একে দুর্গাপুজো, সেই পুজো শুরুর আগে নমাজ আদায়। শুনতে অবাক লাগছে না। অবাক লাগলেও এটাই বাস্তব। গত সাড়ে তিনশো বছর ধরে আরামবাগের সরকার বাড়ির দুর্গাপুজো শুরু হয় নমাজ আদায় করে। পুজো শুরু করেন জমিদার বাবুরাম সরকার। এটা আরামবাগের প্রাচীনতম পুজো। তবে হিন্দু জমিদারের অধিকাংশ প্রজাই ছিলেন মুসলিম। তাই, জমিদার বাবুরাম সরদারের ইচ্ছা ছিল না এই পুজো শুধুমাত্র হিন্দুদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকুক। চেয়েছিলেন কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দুই সম্প্রদায়ের মানুষ শ্রেষ্ঠ উৎসবে সামিল হোক। আজও তার অন্যথা হয়নি। পুজো শুরুর আগে চালু হয় নমাজ আদায়। ইতিহাস বলছে, জমিদার বাবুরাম সরকার খোলা মনের মানুষ ছিলেন। তাই, তিনি চেয়েছিলেন দুই সম্প্রদায়ের মানুষ মিলে মিশে পুজোর আয়োজন করুক। সাড়ে তিনশো বছরের সেই রীতিতে একদিনের জন্য ছেদ পড়েনি।
এই পুজোয় আবার বোধন ষষ্ঠীতে নয়, সপ্তমীতে। পুজো শুরুর আগে হয় নমাজ পাঠ। অষ্টমী এবং নবমীতেও আগে নমাজ পাঠ পরে পুজোর সূচনা। গত ৩০ বছর ধরে আব্দুল মতলেব নমাজ পড়ে আসছে। এখানে মা দুর্গা দশভুজা নন, অভয়ারূপে চারভুজা। এই পুজো শুরু হয় কৃষ্ণনবমী থেকে। চলে টানা পনেরো দিন ধরে। প্রায় ১৮০ বছরের পুরনো এই পুজো শুরু হয়েছিল এক অলৌকিক ঘটনার মাধ্যমে। পরিবারের পূর্বপুরুষ অঘোরচন্দ্র সরকার স্বপ্নাদেশ পান দেবীর কাছ থেকে, আর সেই থেকেই সূচনা এই পূজোর।
এই পুজো কেবল সরকার পরিবারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, এই উৎসবে শামিল হন গোটা গ্রামের মানুষ। এখানে চলে একের পর এক আচার, আর আছে কিছু বিশেষ রীতি। প্রথম যে পুরোহিত, ঢাকি আর নাপিত এই পূজা শুরু করেছিলেন, তাঁদের বংশধররাই আজও নিয়ম মেনে দায়িত্ব পালন করে আসছেন। একসময় সন্ধিপুজোর সময় নৈবেদ্যতে ভ্রমর বসত, আর মিলিয়ে যেত মায়ের মূর্তির পেছনে। এখন আর ভ্রমর আসে না, তবে নানা রঙের পোকামাকড় ঠিক একইভাবে নৈবেদ্য ঘিরে বসে, আর তারপর মিলিয়ে যায় মায়ের মূর্তির পিছনে। এই অলৌকিক ঘটনা আজও ভক্তদের বিস্মিত করে। পনেরো দিন ধরে প্রতিদিন চলে চণ্ডীপাঠ।
সাকির আলি বলেন, ‘আমি মুসলিম হলেও, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বার্তা দিয়ে এই পুজো করি। দুর্গাপুজোর পরে দেবী কমলার আরাধনা করব। আর সেই পুজোর মাধ্যমেই মানুষের কাছে বার্তা দিতে চাই, সবাই ভালো থাকুন। সুস্থ থাকুন। আমাদের মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ধর্ম যার যার, কিন্তু উৎসব সবার। তাই আমি ও আমার স্ত্রী এবং পরিবারের সব সদস্যই পঞ্জিকা মতে দশভুজার পুজো করি।একটাই বার্তা, সবাই মিলেমিশে থাকুন। সব রকমের হিংসা দূর করুন। ধর্ম নিরপেক্ষ এই দেশে আমাদের একটাই পরিচয়, আমরা মানুষ। আসুন সবাই মিলে এই শারদীয় উৎসবে একাত্ম হই।’
সময় বদলছে। বদলেছে সমাজ ব্যবস্থা। কিন্তু আরামবাগের সরকার বাড়ির পুজোর রীতি নীতি এখনও আগের মতই রয়ে গিয়েছে। অনেকে বলে থাকেন, বর্তমান প্রজন্ম আর ঐতিত ঐতিহ্য ধরে রাখার পক্ষপাতি নয়। কিন্তু সরকার বাড়ির বর্তমান প্রজন্ম অতীত ঐতিহ্য ধরে রাখতে বদ্ধপরিকর। তাই, সাড়ে তিনশো বছর আগে যে রীতি দিয়ে পুজোর সূচনা হয়েছিল, সেই রীতি আজও সরকার পরিবারের বর্তমান প্রজন্ম ধরে রেখেছে। তারা তৈরি করেছে দৃষ্টান্ত।












Discussion about this post