মঙ্গলবার সকাল থেকেই ঢাকার জাতীয় সংসদ ভবন ছিল টানটান উত্তেজনার কেন্দ্রে। বেলা পৌঁনে ১১টায় নবনির্বাচিত সদস্যদের শপথগ্রহণ শুরু হতেই শুরু হয় নজিরবিহীন রাজনৈতিক নাটক। একদিকে বিপুল জনমত নিয়ে ক্ষমতায় বসা বিএনপি, অন্যদিকে ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়নে মরিয়া জামায়াতে ইসলামি ও এনসিপি।মাঝখানে দাঁড়িয়ে থমকে গেল সংবিধান সংস্কারের প্রক্রিয়া।বিএনপি আগেভাগেই স্পষ্ট করে দেয়, তারা সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নিলেও ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’-এর সদস্য হিসেবে কোনো শপথ নেবে না। এতেই ক্ষোভে ফেটে পড়ে জামায়াতে ইসলামি। প্রথমে শপথ বর্জনের হুমকি দিলেও বেলা সাড়ে ১২টা নাগাদ সুর নরম করে জামায়াত প্রার্থীরা সংসদ ও সংস্কার পরিষদ-উভয় পদেই শপথ নেন। তবে বিএনপির নির্বাচিত ২১২ জন সদস্য অনড় থাকায় প্রশ্ন উঠেছে সংস্কার পরিষদের আইনি ভিত্তি নিয়ে।বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদের সাফ জানান, বর্তমানে বাংলাদেশে যে সংবিধান রয়েছে, তাকে অনুসরণ করাই যৌক্তিক। সেখানে ‘সংস্কার পরিষদ’-এর কোনো উল্লেখ নেই। তিনি প্রশ্ন তোলেন, ‘সংস্কার পরিষদের সদস্যকে কে শপথবাক্য পাঠ করাবেন, তা আগে ঠিক করতে হবে।’
বিএনপি মনে করছে, প্রচলিত সংবিধানের বাইরে গিয়ে অন্য কোনো কাঠামোতে শপথ নেওয়া অসাংবিধানিক।এদিকে জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নে অনড় এনসিপি। এই সনদে প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা কমিয়ে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বাড়ানো এবং দ্বি-কক্ষ বিশিষ্ট আইনসভার কথা বলা হয়েছে। বিএনপির এই অবস্থানে ক্ষুব্ধ এনসিপি নেতা সারজিস আলম সরাসরি আক্রমণ শানিয়েছেন। তাঁর অভিযোগ, ‘জুলাইয়ের সঙ্গে গদ্দারি করে বিএনপি সরকার যাত্রা শুরু করেছে।’তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রীর কুর্সিতে বসার দিনেই শরিক ও বিরোধী শিবিরের এই আক্রমণ নতুন সরকারের জন্য অশনি সংকেত। বিএনপি যদি জুলাই সনদ পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়ন না করে, তবে জামায়াত ও ছাত্রদের আন্দোলনের শক্তি আবার রাজপথে নামতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।ক্ষমতায় আসার পর, বাংলাদেশ জাতীয় দল বিএনপি গণভোট গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। গতকাল অর্থাৎ ১৭ ই ফেব্রুয়ারি মঙ্গলবার তারেক রহমান সহ বিএনপির সংসদ সদস্যরা সাংবিধানিক সংস্কার কমিশনের সদস্য হিসেবে শপথ নেননি। বিএনপি নেতা সালাহউদ্দিন আহমেদের মতে-‘আমরা এটি গ্রহণ করি না।বিএনপির এই পদক্ষেপ জুলাই সনদের ভবিষ্যৎকে ঝুলন্ত অবস্থায় ফেলে দিয়েছে।’
ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বাংলাদেশে গণতন্ত্র সংস্কারের জন্য জুলাই সনদের প্রস্তাব করেছিল এবং এই প্রস্তাবের উপর একটি গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছিল, যা ৫০ শতাংশেরও বেশি নাগরিকের দ্বারা অনুমোদিত হয়েছিল।প্রাথমিক পরিকল্পনা অনুসারে, জুলাই সনদ বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া আজ থেকে শুরু হওয়ার কথা ছিল। প্রাথমিকভাবে, সকল সংসদ সদস্যকে সাংবিধানিক সংস্কার কাউন্সিলের সদস্য হিসেবে শপথ গ্রহণের কথা ছিল, কিন্তু যখন বিএনপির সংসদ সদস্যরা মঞ্চে আসেন, তখন তারা শপথ নেননি। বিএনপি প্রধান তারেক রহমান নিজেই দায়িত্ব পালন করেন।এদিকে, জামায়াতে ইসলামীও এটি গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। স্থানীয় সংবাদ মাধ্যমের সাথে কথা বলতে গিয়ে জামায়াতে ইসলামীর ডেপুটি আমির সৈয়দ আবদুল্লাহ মহম্মদ তাহের বলেন, বিএনপির মতো তাদের সংসদ সদস্যরাও শপথ নেবেন না। তারা তাদের নিজস্ব পদ্ধতিতে কাজ করবেন। জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের বৃহত্তম বিরোধী দল।
২০২৪ সালের আগস্টে, ছাত্র বিদ্রোহের পর বাংলাদেশে শেখ হাসিনাকে উৎখাত করা হয়। এই বিদ্রোহ জুলাই মাসে শুরু হয়েছিল এবং ছাত্রদের নেতৃত্বে ছিল। এরপর, ইউনূসের নেতৃত্বে একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হয়। ইউনূস সরকার গণতন্ত্র সংস্কারের জন্য জুলাই সনদের প্রস্তাব করে। এই প্রস্তাবে একজন ব্যক্তিকে একসাথে ১০ বছরের বেশি সময় ধরে প্রধানমন্ত্রীর পদে অধিষ্ঠিত থাকতে নিষেধ করার মতো বিধান অন্তর্ভুক্ত ছিল।
বিএনপি’র সরকার বাংলাদেশ আশিন হতেই জুলাই সনদ যে অস্তিত্বহীন হতে চলেছে তা বোঝাই যাচ্ছে।












Discussion about this post