী ইস্তাহারেও একটি স্পষ্ট সামাজিক-অর্থনৈতিক বার্তা রয়েছে। সাধারণ ও নিম্নবিত্ত মানুষদের জন্য বিভিন্ন সহায়তা প্রকল্পের ঘোষণা- ভর্তুকি, সামাজিক সুরক্ষা ও কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতি- দলের প্রচারে গুরুত্বপূর্ণ জায়গা নিয়েছে।
অন্যদিকে দেশের প্রধান উপদেষ্টা মোহাম্মদ ইউনুস ও দেশের সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার একে অপরের দিকে টার্গেটের নল দাঁড় করিয়ে রেখেছে এর আগেও বিভিন্ন ক্ষেত্রে সেনাপ্রধান এবং প্রধান উপদেষ্টার মতবিরোধ প্রকাশ্য দিবালকে উন্মোচিত হয়েছে ভোটের দিনক্ষণ যত এগিয়ে আসছে ইউনুস ওয়াকার দ্বন্দ্ব ততোই চওড়া হচ্ছে। বাংলাদেশের মূল্যবৃদ্ধি, বেকারত্ব ও আয়ের বৈষম্যের বাস্তবতায় সরাসরি সহায়তার প্রতিশ্রুতি ভোটের অঙ্কে বড় ভূমিকা নিতে পারে বলে মত প্রকাশ করছে রাজনৈতিক মহল।
অন্যদিকে আবার জামায়াতে ইসলামীর প্রচারে উঠে আসছে শরিয়া শাসনের প্রশ্ন। এই অবস্থান বাংলাদেশের ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রচিন্তার সঙ্গে মেলে না। জামায়াতের এই বক্তব্য একদিকে তাদের সমর্থক ভিত্তিকে আরও দৃঢ় করতে পারে, কিন্তু অন্যদিকে শহুরে মধ্যবিত্ত, সংখ্যালঘু এবং উদারপন্থী ভোটারদের মধ্যে গভীর উদ্বেগ তৈরি করছে। ফলে বিরোধী রাজনীতির মধ্যেই একাধিক আদর্শগত টানাপোড়েন স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
এই অবস্থায় দাঁড়িয়ে এখন বাংলাদেশের জটিল সমীকরণে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন আনছে আওয়ামী লীগের নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করতে পারা। শাসক দল হিসেবে দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকার পর নির্বাচনী ময়দানে অনুপস্থিতির ফলে বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক বিরল পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এর ফলে ভোটের প্রতিযোগিতা কার্যত একমুখী হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা যেমন রয়েছে, তেমনই ভোটারদের আচরণেও বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলছে। বাংলাদেশের একটি সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে, প্রায় ৪৮ শতাংশ আওয়ামী লীগ সমর্থক বিএনপিকে ভোট দিতে পারেন। এই তথ্য যদি বাস্তবে প্রতিফলিত হয়, তবে তা নির্বাচনের ফলাফল ও রাজনৈতিক ভারসাম্যে বড় প্রভাব ফেলতে পারে। এবং বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিরাট এক নজিরবিহীন সমীকরণ হিসাবে মনে রাখবে সে দেশের জনগণ।
তবে এই সম্ভাব্য ভোট স্থানান্তর আদৌ কতটা স্থায়ী বা আদর্শগত, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রেই এটি হতে পারে বিকল্প না থাকার ভোট, আদর্শগত সমর্থন নয়। এমন ভোট রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য দীর্ঘমেয়াদে কতটা সহায়ক হবে, তা সময়ই বলবে।
বর্তমান এই ঘোলাটে পরিস্থিতির মধ্যে দাঁড়িয়ে সব মিলিয়ে বাংলাদেশের আসন্ন নির্বাচন একাধিক স্তরে সংকট ও সম্ভাবনার মুখোমুখি। হিংসা ও ভয়ের পরিবেশ, আদর্শগত মেরুকরণ, বড় রাজনৈতিক শক্তির অনুপস্থিতি এবং ভোটারদের অনিশ্চিত আচরণ- সবকিছু মিলিয়ে এটি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত। নির্বাচন যদি অংশগ্রহণমূলক ও শান্তিপূর্ণ না হয়, তবে যে সরকারই ক্ষমতায় আসুক, তার বৈধতা ও গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নের মুখে পড়বে। এই পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে দলগুলি যেমন তাদের ক্ষমতা দখলের জন্য কৌশলগত বিভিন্ন পদক্ষেপ নিচ্ছেন অন্যদিকে আবার ইউনূস তার সুকৌশলী তীক্ষ্ণ বুদ্ধিতে ক্ষমতায় অলিন্দে থেকে যাওয়ার অংকটাও আবে ভাবে বেশ ভালোই কোষছেন, অন্যদিকে আবার সর্বঘটের কাঁঠালি কলা হয়ে থাকা সেনাপ্রধান তলে তলে ক্ষমতার শীর্ষে থাকার দাঁড়িপাল্লায় নিজের ওজনটাও বেশ ভালই মেপে নিচ্ছেন।












Discussion about this post