বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নির্যাতন, জঙ্গিবাদ, খিলাফতের ডাক নিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা মহাপরিচালক তুলসী গ্যাবার্ড যে ভাষায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন তা নিয়ে যথেষ্ট চাপে পড়েছে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। যদিও জামাত ও হিজবুতের চাপের মুখে নতীস্বীকার করে তুলসী গ্যাবার্ডের মন্তব্যের বিরুদ্ধে যথেষ্ট কড়া ভাষায় একটা প্রতিক্রিয়া দিয়েছে ইউনূসের সরকার। ফলে চাপ আরও বেড়েছে। এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের তদারকি সরকারের উপদেষ্টারা এখন একটা আতঙ্কের মধ্যে রয়েছেন বলেই সূত্রের খবর। সেই সঙ্গে ভয়ে ভয়ে দিন কাটাচ্ছেন সদ্য গঠিত জাতীয় নাগরিক পার্টি এবং বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতারাও। এই মুহূর্তে বাংলাদেশ প্রশাসনের মধ্যে একটা থমথমে পরিবেশ বিরাজ করছে। ওয়াকিবহাল মহল কৌতুহলি, এটা কি ঝড়ের আগের থমথমে পরিবেশ নাকি অন্য কোনও আতঙ্ক। আর ঝড় যদি আসে সেটা কোন দিক থেকে, ভারত নাকি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র?
এপ্রিল মাসে থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাঙ্ককে বিমস্টেকের শীর্ষ সম্মেলন রয়েছে। সেখানে উপস্থিত থাকার কথা ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের। নয়া দিল্লির একাধিক সূত্রের দাবি, ওই সম্মেলনের ফাঁকে একটি পার্শ্ববৈঠকে বসার জন্য বারবার অনুরোধ প্রস্তাব দিচ্ছে ঢাকা। অর্থাৎ, মুহাম্মদ ইউনূস বৈঠকে বসতে চাইছেন নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, নয়া দিল্লি কি এই প্রস্তাবে রাজি হবে? জানা যাচ্ছে, ভারতের বিদেশ মন্ত্রক ও প্রধানমন্ত্রীর দফতর এই ব্যাপারে এখনও কোনও সিদ্ধান্ত নেয়নি। জানা যাচ্ছে, বিভিন্ন মহলের থেকে রিপোর্ট চাওয়া হয়েছে। সাউথ ব্লকের একটা অংশ যেমন পরিস্কার বলে দিয়েছে, ক্ষমতাবদলের পর থেকে বাংলাদেশের তদারকি সরকারের একাধিক উপদেষ্টা এবং বৈষম্যবিরোধী ছাত্রনেতাদের একটা বড় অংশ ভারতের বিরোধীতা করে আসছে। ফলে প্রত্যেকদিন গালি দেওয়া হবে, আবারও বৈঠকেও বসতে চাইবে-দুটি বিষয় কী করে একসাথে চলতে পারে?
পাশাপাশি ভারতের গুপ্তচর এবং গোয়েন্দা সংস্থাগুলির মনোভাব হল, বাংলাদেশ চাইল বলেই যে আলোচনায় বসতে হবে, এমন কোনও কারণ ঘটেনি। তাঁদের দাবি, সাউথ ব্লক বাংলাদেশকে বারবার যে বার্তা দিয়েছে, নাশকতা, হিংসা, সংখ্যালঘুদের ওপর অত্যাচার নিয়ে, ঢাকা তা ক্রমাগত অস্বীকার করে গিয়েছে। ফলে এখন আলোচনায় বসার মতো পরিবেশই তৈরি হয়নি। তবে ওয়াকিবহাল মহলের মতে, বিমস্টেকের বৈঠক শুরু হতে এখনও সপ্তাহ দুয়েক বাকি, এর মধ্যে খেলা অনেকটাই ঘুরে যাবে। এ ক্ষেত্রে স্মরণে রাখা প্রয়োজন, গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসে নিউ ইয়র্কে রাষ্ট্রপুঞ্জের সাধারণ সভার বৈঠকের ফাঁকেও নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে মুহাম্মদ ইউনূসের একটি বৈঠকের প্রস্তাব দিয়েছিল ঢাকা, নয়া দিল্লি তা সরাসরি খারিজ করেছিল। এবারও ঢাকার প্রস্তাব খারিজ হতে পারে বলেই সূত্রের খবর।
