দুর্গার সঙ্গে একই বেদিতে পূজিত হন কালীও। ১৩৫ বছরের পুরোনো বীরভূমের সিউড়ির ডাঙ্গালপাড়ার সুরেন ঠাকুরের পুজোর খ্যাতি আজও একই রকম। বাড়ির পুজো হলেও বহু মানুষ এই পুজো দেখতে আসেন। এখানে দুর্গার সঙ্গে পূজিত হন কালীও। সারা বছরই এখানে প্রতিমা থাকে। পরের বছর ষষ্ঠীতে নতুন প্রতিমা আনার পরে সেই প্রতিমা মন্দিরের বাইরে বেরোয়। একাদশীতে হয় প্রতিমা বিসর্জন। অষ্টমীর অর্ধরাত্রির পুজোর সময়ে মা কালীর প্রাণ প্রতিষ্ঠা হয়। নবমীতে দুর্গা ও কালীর পুজো হয়। দশমীতে দুর্গার ঘট বিসর্জনের পরে সিঁদুর খেলায় মাতেন বাড়ির বৌয়েরা।
বাংলাদেশের কুমিল্লার ব্রাহ্মণবেড়িয়া এলাকার জমিদার ছিলেন হরিহর চক্রবর্তী। তিনি বাংলাদেশে থাকতেন। সেখানেই এই পুজোর সূচনা করেন। পরে সে দেশে অশান্তির সময়ে ভারতে চলে আসেন তাঁরা। প্রথমে শিয়ালদহে, পরে সিউড়িতে বসবাস শুরু করেন। ধীরে ধীরে বাংলাদেশের বাড়ির সেই দুর্গা ও কালীর পুজো শুরু হয় এখানে।
যখনই এই পুজো শুরু হয়েছিল, তখন ৩০ কিলোমিটারের মধ্যে আর কোথাও দুর্গাপুজো হত না । হরিরামপুর, বংশীহারী একাধিক গ্রাম থেকে প্রচুর মানুষ ছুটে আসত এই পুজো দেখার জন্য । এই পুজো চলাকালীন চলতো বিভিন্ন অনুষ্ঠান । অষ্টমীতে আসর বসত মনসা গানের। অষ্টমীর অর্ধরাত্রির পুজোর সময়ে দেবী কালীর প্রতিমায় প্রাণ প্রতিষ্ঠা করা হয়। নবমীতে দেবী দুর্গা এবং দেবী কালী, দু’জনকেই পুজো করা হয়। দশমীতে মা দুর্গার ঘট বিসর্জন হয় এবং সিঁদুর খেলা হয়। একাদশীতে পুরোনো প্রতিমাগুলি বিসর্জন করা হয়।
ডাঙ্গাল পাড়ার সুরেন ঠাকুরের বাড়ির পুজোতে মা দুর্গার ডানদিকে রয়েছেন গনেশ, সরস্বতী এবং বাঁদিকে রয়েছেন কার্তিক, লক্ষী। এখানে দেবী দুর্গার সঙ্গে একই বেদিতে পূজিতা হন মা কালীও। এই বাড়িতে পুজোর পরে সারাবছর প্রতিমা থাকেন। নিত্য পুজো হয়। ঠিক পরের বছরের পুজোয় ষষ্ঠীতে পুরোনো দুর্গা প্রতিমা ও কালী প্রতিমা পুজোর পরে মন্দিরের বাইরে বার করে রাখা হয়। ওই ষষ্ঠীতেই নতুন দুর্গা প্রতিমা আসে মন্দিরে, সেটার পুজো হয় সন্ধ্যাবেলায়।
প্রথম অবস্থায় মন্দিরে কেবল মাটির দেওয়াল থাকলেও পরবর্তীতে মাথায় টিনের চাল করা হয় ৷ সেই পুরানো মন্দিরেই এবারও পুজোর আয়োজন করা হয়েছে । সপ্তমীতে খিচুড়ি, অষ্টমীতে লুচি পায়েস এবং নবমীতে অন্নভোগ হয় । একসময় পুজোর জোগাড় থেকে শুরু করে রান্নার আয়োজনে থাকতেন চক্রবর্তী বাড়ির বউ এবং মেয়েরা । তবে এখন বাড়িতে মহিলা সদস্য কম তাই আত্মীয়স্বজনও পুজোর কাছে হাত লাগায় ৷ দীর্ঘ বহু বছর ধরে চক্রবর্তী বাড়ির ছেলেরাই এই পুজোর আয়োজন করে আসছেন । কোভিডের পর থেকে বাইরের পুরোহিত দিয়েই এই পুজো হয় । পুজোর শেষে দুর্গা ও কালী প্রতিমা নিরঞ্জন হলেও সারা বছর এই মন্দিরে নিত্যপুজো চলতে থাকে।
সুরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী নাতি কালীপ্রসাদ চক্রবর্তী বলেন, ‘শুনেছি পূর্ববঙ্গের তৎকালীন পরিস্থিতির কথা চিন্তা করে তাঁরা চলে এসেছিলেন। ডাঙ্গালপাড়ায় এসে বসবাস শুরু করেন। এখানে নতুন করে পূজোর সূচনা করেন। এখন এই পুজোয় পাড়ার প্রায় প্রত্যেকেই অংশগ্রহণ করেন।’ ১৯৪১ সালের অস্থির সময়ে কুমিল্লা ছেড়ে হরিহর চক্রবর্তীর পুত্র সুরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী, তাঁর স্ত্রী, ছেলে ও ভাইপোরা চলে আসেন। তাঁরা প্রথমে আসেন শিয়ালদহে। তারপরে সিউড়িতে এসে বসবাস শুরু করেন। পরে এখানেই তাঁদের বাংলাদেশের বাড়ির দেবী দুর্গা ও দেবী কালীর প্রতিমায় প্রাণ প্রতিষ্ঠা করেন।












Discussion about this post