আহমেদাবাদের মর্মান্তিক বিমান দুর্ঘটনায় এখনও পর্যন্ত প্রাণ হারিয়েছেন ২৬৫ জন। ওই অভিসপ্ত বিমানের একজন যাত্রী অলৌকিকভাবে প্রাণে বাঁচলেও বাকিরা এখন শুধুই স্মৃতি। তবে দূর্ঘটনার পর একের পর এক ঘটনা সামনে আসছে, যা নিজের অজান্তেই চোখের কোনে জল আসার জন্য যথেষ্ট। এমনই কিছু ট্রাজিক ঘটনা নিয়ে এই প্রতিবেদন।
স্ত্রীর শেষ ইচ্ছা ছিল মৃত্যুর পর তাঁর অস্থি যেন তাঁর জন্মস্থান গুজরাতের নর্মদা নদীর জলে ভাসানো হয়। মাত্র এক সপ্তাহ আগেই মৃত্যু হয়েছিল স্ত্রীর। শোকাতুর স্বামী দুই শিশু সন্তানকে লন্ডনে রেখে এসেছিলেন স্ত্রীর শেষ ইচ্ছা পূর্ণ করতে। কিন্তু ফেরা হল না তাঁরও। অকালেই অনাথ হল দুই সন্তান। আহমেদাবাদের সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ওড়ার কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই ভেঙে পড়ে এয়ার ইন্ডিয়ার লন্ডনগামী বিমান। ওই বিমানেই দেশে ফিরছিলেন লন্ডনপ্রবাসী অর্জুন মনুভাই পাটোলিয়া। তাঁর স্ত্রী ভারতীবেনের মৃত্যু হয়েছে মাত্র সপ্তাহখানেক আগেই। স্ত্রীর মৃত্যুর পর তাঁর শেষ ইচ্ছা মেনেই গুজরাতের আমরেলি জেলায় নিজের গ্রাম ভাদিয়ায় এসেছিলেন অর্জুন। শেষকৃত্য সম্পন্ন করে ওই অভিসপ্ত বিমানে চেপেছিলেন বছর ৩৬-এর অর্জুন। কিন্তু এখন সব শেষ। মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে অনাথ হয়ে গেল তাঁর দুই শিশু সন্তান। তাঁদের বয়স যথাক্রমে চার এবং আট বছর। এমনই অনেক ঘটনাই সামনে আসছে।
যেমন, বিগত ৬ বছরে লন্ডনেই পসার জমিয়ে ফেলেছিলেন চিকিৎসক প্রতীক জোশী। তাঁর স্ত্রীও চিকিৎসক। কিন্তু রাজস্থানের উদয়পুরে একটি বেসরকারি হাসপাতালে কর্মরত ছিলেন। এই চিকিৎসক দম্পতির তিন সন্তান। দুই যমজ ছেলে ও এক মেয়ে। ওই চিকিৎসক দম্পতি ঠিক করেছিলেন এবার ভারতের পাট চুকিয়ে লন্ডনেই পাকাপাকি বাসস্থান করবেন। সেই মতো সব ব্যবস্থা পাকা হয়ে গিয়েছিল। প্রতীক ভারতে আসেন এবং সবকিছু গুছিয়ে সপরিবারে লন্ডনের উদ্দেশে রওনা হয়েছিলেন এয়ার ইন্ডিয়ার ওই বিমানে। এমনকি অভিসপ্ত ওই বিমানের ভিতর থেকে এই চিকিৎসক দম্পতি সন্তানদের নিয়ে একটি সেলফিও তুলেছিলেন। সমাজমাধ্যমে শেয়ার করা ওই সেলফি এখন রীতিমতো ভাইরাল, কিন্তু নেই ওই হাসিখুশি পরিবারটিই। কারণ আহমেদাবাদ বিমান দুর্ঘটনায় নিহতদের মধ্যে ছিলেন এই পাঁচ জনও।