বাংলাদেশে খেলা যে ঘুরতে চলেছে তা বোঝাই যাচ্ছে। সেটা ঢাকার সচিবালয়গুলির অলিন্দে কান পাতলেই বোঝা যাবে একটা থমথমে পরিবেশ বিরাজ করছে। মুহাম্মদ ইউনূস নিজেও বেশ কয়েকবার বলেছিলেন আওয়ামী লীগকে বাংলাদেশ থেকে বিতাড়িত করা হবে। যদিও সম্প্রতি তাঁর কথায় কিছুটা নরম মনোভাব এসেছে। অন্যদিকে, বাংলাদেশের সেনাপ্রধান সম্প্রতি বলেছিলেন, বাংলাদেশের নির্বাচন হবে ‘ইনক্লুসিভ’। অর্থাৎ সর্বসম্মত ও সর্বজনীন। সেই অর্থে আওয়ামী লীগও নির্বাচনে অংশ নিতে পারবে। প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসও কার্যত সেটা মেনে নিয়েছেন। কিন্তু এখনও বাধ সাধছেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র নেতারা, যারা এখন নতুন রাজনৈতিক দল তৈরি করেছেন। সম্প্রতি জাতীয় নাগরিক পার্টির অন্যতম মুখ হাসনাত আবদুল্লাহ একটি লম্বাচওড়া ফেসবুক পোস্ট করেছেন। যা কার্যত বিস্ফোরক অভিযোগ বললেও কম বলা হয় না।
তিনি গত ১১ মার্চ ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে হওয়া এক বৈঠক নিয়ে পোস্টটি করেন। হাসনাত লিখেছেন, কিছুদিন আগে আমি আপনাদের বলেছিলাম যে, ‘রিফাইন্ড আওয়ামী লীগ’ নামে নতুন একটি ষড়যন্ত্র নিয়ে আসার পরিকল্পনা চলছে। এই পরিকল্পনা পুরোপুরি ভারতের। সাবের হোসেন চৌধুরী, শিরিন শারমিন, তাপসকে সামনে রেখে এই পরিকল্পনা সাজানো হচ্ছে। আমি সহ আরও দুইজনের কাছে ক্যান্টনমেন্ট থেকে এই পরিকল্পনা উপস্থাপন করা হয় ১১ই মার্চ দুপুর ২:৩০এ। আমাদেরকে প্রস্তাব দেওয়া হয় আসন সমঝতার বিনিময়ে আমরা যেন এই প্রস্তাব মেনে নিই।আমাদেরকে বলা হয়- ইতোমধ্যে একাধিক রাজনৈতিক দলকেও এই প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে – তারা শর্তসাপেক্ষে আওয়ামী লীগ পুনর্বাসনে রাজি হয়েছে। তিনি আরও লেখেন, আমাদেরকে এই প্রস্তাব দেওয়া হলে আমরা তৎক্ষণাৎ এর বিরোধিতা করি এবং জানাই যে, আওয়ামী লীগের পুনর্বাসনের পরিকল্পনা বাদ দিয়ে আওয়ামী লীগের বিচার নিয়ে কাজ করুন। এর উত্তরে আমাদের বলা হয়, আওয়ামী লীগকে ফিরতে কোন ধরণের বাধা দিলে দেশে যে সংকট সৃষ্টি হবে, তার দায়ভার আমাদের নিতে হবে এবং ‘আওয়ামী লীগ মাস্ট কাম ব্যাক’।
তিনি আরও কিছু ভয়ানক অভিযোগ আনেন সেনাবাহিনী তথা সেনাপ্রধানের বিরুদ্ধে। তবে প্রশ্ন উঠছে, যদি ১১ মার্চ সেনাপ্রধান তাঁদের এই ধরণের প্রস্তাব দিয়ে থাকেন এবং সেদিনই তাঁরা এর বিরোধিতা করে বৈঠক বয়কট করে থাকেন। তাহলে দশ দিন পর কেন তিনি এই কথাগুলি প্রকাশ্যে বললেন? বোঝাই যাচ্ছে প্রবল চাপে পড়ে হাসনাতরা এখন বিদ্ধ্বস্ত। হাসনাত আবদুল্লাহ আরও একটি ভিডিও পোস্ট করেছেন, তাতে সরকারের উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার একটি ছোট্ট সাক্ষাৎকার রয়েছে। সাক্ষাৎকারে তিনিও সেনাপ্রধানের বিরুদ্ধে ভয়ঙ্কর অভিযোগ তুলেছেন।
শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে ফেরানোর জন্য মরিয়া ভারত। মুহাম্মদ ইউনূসকে সরানোর জন্যও প্রবল চাপ তৈরি করছে ভারত। এখন ভারতের পাশে প্রকাশ্যের দাঁড়িয়ে গেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। ফলে তাঁরাও বাংলাদেশের ইউনূস প্রশাসনকে প্রবল চাপ দিতে শুরু করেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের চার জঙ্গিবাদ, হিংসা এবং সংখ্যালঘুদের অত্যাচার বন্ধ করা নিয়ে। অপরদিকে ভারতের চাপ আওয়ামী লীগকে বাংলাদেশের মূলধারার রাজনীতিতে ফেরানো নিয়ে। হাসনাতের ফেসবুক পোস্ট থেকেই স্পষ্ট সেনাপ্রধান ওয়াকার উজ জামান তাঁর কাজ শুরু করে দিয়েছেন।হাসনাত এক জায়গায় লিখেছেন, “অপরপক্ষ থেকে রেগে গিয়ে উত্তর আসে,’ ইউ পিপল নো নাথিং। ইউ ল্যাক উইজডোম এন্ড এক্সপিরিয়েন্স। উই আর ইন দিজ সার্ভিস ফর এটলিস্ট ফোর্টি ইয়ার্স।তোমার বয়সের থেকে বেশি। তাছাড়া আওয়ামী লীগ ছাড়া ‘ইনক্লুসিভ’ ইলেকশন হবে না”। তিনি যে সেনাপ্রধানকেই উদ্দেশ্য করে বলছেন সেটা না বললেও চলে। ফলে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এবং ছাত্রনেতাদের মধ্যে এখন প্রবল আতঙ্ক এবং ভয়ের পরিবেশ। এই বুঝি শেখ হাসিনা ঢুকে পড়ল।











Discussion about this post