ইতিহাস আমাদের এই শিক্ষা দেয় যে, যারা কোনও সময় মাথা নত করতে জানেন, তাঁরা আবার উঠে দাঁড়াতেও পারেন। আর যারা এই ইতিহাস অস্বীকার করেন, তাঁরা সেইসব মানুষদের দ্বারা ভেসে যাযন যারা প্রথমে তাঁদের নির্বাচিত করেছিল। এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ ভারতের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধি। যাঁকে লৌহমানবী বলে থাকেন অনেকে। প্রসঙ্গত, ইন্দিরা প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীনই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে সোভিয়েত রাশিয়ার সাহায্য নিয়ে পাকিস্তানের সাথে যুদ্ধ করেছিলেন। ১৯৭১ সালের সেই যুদ্ধেই জন্ম হয় স্বাধীন বাংলাদেশের। কেন এ কথা মনে করালাম, সেটা কিছু বাদে বলছি।
দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতীয় উপমহাদেশে প্রতিবেশি কয়েকটি দেশের আভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে পরিবারতন্ত্রের প্রভাব প্রশ্নাতীত। উদাহরণ স্বরুপ, ভারতের গান্ধি-নেহেরু পরিবার, পাকিস্তানের ভুট্টো পরিবার, বাংলাদেশের শেখ পরিবার, শ্রীলঙ্কার রাজাপক্ষে এবং নেপালের রাজ পরিবারের কথা বলা যায়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই, তাঁরা উত্তরাধিকার সূত্রে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করে রেখেছিলেন। যেমন, ইন্দিরা গান্ধি এবং শেখ হাসিনা ছিলেন তাঁদের পিতার রাজনৈতিক উত্তরাধিকার দ্বারা ক্ষমতাপ্রাপ্ত দুই শাসক। এ ক্ষেত্রে দুজনের মিল রয়েছে। তবে ইন্দিরা গান্ধি ছিলেন তাঁর সমকালীন বিশ্বের একজন ক্ষমতাশালী নারী রাজনৈতিক। তাঁর রাজনৈতিক প্রজ্ঞা এবং প্রভাব এতটাই ছিল যে, বিশ শতকে টাইম ম্যাগাজিন তাঁকে লৌহমানবী আখ্যা দিয়েছিল। ইন্দিরা গান্ধি এমন একটা সময় ক্ষমতায় আসেন, যখন ভারত ভয়াবহ খাদ্য সংকট এবং এক রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু তাঁর উচ্চাভিলাষী সংস্কার প্রক্রিয়া, সবুজ বিপ্লব, ব্যাঙ্ক জাতীয়করণ এবং শীতল যুদ্ধের সময় শক্তিশালী বৈদেশিক নীতির অবস্থান তাঁকে একজন শক্তিশালী নেত্রী হিসেবে পরিচিতি দিয়েছিল।
অন্যদিকে শেখ হাসিনা বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়নের উপর জোর দিয়েছিলেন। তিনি একাধিক বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্প গ্রহণ করেছিলেন এবং স্থিতিশীল অর্থনৈতিক অগ্রগতিকে জাতীয় অগ্রগতির লক্ষণ হিসেবে তুলে ধরেছিলেন। বাংলাদেশের মাথাপিছু জিডিপি ২০০৯ সালে ছিল প্রায় ৮০০ ডলার, সেখানে শেখ হাসিনার সংস্কার ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের জেরে সেটা ২০২৩ সালে ২,৮০০ ডলারে নিয়ে গিয়েছিলেন। হাসিনার এই প্রচেষ্টা এশিয়ার দ্রুততম বর্ধনশীল অর্থনীতির মধ্যে বাংলাদেশকে স্থান দিয়েছিল। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শেখ হাসিনা ধর্মীয় উগ্রবাদ, জঙ্গিবাদ এবং সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়েছিলেন। বিশেষ করে ২০১৬ সালের হলি আর্টিসান বেকারিতে সন্ত্রাসী হামলার পর গোটা বাংলাদেশ জুড়ে চরমপন্থী ইসলামিক সংগঠনগুলির বিরুদ্ধে লাগাতার অভিযান চালিয়েছিলেন তিনি।
