অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস ও বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের মধ্যে বৈঠক শেষ হয়েছে। যে বৈঠকের দিকে তাঁকিয়ে ছিল গোটা বাংলাদেশ। অনেকেই মনে করছিলেন, প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের লন্ডন সফরের মূল কারণই ছিল এই বৈঠক। কারণ, এই বৈঠকের ওপর তাঁর রাজনৈতিক ভবিষ্যত অনেকটাই নির্ভর করছিল। বিএনপির চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া অসুস্থ, তিনি লন্ডন থেকে চিকিৎসা করিয়ে ফিরলেও পুরোপুরি সুস্থ হননি। তবে তাঁর নির্দেশেই শেষ পর্যন্ত তাঁর পুত্র তারেক রহমান প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠকে রাজি হয়েছেন বলেই খবর। অর্থাৎ এই বৈঠকের তাৎপর্য আরও বেড়ে গিয়েছিল। জানা যাচ্ছে, বাংলাদেশের সময় শুক্রবার দুপুরে লন্ডনে এই গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকটি হয় অত্যন্ত সৌহার্দ্যপূর্ণভাবে। বৈঠকের শেষে এক যৌথ সাংবাদিক সম্মেলনও হয়। তাতে উপস্থিত ছিলেন, জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমান, প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। যৌথ বিবৃতিতে আরও জানানো হয়, তারেক রহমান প্রধান উপদেষ্টার কাছে আগামী বছরের রমজানের আগে নির্বাচন আয়োজনের জন্য প্রস্তাব করেন। দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াও মনে করেন, ওই সময় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে ভালো হয়। প্রধান উপদেষ্টা বলেন যে তিনি আগামী বছরের এপ্রিলের প্রথমার্ধের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠানের ঘোষণা দিয়েছেন। সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করা গেলে ২০২৬ সালের রমজান শুরু হওয়ার আগের সপ্তাহেও নির্বাচন আয়োজন করা যেতে পারে। সে ক্ষেত্রে সেই সময়ের মধ্যে সংস্কার ও বিচারের বিষয়ে পর্যাপ্ত অগ্রগতি অর্জন করা প্রয়োজন হবে।
অর্থাৎ মুহাম্মদ ইউনূস যে এপ্রিল মাসে ভোটের ঘোষণা দিয়েছিলেন, তারেকের সঙ্গে বৈঠকের পর তার থেকে কিছুটা এগিয়ে এলেন। ভোট হতে পারে আগামী ফেব্রুয়ারি মাসে। উল্লেখ্য, মুহাম্মদ ইউনূস আগামী এপ্রিলে ভোটের সময় ঘোষণার পরও বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান স্পষ্টভাষায় দাবি করেছিলেন, নির্বাচন আগামী ডিসেম্বরের মধ্যেই করাতে হবে। অর্থাৎ তারেক রহমানও কিছুটা পিছিয়ে যেতে সম্মত হলেন। ভোট হবে ফ্রেব্রুয়ারি মাসে, রমজানের আগেই। বাংলাদেশের রাজনৈতিক মহলের দাবি, শুধুমাত্র এটা নিয়েই আলোচনা হয়নি ওই হাই-ভোল্টেজ বৈঠকে। আসলে আলোচনার টেবিলে ছিল আরও অনেক কিছুই। শুধু নির্বাচন নয়, দুই তরফের মধ্যে মধ্যস্থতা হয়েছে প্রায় সব বিষয়েই। এদিন ঢাকায় দাঁড়িয়ে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফকরুল যেমন বলেন, লন্ডনে প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের বৈঠকটি সত্যিকার অর্থে একটি টানিং পয়েন্ট পরিণত হয়েছে । তিনি দুই নেতা ধন্যবাদও জানান বাংলাদেশের নির্বাচনের অগ্রদূত হিসেবে।
