২০১৪ সালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার পর থেকে বিগত এগারো বছর ধরে তিনিই ভারতের সর্বেসর্বা। এই সময়কালে তিনি ভারতকে বিশ্বমঞ্চে যেমন প্রবলভাবে তুলে ধরেছেন, তেমনই তিনি নিজের ভাবমূর্তিও বিশ্বমঞ্চে উজ্জ্বল করেছেন। তাঁর নেতৃত্বে ভারত এই মুহূর্তে বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম অর্থনীতি। দক্ষিণ এশিয়ার ভূ রাজনীতিতে তিনি যেমন একজন প্রথমসারির নেতা, তেমনই তিনি বিশ্বমঞ্চেও একজন জনপ্রিয় নেতা হিসেবে উঠে এসেছেন। নরেন্দ্র মোদি বিগত এগারো বছরে বহুবার বিদেশ সফর করেছেন, কিন্তু এবার তাঁর সফর যথেষ্ট উল্লেখযোগ্য। কারণ, তিনি এগারো বছরে প্রথমবার ৮ দিনের বিদেশ সফর করছেন, তিনটি মহাদেশের পাঁচটি দেশে ঘুরছেন। কিন্তু তাঁর লক্ষ্য বা মিশন একটাই। সেটা হল, গ্লোবাল সাউথে ভারতকে একটা মর্যাদাপূর্ণ স্থান করে দেওয়া এবং ভারতের ভবিষ্যত অগ্রগতি আরও মজবুত করা।
গত মাসে নরেন্দ্র মোদি জি-৭ বৈঠকে যোগ দিতে কানাডা গিয়েছিলেন। ওই সফরে তিনি কানাডা যাওয়ার আগে ও পরে সাইপ্রাস ও ক্রোয়েশিয়াতেও গিয়েছিলেন। এমনকি জি-৭ বৈঠকের ফাঁকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আমন্ত্রণ দূরে ঠেলেই নরেন্দ্র মোদি ক্রোয়েশিয়া চলে গিয়েছিলেন। যা এর আগে ভারতের কোনও প্রধানমন্ত্রী করার সাহস দেখাতে পারেননি। যাইহোক, এবার তিনি পাঁচটি দেশ সফর করবেন ব্রিকস সম্মেলনের ফাঁকে। এর মধ্যে আফ্রিকার দুটি দেশ ঘানা ও নামিবিয়া রয়েছে। উত্তর আমেরিকার ট্রিনিদাদ ও টোবাগো এবং দক্ষিণ আমেরিকা মহাদেশের ব্রাজিল আর্জেন্টিনা রয়েছে। এই মুহূর্তে নরেন্দ্র মোদি নামিবিয়াতে অবস্থান করছেন, সেখান থেকেই আট দিনের সফর শেষ করে নয়া দিল্লি ফিরবেন।
বহু চর্চিত গ্লোবাল সাউথ বা তৃতীয় বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশগুলির দিকে এবার নজর নরেন্দ্র মোদির। তাঁর লক্ষ্য স্থির, ২০৪৭ সালের মধ্যে ভারতকে বিকশিত দেশে পরিণত করা। এমনিতেই এই মুহূর্তে ভারত বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম অর্থনীতি, যা খুব শীঘ্রই তিন নম্বরে উঠে আসবে। এরপর সামনে শুধুই চিন ও আমেরিকা। ফলে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সামনে চ্যালেঞ্জ খুব কঠিন। একসাথে চিন ও আমেরিকার সঙ্গে টক্কর দিতে হলে ভবিষ্যতের লগ্নি ও বৈদশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী করতে হবে। নরেন্দ্র মোদির এই আট দিনের সফরের লক্ষ্য সেটাই। আফ্রিকার দেশগুলি প্রাকৃতিক ও খনিজ সম্পদে ভরপুর। এর মধ্যে রেযার আর্থ মিনারেলস বা বিরল খনিজের অংশ বিপুল। ভারতের উদ্দেশ্য এই বিরল খনিজের দিকেই। ঘানা এমনিতেই ভারতের সোনা আমদানির অন্যতম প্ল্যাটফর্ম। এবার লিথিয়াম ও ইউরেনিয়মের মতো বিরল খনিজ ঘানা থেকে নিয়ে আসতে চান মোদি, সেই লক্ষ্যে চুক্তিও সেরে এসেছেন তিনি। আবার ক্রমশ উন্নয়নশীল ঘানায় ভারতীয় গাড়ি, যন্ত্রাংশ ও ভারী ইঞ্জিনিয়ারিং পণ্যের বাজার খুলে দিয়েছেন তিনি। পাশাপাশি ঘানার সমুদ্র বন্দরে ভারতীয় লগ্নি নিশ্চিত করে এসেছেন নরেন্দ্র মোদি। অন্যদিকে নামিবিয়া আবার হীরার ভাণ্ডারে পরিপূর্ণ। এছাড়া বিরল খনিজের অস্তিত্বও রয়েছে। তাই নাবিবিয়ার উন্নয়নে ভারতের লগ্নি নিশ্চিত করে নরেন্দ্র মোদি বিরল খনিজের দিকে হাত বাড়াচ্ছেন। যা আগামীদিনে তথ্য ও প্রযুক্তি শিল্প ও ইলেকট্রিক গাড়ি শিল্পের অন্যতম উপাদান।
একইভাবে আর্জেন্টিনাতে বিপুল পরিমান প্রাকৃতিক গ্যাস ও লিথিয়াম আছে। আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্টের সঙ্গে নরেন্দ্র মোদি বেশ কয়েকটি চুক্তি করেছেন লিথিয়াম ও প্রাকৃতিক গ্যাস আমদানি করা নিয়ে। এটা ভারতের কাছে একটা বড় পাওনা হতে পারে। ব্রাজিল আবার ভারত থেকে প্রতিরক্ষা চুক্তি করেছে। ব্রহ্মস মিসাইল, আকাশ এয়ার ডিফেন্স সহ তেজস যুদ্ধবিমান কিনতে আগ্রহী ব্রাজিল।
কূটনৈতিক মহলের মতে, আফ্রিকার দিকে হাত বাড়িয়ে নরেন্দ্র মোদি যেমন চিনকে টক্কর দিতে চাইছেন। তেমনই দক্ষিণ আমেরিকার আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলে একাধিক চুক্তি করে তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে কড়া চ্যালেঞ্জর মুখে ঠেলে দিলেন। আফ্রিকার দেশগুলি বুঝতে পেরেছে চিন তাঁদের ঋণের বোঝায় জর্জরিত করে ফায়দা তুলতে চায়। যেটা ভারতের উদ্দেশ্য নয়। ভারতীয় সংস্থাগুলি আফ্রিকায় বিনিয়োগ করে কল কারখানা স্থাপনে আগ্রহী। তাতে যেমন সেই দেশগুলির অর্থনীতি চাঙ্গা হবে, লাভ হবে ভারতেরও। অপরদিকে আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিল ভারতের সঙ্গে বাণিজ্য করে তাঁদের ডলার নির্ভরতা কমাতে পারে। ভারত যেমন তেল, গ্যাস ও বিরল খনিজ আমদানি করবে, তেমনই জেরেরিক ওষুধ রফতানি করবে। এটা ওই দুই দেশের অর্থনীতির জন্য বিশাল উত্তরণ। সবমিলিয়ে নরেন্দ্র মোদি তাঁর বিদেশনীতি ও কূটনীতিতে এবার সরাসরি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চিনকে চালেঞ্জের মুখে ফেলে দিয়েছেন।












Discussion about this post