পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেস যাই দাবি করুক না কেন, প্রশাসন কিন্তু মেনে নিয়েছে পরিস্থিতি ভয়াবহ এবং নিয়ন্ত্রণের বাইরে। কলকাতা হাইকোর্টও মুর্শিদাবাদে কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েনের নির্দেশ দিয়েছে। শুরুটা হয়েছিল জঙ্গিপুর থেকে। এরপর একে একে দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে সুতি, ধূলিয়ান ও সামসেরগঞ্জ এলাকায়। সম্প্রতি ভারতের সংসদে পাস হওয়া ওয়াকফ সংশোধনী আইনের প্রতিবাদে হিংসা ও অশান্তি ছড়িয়ে পড়ে পশ্চিমবঙ্গের একাধিক জেলায়। তবে সবচেয়ে ভয়ানক পরিস্থিতি তৈরি হয় বাংলাদেশ সীমান্ত লাগোয়া মুর্শিদাবাদ জেলায়। পরিস্থিতি এমনই অগ্নিগর্ভ হয়ে ওঠে যে ওই জেলার জেলাশাসক বিএসএফ বা কেন্দ্রীয় বাহিনী চেয়ে আবেদন করে। পরে রাজ্যের বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীও কলকাতা হাইকোর্টে মামলা করেন আরও কেন্দ্রীয় বাহিনী চেয়ে।
জরুরি ভিত্তিতে সেই মামলা শুনে কলকাতা হাইকোর্টও নির্দেশ দেয় মুর্শিদাবাদে কেন্দ্রীয় আর্মড পুলিশ ফোর্স মোতায়েন করার। এমনকি সেখানে ছুটে গিয়েছেন রাজ্য পুলিশের ডিজি রাজীব কুমার। তিনি নিজে দুদিন ধরে মাটি কামড়ে পড়ে আছেন সামসেরগঞ্জ এলাকায়। বিএসএফ টহল দিচ্ছে গোটা জেলায়। এখানে একাধিক প্রশ্ন উঠছে, তবে কি রাজ্যে আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গিয়েছে? রাজ্য পুলিশ কি আইন শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যর্থ? যে পুলিশ নিরস্ত্র নিরীহ শিক্ষকদের লাঠিপেটা ও বুকে লাথি মারতে পারে, তাঁরা কেন একটি সম্প্রদায়কে আটকাতে পারছে না? সবমিলিয়ে প্রশ্নটি এখন একটা বিষয়ে ঘুরপাক খাচ্ছে, তবে কি রাজ্যে “রাষ্ট্রপতি শাসন” জারি হতে পারে নাকি মণিপুরের মতো “আফস্পা” জারি করা উচিত?
আরও পড়ুনঃ চাকরিহারা বিক্ষোভে মার, ওয়াকফ বিরোধী বিক্ষোভে ছাড়!
সূত্রের খবর, বিএসএফের গোয়েন্দা শাখা একটি রিপোর্ট তৈরি করেছে। তা আইজি-র কাছে ইতিমধ্যেই জমা করা হয়েছে। সেই রিপোর্ট ইতিমধ্যেই দিল্লিতে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকে জমা পড়েছে। সেখানে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, পশ্চিমবঙ্গের মালদহ ও মুর্শিদাবাদ জেলায় অশান্তির মুলে বাংলাদেশের জঙ্গি সংগঠনগুলির হাত রয়েছে। এই মালদহ, মুর্শিদাবাদের ওপারে রয়েছে বাংলাদেশের চাপাই নবাবগঞ্জ জেলা। গত বছর আগস্টের পর থেকে বাংলাদেশের এই চাঁপাই নবাবগঞ্জ জেলায় যেভাবে মৌলবাদীদের তান্ডব দেখা গিয়েছিল, ঠিক তেমনটাই হয়েছে মুর্শিদাবাদের বিস্তীর্ণ এলাকায়। একটি সূত্র দাবি করছে, মুর্শিদাবাদ ও মালদহ জেলায় বাংলাদেশের জামায়াতে ইসলামী সক্রিয় হয়েছে। বিএসএফের দাবি, এই এলাকাতে কাঁটাতাঁরবিহীন যে অরক্ষিত সীমান্ত রয়েছে, সেই জায়গাতে বসেই ওপারের মৌলবাদীরা এখানকার লোকজনদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন, এমনকি ভিডিও কনফারেন্সেও বৈঠক চলছে বলে বিএসএফের ইন্টেলিজেন্স টিম জানতে পেরেছিলো। সে খবর রাজ্য পুলিশ ও প্রশাসনের কাছে জানানো হয়েছিল। কিন্তু কোন ব্যবস্থাই নেয়নি রাজ্য সরকার। হলে যা হবার তাই হল, ওয়াকফ সংশোধনী আইন নিয়ে ক্রমাগত গুজব ছড়িয়ে একটি সম্প্রদায়কে ক্ষেপিয়ে তোলা হল, তাতে ক্রমাগত উস্কানি ও ইনভন দিয়ে গিয়েছে বাংলাদেশের জামায়তে ইসলামী নেতারা।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, যেখানে দেশের নিরাপত্তা কোন বিদেশি রাষ্ট্রের দ্বারা বিঘ্নিত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে সেখানে যদি রাজ্য সরকার অসহযোগিতা করে তবে সেখানে রাষ্ট্রপতি শাসন জারি করার পরিস্থিতি তৈরি হয়। পশ্চিমবঙ্গে এখন এমনই পরিস্থিতি। ওয়াকফ সংশোধনী বিল বা আইন নিয়ে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ক্রমাগত হুঁশিয়ারি দিয়ে চলেছেন। তিনি স্পষ্ট ভাষায় দাবি করছেন কেন্দ্রের এই আইন রাজ্যে বলবৎ হবে না। যে বিল লোকসভা ও রাজ্যসভায় পাস হয়ে আইনে রূপান্তরিত হয়েছে সেই আইনকেই অস্বীকার করছেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী। অপরদিকে সীমান্তরক্ষী বাহিনী যখন রাজ্য প্রশাসনকে বারবার সতর্ক করছে, তখনো হাতের উপর হাত তুলে বসে আছে রাজ্য সরকার। দেশের নিরাপত্তাই যখন বিঘ্নিত এবং হুমকির মুখে তখন কেন্দ্রীয় সরকার রাষ্ট্রপতি শাসন জারি করতেই পারে। আবার সৈন্য বাহিনীর বিশেষ ক্ষমতা আইন, ১৯৫৮ বা আস্ফা জারি করলেও অবাক হবার কিছু থাকবে না। সূত্রের খবর, নয়া দিল্লির সাউথ ব্লকে ও নর্থ ব্লকে গত দুদিন ধরে টানা বৈঠক চলছে পশ্চিমবঙ্গের পরিস্থিতি নিয়ে।












Discussion about this post