বাইট – মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, বিএনপির মহাসচিব
লন্ডনে যে কিছু একটা ঘটতে চলেছে, সেটা আগামই অনুমান করছিলেন সে দেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। তাঁদের অনেকেরই দাবি ছিল, মুহাম্মদ ইউনূস আসলেই তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠক করতে ছুঁটে গিয়েছিলেন লন্ডনে। বাকিটা ছিল আই-ওয়াশ। আসলে তারেক রহমান বন্দর এবং রাখাইন করিডোর নিয়ে বাংলাদেশের সেনাপ্রধানের সুরেই প্রতিবাদ জানিয়ে আসছিলেন। নির্বাচন ইস্যুতে কিছুটা পিছিয়ে এসে তারেক রহমানকে মানিয়ে মুহাম্মদ ইউনূস আসলে বাকি দুটি ইস্যুতে ছাড়পত্র জোগাড় করে এলেন। অর্থাৎ, তারেক দেশে ফেরার আগেই যাতে মুহাম্মদ ইউনূস চট্টগ্রাম বন্দর এবং রাখাইন করিডোর নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারে, এবং তখন বিএনপিও যাতে অন্তর্বর্তী সরকারকে সমর্থন করে এটা নিশ্চিত করে এলেন মুহাম্মদ ইউনূস। এমনটা হলে, ফের একবার বাংলাদেশের আকাশে আশঙ্কার কালো মেঘ ঘনাতে পারে। কিন্তু একটা প্রশ্ন থেকেই যায়, তারেক রহমান কেন দেশে ফিরছেন না, অথবা কবে তিনি বাংলাদেশে ফিরবেন?
দীর্ঘ ১৭ বছর লন্ডনে বসবাস করছেন তারেক রহমান। আওয়ামী লীগের সাড়ে ১৬ বছরের শাসনামল এবং অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ১০ মাস। কেন তিনি দেশে ফিরছেন না? বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা যেমন জানিয়ে দিলেন, তারেক রহমানের দেশে ফেরায় কোনও বাঁধাই নেই।
রজানৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, তাঁর দেশে না ফেরার কারণ একাধিক। এরমধ্যে উল্লেখযোগ্য হল, দেশে ফিরলেই তাঁকে গ্রেফতার করতে পারে সেনাবাহিনী। কারণ, তিনি দেশ ছাড়ার সময় সেনাবাহিনীর কয়েকজন আধিকারিকদের কাছে দেশে না ফেরা এবং ফের রাজনীতিতে প্রবেশ না করার মুচলেক দিয়ে গিয়েছিলেন। বলা হচ্ছে, তৎকালীন সেই সেনা আধিকারিকরা এখন অনেকেই জেনারেল পদ মর্যাদায় রয়েছেন। তাই তিনি গ্রেফতারির ভয় করছেন। আরও একটি কারণ হতে পারে, মুহাম্মদ ইউনূসকে কিছুটা সময় দেওয়া। বাংলাদেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একটি অংশ দাবি করছে, ইউনূস, সেনাপ্রধান, জামাতের আমীর এবং তারেক রহমানের মধ্যে একটি গোপন চুক্তি হয়েছিল। যার মোকাবেক তারেক দেশে ফিরছেন না। কারণ, তিনি দেশে ফিরলেই জনপ্রিয়তা হারাবেন ইউনূস। রাজনৈতিক নেতা হিসেবে তারেকই এখন প্রধানমন্ত্রীত্বের সবচেয়ে বড় দাবীদার। বিএনপি তো বটেই, বাংলাদেশের পুলিশ-প্রশাসন, আমলা স্তরেও অনেকে তারেকের দিকে ভিড়বেন। এমনকি সেনাবাহিনীর একটি অংশও তারেককে চাইছেন। এই আবহে তারেকের সঙ্গে চুক্তি হয়েছিল ইউনূস ও জামাতের। তাঁদের কাজ মিটলেই দেশে ফিরবেন তারেক এবং বাংলাদেশের ভার গ্রহন করবেন। হয়তো সেই সময়টা এসে গিয়েছে। তাই লন্ডনে ছুঁটে গেলেন ইউনূস সাহেব।












Discussion about this post