তবে, তাঁর এই কঠোর মনোভাব সন্ত্রাসবাদ দমনের বাইরেও বিস্তৃত ছিল। হাসিনার বিরুদ্ধে অভিযোগ, গণতন্ত্রকে উপেক্ষা করে বিরোধী রাজনৈতিকদের দমন করা, সংবাদমাধ্যমের মুখ বন্ধ করে দেওয়া এবং দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দেওয়ার। মজার বিষয় হল, প্রায় একই অভিযোগ ছিল ইন্দিরা গান্ধির বিরুদ্ধেও। তিনিও ঠিক এই কাজই করেছিলেন। এবং তাঁর চরম খেসারত দিতে হয়েছে মিসেস গান্ধিকে। এদিকে গত বছর শেখ হাসিনার বিদায় বাংলাদেশকে কর্তৃত্ববাদী সরকারের পতন এবং গণতান্ত্রিক পুনর্নবীকরণের মধ্যবর্তী এক সন্ধিক্ষণে দাঁড় করিয়েছে। মজার বিষয় হল, ইন্দিরা গান্ধি এবং শেখ হাসিনা উভয়ই এমন এক রাজনৈতিক উত্থানের মুখোমুখি হয়েছেন যা তাঁদের সীমাহীন কর্তৃত্বের পরীক্ষা নিয়েছিল।
১৯৭৫ সালে, ইন্দিরা গান্ধী জরুরি অবস্থা ঘোষণা করলে ভারতে নাগরিক স্বাধীনতা স্থগিত করা হয়। সংবাদপত্রের উপর সেন্সরশিপ আরোপ করা হয় এবং হাজার হাজার বিরোধী রাজনৈতিককে কারাগারে পাঠানো হয়েছিল। পরবর্তী দু-বছরে এক লক্ষের বেশি মানুষ গ্রেফতার হয়েছিল এমার্জেন্সি চলাকালীন। কিন্তু ১৯৭৭ সালে এমার্জেন্সি তুলে নেওয়ার পর ভারতে যে লোকসভা নির্বাচন হয়, তাতে ইন্দিরা গান্ধি এবং কংগ্রেসের সরকার মুখ থুবড়ে পড়ে। ১৯৭৮ সালে ইন্দিরা গান্ধি প্রকাশ্যে স্বীকার করেছিলেন যে জরুরি অবস্থার সময় তিনি ভুল করেছিলেন। অপরদিকে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে অভিযোগ, তাঁর সরকার ২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২৩ সালে তিনটি বিতর্কিত নির্বাচন পরিচালনা করেছিলেন, যেগুলির বেশিরভাগই বিরোধী দল ব্যাপক কারচুপির অভিযোগে বয়কট করেছিল।
হাসিনা প্রকাশ্যেই “নিরঙ্কুশ ক্ষমতা” চাওয়ার কথা বলতেন। এমনকি গণতান্ত্রিক অধিকার এবং ভিন্নমতের উপর তাঁর দমনমূলক নীতি প্রায় দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক কাঠামোকে ধ্বংস করেছে বলেই অভিযোগ। আর এটাই সে দেশে হাসিনার বিরুদ্ধে জনসাধারণের ক্ষোভকে উস্কে দিয়েছিল। ওয়াকিবহাল মহল বলছে, ইন্দিরা গান্ধি তাঁর ভূল স্বীকার করেছিলেন, এবং তিন বছরের বেশি সময় বিরোধী আসনে বসে নিজেকে সংশোধন করেছিলেন। ফলে তিনি পরবর্তী নির্বাচনে বিপুল জনমত নিয়ে ফিরেও এসেছিলেন ক্ষমতায়। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, শেখ হাসিনা কি সেই পথে হাঁটবেন? তিনি এখনও ক্ষমা চাননি, তবে দাবি করছেন গুলি চালানোর নির্দেশও দেননি। এখন দেখার, ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি হয় কি না।












Discussion about this post