১০ ঘণ্টা পরেই দেশে ফিরে যাওয়ার কথা ছিল ব্রিটিশ যাত্রী জেমি রে মিকের। আহমেদাবাদ বিমানবন্দরের লাউঞ্জে বসে ভারতকে বিদায় জানিয়ে একটি ভিডিও পোস্ট করেছিলেন এই তরুণ। হাসিখুশি ওই ব্রিটিশ তরুণের সেই ভিডিও এখন সমাজমাধ্যমে ভাইরাল। তখনও হয়তো সে কল্পনাও করতে পারেনি যে সামাজিক মাধ্যমে এটাই তাঁর শেষ পোস্ট হবে। সঙ্গী এক বন্ধুকে সঙ্গে নিয়েই সেই ভিডিওতে তিনি বলেছিলেন বিদায় ভারত, কিন্তু মর্মান্তিকভাবে তাঁদের বিদায় নিতে হল পৃথিবী থেকে।
এবার আসি অন্য গল্পে। এয়ার ইন্ডিয়ার বিমান ভেঙে পড়েছিল আহমেদাবাদের এক মেডিকেল কলেজের পড়ুয়া হোস্টেলের উপর। সেই সময় হস্টেলে মধ্যাহ্নভোজ সারছিলেন ডাক্তারি পড়ুয়ারা। তাঁদের মধ্যে ছিলেন আরিয়ান রাজপুত। সহপাঠীদের সঙ্গে তিনিও খেতে বসেছিলেন। কিন্তু আরিয়ানের খাওয়া একটু আগে হয়ে যাওয়ায় তিনি হাত ধুতে চলে যান। আর ঠিক সেই সময়েই বিকট শব্দে হস্টেলের উপর আছড়ে পড়ে এয়ার ইন্ডিয়ার বিমান। দাউ দাউ করে আগুন জ্বলে যায়। আতঙ্কে দৌড়াদৌড়ি শুরু হয়ে যায়। হস্টেল ছেড়ে অনেকে বেরিয়ে আসতে পারলেও পারেননি আরিয়ান এবং তাঁর মতোই আরও কয়েক জন ডাক্তারি পড়ুয়া।
আবার অবিশ্বাস্যভাবে প্রাণে বাঁচার উদাহরণও আছে। যেমন বিশ্বাসকুমার রমেশ। ওই অভিসপ্ত বিমানের একমাত্র বেঁচে যাওয়া যাত্রী। ৪০ বছরের ভারতীয় বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ নাগরিক রমেশ ২০০৩ সাল থেকে ব্রিটেনে থাকেন। তাঁর স্ত্রী এবং সন্তানেরা সেখানেই রয়েছেন। এক আত্মীয়ের বাড়িতে বেড়াতে এসেছিলেন রমেশ ও তাঁর ভাই। দুজনেই ফিরছিলেন ওই বিমানে। বোয়িং কোম্পানির বিমানের যে আসনটা সবচেয়ে বিরক্তিকর, সেই ১১এ আসনেই বসেছিলেন রমেশ। কারণ ওই আসনের পাশে জানালা না থাকলেও আছে জরুরিকালীন দরজা। আর সেটার জন্যই আবিশ্বাস্যফভাবে প্রাণে বাঁচেন রমেশ। তাঁর গুরুতর চোটও লাগেনি, রীতিমতো পায়ে হেঁটেই তিনি ধ্বংসস্তুপের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসেন। অন্যদিকে অঙ্কলেশ্বরের বাসিন্দা মিস চৌহান সড়কপথে আহমেদাবাদের উদ্দেশে রওয়ানা দিয়েছিলেন। কিন্তু পড়ে যান ট্রাফিক জ্যামে। যে কারণে পাঁচ মিনিট দেরিতে বিমানবন্দরে পৌঁছন ওই তরণী। যানজটে আটকে থাকাকালীন অনলাইনে ফ্লাইটের জন্য ‘চেক-ইন’ও করেছিলেন তিনি। কিন্তু দেরি হওয়ায় তাঁকে বিমানে ওঠার অনুমতি দেওয়া হয়নি। প্রথমে মন খারাপ হলেও পরে জানতে পারেন, ওই বিমানই দুর্ঘটনার মুখে পড়েছে। মনে মনে তিনি ঈশ্বরকে ধন্যবাদ জানান, ট্রাফিক জ্যামই তাঁর প্রাণ বাঁচিয়ে দিল।












Discussion about this post