বাংলাদেশের সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার উজ জামানকে ঘিরে বাংলাদেশে একাধিক জল্পনা চলছে। সে দেশের সোশ্যাল মিডিয়ায় তাঁকে নিয়ে নানা ধরণের গুজব, রটনা এবং আলাপ-আলোচনা চলছে। ফলে একটা বিভ্রান্তিকর পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকারকে নিয়ে। এই জল্পনা-কল্পনার অবশ্য একাধিক কারণ রয়েছে। বিগত কয়েকদিনে বাংলাদেশের সেনাপ্রধানের গতিবিধিই বেশ রহস্যজনক। শুরুটা করা যাক ১৫ জন কর্মরত সেনাকর্তার বিরুদ্ধে ঢাকার আন্তর্জাতিক আদালত গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করার অনেকটা আগে থেকেই। এই সম্ভাবনা যখন তৈরি হচ্ছে, তখন সেনাপ্রধান চিন সফরে ছিলেন। ফিরেই তিনি ছুটে যান বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদের কাছে। কোনও সেনাপ্রধান এ ভাবে প্রধান বিচারপতির সঙ্গে সাক্ষাৎ করছেন, সেটা বাংলাদেশের ইতিহাসে অতি বিরল। আসলে তিনি গিয়েছিলেন, এই সেনাকর্তাদের বিচারপর্ব ঠেকাতে। তিনি সে সময় ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি এবং প্রধান উপদেষ্টার কাছেও গিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি ব্যর্থ হয়েছিলেন তার প্রমান আর দিতে হবে না। ওই ১৫ সেনাকর্তার বিচার ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে। এই কারণে জেনারেল ওয়াকারের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ সেনার একটা বড় অংশ বিরক্ত এবং ক্ষুব্ধ।
জেনারেল ওয়াকার, গত বছর ৫ আগস্ট হাসিনার দেশ ছাড়ার পর জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণে বলেছিলেন, এখন থেকে বাংলাদেশের জনগণের ভালোমন্দের দায়িত্ব তাঁর কাঁধেই থাকবে। সেই কাজও তিনি যে ঠিকঠাক করে উঠতে পারেননি, সেটাও এখন দিনের আলোর মতো স্পষ্ট। যদিও মাঝেমধ্যেই তিনি ভেসে উঠেছেন, এবং নানা সময় বড় বড় মন্তব্য করেছেন।
তাঁর কোনও কথাই যে রাখতে পারেননি সেনাপ্রধান, সেটা এখন বুঝে গিয়েছে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষও। অন্যদিকে জেনারেল ওয়াকারকে সরিয়ে দেওয়ার ভয়নক পরিকল্পনা যে হয়েছিল, সেটাও আজ কারও অজানা নয়। মুহাম্মদ ইউনূস তাঁকে না জানিয়েই জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা হিসেবে বিদেশি নাগরিক খলিলুর রহমানকে তাঁরই মাথার উপর বসিয়ে দেন। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একটি অংশকে তাঁর বিরুদ্ধেই লেলিয়ে দেন। এবং সেনাবাহিনীর ভিতর একটা ক্যু করে তাঁকে সরিয়ে পরবর্তী সেনাপ্রধান হিসেবে পাকপন্থী এক সেনাকর্তাকে বসিয়ে দেওয়ার যাবতীয় পরিকল্পনা পাকা হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু সময়মতো সেই খবর জেনারেল ওয়াকারের কাছে পৌঁছে দেয় ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা। ফলে সে যাত্রায় বেঁচে যান জেনারেল ওয়াকার। তবে এখনও যে তিনি বাংলাদেশের ক্ষমতাসীন গোষ্ঠীর মধ্যে কোনও গুরুত্ব পান না তার নজির সম্প্রতি পাওয়া গেল।
সম্প্রতি, বাংলাদেশ সফরে এসেছিলেন পাকিস্তানের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সেনাকর্তা জেনারেল সাহির সামশাদ মির্জা। তিনি পাক সেনাবাহিনীর জয়েন্ট চিফস অফ স্টাফ কমিটির চেয়ারম্যান। গত ২৪ অক্টোবর তিনি ঢাকায় আসেন পাক সেনাবাহিনীর এক উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দলকে নিয়ে। তিনি পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল জেনারেল আসিম মুনিরের পরে দ্বিতীয় সবচেয়ে শক্তিশালী সেনা কর্মকর্তা। তাঁকে স্বাগত জানান বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার লেফটেন্যান্ট জেনারেল এসএম কামরুল হাসান। যিনি বাংলাদেশের সেনাপ্রধানের অধীনে নন, বরং সরাসরি কাজ করেন মুহাম্মদ ইউনূসের দফতরের অধীনে। তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, অতিথি পাক জেনারেল তাঁর চারদিনের সফরে মাত্র একবার বাংলাদেশের সেনাপ্রধানের সাক্ষাৎ পেয়েছেন, তাও আবার একেবারে শেষ লগ্নে, কিছুক্ষণের জন্য। পাক জেনারেল মির্জা লেফটেন্যান্ট জেনারেল কামরুল হাসানের সঙ্গে দীর্ঘ বৈঠক করেন।
এরপর বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস ও জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমানের সঙ্গেও বৈঠক করেন রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায়। এর কোনও জায়গাতেই ছিলেন না জেনারেল ওয়াকার। এরপর পাক অতিধি বাংলাদেশের নৌ এবং বায়ুসেনা প্রধানদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন, তাঁকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী গার্ড অফ অনার দেয়। এই কোনও অনুষ্ঠানেই হাজির ছিলেন না জেনারেল ওয়াকার। পাক হাইকমিশন জেনারেল মির্জার সম্মানে এক নৈশভোজের আয়োজন করেছিল, তাতেও গড়হাজির ছিলেন বাংলাদেশ সেনাপ্রধান। এমনকি জানা যাচ্ছে, সিলেট সেনানিবাস পরিদর্শনে গিয়ে জেনারেল ওয়াকারের সাথে বৈঠক করার কথা ছিল পাক জেনারেলের। কিন্তু ওয়াকার উজ জামান সেখানে উপস্থিত ছিলেন না। যদিও পরে দুবাইয়ের বিমান ধরার ঠিক আগে কিছু সময়ের জন্য দুই জেনারেলের একটা সৌজন্য সাক্ষাৎ হয়েছে। তবে প্রশ্ন উঠে গিয়েছে, জেনারেল ওয়াকার কি ইচ্ছাকৃতই পাক জেনারেল এবং পাকিস্তানের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দলকে এড়িয়ে গেলেন?
ওয়াকিবহাল মহল দাবি করছে, জেনারেল ওয়াকার বাংলাদেশে এভাবে পাকিস্তান সেনার বাড়বাড়ন্ত মেনে নিতে পারছেন না। কারণ ইতিমধ্যেই বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায় এক বিশেষ কার্যালয় খুলল পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা ইন্টার-সার্ভিসেস ইন্টেলিজেন্স বা আইএসআই। মনে করা হচ্ছে, বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্যই এই কৌশল। ভারতীয় গোয়েন্দা কর্তাদের মতে, পাকিস্তান ও বাংলাদেশের এই পদক্ষেপ অত্যন্ত ‘উদ্বেগজনক’। তাই বাংলাদেশ সেনাপ্রধানের কাছে কড়া বার্তা পৌঁছে গিয়েছে ভারতের তরফে। সেই কারণেই কি সেনাপ্রধান পাক সংস্রব এড়িয়ে চলছেন?












Discussion about this post