২০২২ সালে শ্রীলঙ্কা। ২০২৪ সালে বাংলাদেশ। ২০২৫ সালের আগস্টে ইন্দোনেশিয়া এবং এর ঠিক এক মাস পরেই নেপাল। এই তালিকায় পাকিস্তানকেও রাখা যায়। গত কয়েক বছর ধরে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলিতে যুব-সমাজের দ্বারা বিদ্রোহ ছড়িয়ে পড়েছে। এর ফলে পতন ঘটছে একের পর এক শাসকের। এই প্রতিটি দেশেই বিদ্রোহী যুব সমাজের দাবি শ্রমজীবী প্রান্তিক মানুষদের জীবনযাত্রার মান উন্নত হয়নি, উল্টোদিকে শাসকগোষ্ঠী, রাজনীতিবিদ এবং ব্যবসায়ী শ্রেণির ব্যাপক উন্নতি হয়েছে। মজার বিষয় এই ধরণের ক্ষোভ ভারতেও রয়েছে, কিন্তু এখানে এর কোনও প্রভাব পড়েনি, বা পড়বে বলে মনে করেন না সংশ্লিষ্ট মহল।
নেপালের রাজনৈতিক শ্রেণীর সন্তানরা সোশ্যাল মিডিয়ায় তাদের বিলাসবহুল জীবনধারার জন্য তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছে। জেন-জি প্রজন্মের কাছে এর বিরূপ প্রভাব পড়ে, যা ক্রমেই ক্ষোভের সঞ্চার করে। দুর্নীতির উপর জেন-জি প্রজন্মের ক্রোধ বৃদ্ধির সাথে সাথে ‘নেপো কিডস’ শব্দটি ট্রেন্ডিংয়ে চয়ে আসে। ২০২৪ সালে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের প্রকাশিত দুর্নীতির র্যাঙ্কিংয়ে ১৮০টি দেশের মধ্যে নেপাল ১০৭ তম স্থানে ছিল। বাংলাদেশ ১৫১ তম, শ্রীলঙ্কা ১২১ তম এবং ইন্দোনেশিয়া ৯৯ তম স্থানে ছিল। কিন্তু দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির বিরুদ্ধে নেপালের জেন জি পরিচালিত ডিজিটাল বিদ্রোহ আচমকা সহিংসতায় পরিবর্তিত হয়, এবং প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা ওলি-সহ মন্ত্রিসভাকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করে। এর ফলে নেপাল ঠিক বাংলাদেশের মতোই একটি তত্ত্বাবধায়ক অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের দ্বারপ্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছে।
এখানেই প্রশ্ন উঠছে, নেপাল, বাংলাদেশ, পাকিস্তান, ইন্দোনেশিয়ায় যখন বারবার সরকার ভেঙে পড়ছে, তখন ভারত কিভাবে টিকে আছে? বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাজনীতি যদি দৃষ্টিভঙ্গির বিষয় হয়, তাহলে এই দেশগুলির নেতারা নিজেদেরকে খুব একটা সাহায্য করতে পারেননি। দুর্নীতির উচ্চ মাত্রা এবং রাজনৈতিক ধারাবাহিকতার অভাবের কারণে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি খুব একটা হয়নি। এর ফলে তরুণরা বিশেষ করে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। জাতিসংঘের বিশ্ব জনসংখ্যা সম্ভাবনা সংক্রান্ত ২০২৪ সালের প্রতিবেদন অনুসারে, নেপালের গড় বয়স ২৫ বছর, যা বাংলাদেশের ২৫.৭ বছরের তুলনায় সামান্য কম। ইন্দোনেশিয়ার ক্ষেত্রে এটি ছিল ৩০.১ বছর, যেখানে শ্রীলঙ্কার ক্ষেত্রে ছিল ৩৩.১ বছর। আবার ধর্মের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রজোষ্য। যারা বারবার বলে যে ভারত হিন্দু রাষ্ট্র হওয়া উচিত। তঁরা যদি নেপালের দিকে তাঁকায় তাহলে দেখবেন নেপালের প্রায় ৮০ শতাংশই হিন্দু। অপরদিকে ইন্দোনেশিয়া, বাংলাদেশ, পাকিস্তানের প্রায় ৯৫ শতাংশ মুসলিম অধ্যুষিত। তবুও, ওই দেশগুলি শৃঙ্খলা ও সংহতির পরিবর্তে, ধর্ম সহিংসতা, মৌলবাদ এবং বিশৃঙ্খলার দিকে পরিচালিত হচ্ছে। আজকের বাংলাদেশের দিকে তাকালেই বোঝা যাবে যে, একটি জাতির পক্ষে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়া কতটা সহজ। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধোর পর বাংলাদেশীরা যা চেয়েছিল তা সবই পেয়েছে। তাদের ধর্মীয় ঐক্য ছিল, আজ যা হারিয়ে গেছে। পাকিস্তানেও আমরা দেখেছি, বারবার সেনাশাসনের খপ্পরে পড়েছে দেশটি। ইমরান খানকে হটানোর পর এখন যে শাহবাজ শরিফের সরকার আছে, সেটিও কার্যত পাক সেনার হাতের পুতুল।
এই দিক থেকে ভারত অনেকটাই উন্নত। ভারতেও অনেক ধরণের অসহিষ্ণুতা রয়েছে। কিন্তু রাজনৈতিক স্থিরতা আছে। রাজনৈতিক দলগুলির মধ্যে দুর্নীতি থাকলেও ভারতের বিচারব্যবস্থা, সংবাদমাধ্যম এবং সেনাবাহিনী দৃঢ়তার সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছে। সবচেয়ে বড় বিষয় হল, ভারত হল নানা ভাষা, নানা বেশ, নানা পরিধানের দেশ। এখানে মিলনের মাঝে বিবিধটাই মহান। তাই ভারতের যুব সমাজকে এত সহজে বিভ্রান্ত করা যাবে না। স্বাধীনতা পরবর্তী ভারতেও বিদেশি শক্তি, মূলত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপীয় দেশগুলি বারবার চেষ্টা করেছে সরকারের পতন ঘটানোর। কিন্তু সেই চেষ্টা বারবার ব্যর্থ করেছে ভারতের জনগণ। কারণ গণতন্ত্রের শ্রেষ্ঠ নিদর্শন ভারত, এথানে দ্বৈত শাসনব্যবস্থা থাকায় বিদেশি শক্তিগুলির পক্ষে এত সহজে সরকার ফেলে দেওয়া সম্ভব নয়। যা শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ বা নেপালে সম্ভব হয়েছে।












Discussion about this post