পশ্চিম মেদিনীপুরে বন্যা পরিস্থিতি ইতিমধ্যেই বড় আকার ধারণ করছে। চন্দ্রকোনা, ঘাটালের বিস্তীর্ণ এলাকা জলের তলায়। ঝাড়গ্রামের কিছু অঞ্চলেও জল বেড়েছে। বন্যা পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে হাওড়া, হুগলি, পূর্ব বর্ধমানের একাধিক জায়গায়। ফলে দক্ষিণবঙ্গের কয়েকটা জেলা উচ্চ সতর্কতায় রয়েছে। কিন্তু কেন প্রতি বছর বর্ষা এলেই দক্ষিণবঙ্গের একাধিক জেলা জলের তলায় চলে যায়? কেনই বা ডিভিসি জল ছাড়লে পশ্চিমবঙ্গে বন্যা হয়? এর জন্য কি শুধুই ডিভিসি দায়ী? বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাজ্য প্রশাসনের উদাসীনতা ও দায়িত্বজ্ঞানহীনতা দায়ী।
ঝাড়খন্ড ও উত্তরবঙ্গে প্রবল বর্ষণ চলছে বিগত কয়েকদিন ধরেই। ফলে ডিভিসির জলাধারগুলিতে জলস্তর বাড়ছিল। কিন্তু এতদিন ডিভিসি সেভাবে জল ছাড়েনি। কিন্তু তার আগেই দক্ষিণবঙ্গের কয়েকটা জেলায় বন্যা পরিস্থিতি তৈরি হয়ে গিয়েছে। শুক্রবার থেকে ডিভিসি জল ছাড়তে শুরু করেছে। জানানো হয়েছে, শুক্রবার রাত থেকেই ৭০ হাজার কিউসেক হারে জল ছাড়া শুরু করেছিল ডিভিসি। শনিবার সকাল ৭টা থেকে ৭০,৪৭৫ কিউসেক হারে জল ছাড়া হচ্ছে দুর্গাপুর ব্যারাজ থেকে। এর জেরে দক্ষিণবঙ্গের কয়েকটি জেলায় কমলা সতর্কতা জারি করা হয়েছে। ডিভিসি জানিয়েছে, ঝাড়খণ্ড লাগোয়া বিহারের উপর নিম্নচাপ থাকায় প্রবল বৃষ্টি হচ্ছে ওই অঞ্চলে। ডিভিসি বেশি জল ছাড়তে শুরু করেছে। এর জেরে জল বাড়ছে দামোদর-বরাকর নদীতে। আবার প্রবল বৃষ্টির জেরে মাইথন-পাঞ্চেত থেকে আরও বেশি জল ছাড়া হচ্ছে। ফলে নিম্ন দামোদর ও মুণ্ডেশ্বরীতে জলস্তর আরও বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে কমলা সতর্কতা জারি হল। কিন্তু ফি বছর বর্ষা এলেই কেন জলমগ্ন হয় বিস্তীর্ণ অঞ্চল, কেনই বা বন্যা পরিস্থিতি তৈরি হয় বা বন্যা হয় এই রাজ্যে?
পরিবেশবিদদের বক্তব্য, রাজ্যের বিভিন্ন নদী থেকে সারা বছর অপরিকল্পিতভাবে বালি তুলে নেওয়া হয়। জেলা প্রশাসন ও পুলিশ তা দেখেও না দেখার ভান করে। মূলত শাসকদলের নেতারাই এই বেআইনি বালি পছরের সঙ্গে যুক্ত। নদীর চর থেকে যথেষ্ট বালি তুলে নেওয়ার ফলে নদীর স্তর ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এর জেরে জল ধারণ ক্ষমতাও বেশি কম হচ্ছে। আরও একটি কারণ রয়েছে বলে জানাচ্ছেন পরিবেশবিদরা। সেটা হল নদীগুলি থেকে বেরোনো খালগুলির বেহাল দশা। অধিকাংশ জায়গায় সেই খাল দখল হয়ে গিয়েছে, না হয় আবর্জনায় বুজে গিয়েছে। ফলে নদীর অতিরিক্ত জল সেই খাল দিয়ে বেরোতে পারে না। উল্টে দুকূল ছাপিয়ে বন্যা পরিস্থিতি তৈরি করে। আবার কোথাও নদীর উপর অপরিকল্পিত কজওয়ে নির্মাণ করা হয়েছে যানবাহন পারাপারের জন্য। বড় বড় পাইপ দিয়ে জল বেরোনোর রাস্তা করে তৈরি করা কজওয়েগুলি বেশ নিচু হওয়ার জন্য বর্ষার জল বাড়লেই প্লাস্টিক বা আবর্জনায় পাইপের মুখ আটকে যায়। ফলে জল উপচে ওপর দিয়ে বইতে শুরু করে। ডিভিসি জল ছাড়ে আগাম জানিয়ে। আর ডিভিসি যে জলাধারগুলি থেকে জল ছাড়বেই, সেটা সবাই জানে। তবুও আগাম ব্যবস্থা গ্রহণ করে না রাজ্য সরকার। বিরোধী নেতা তথা বিজেপির সাংসদ সুকান্ত মজুমদার যেমন বলছেন,’সরকার চায় প্রতি বছর বন্যা হোক’।
পশ্চিম মেদিনীপুরের গড়বেতা-ঘাটাল, হুগলির আরামবাগ-গোঘাট এবং ঝাড়গ্রাম, হাওড়া ও বাঁকুড়ার একাংশও প্লাবিত। এই পরিস্থিতিতে ডিভিসিকে দুষতে শুরু করেছে রাজ্য সরকার। বিজেপির বক্তব্য, সরকার চায় না তাই সমাধান হয় না। সরকার চায় প্রতি বছর বন্যা হোক! কেন্দ্রের ফান্ড আসুক, চুরি করতে সুবিধা হবে! মোদ্দা কথা হয়তো এটাই। নাহলে আজও ঘাটাল মাস্টারপ্ল্যান হল না কেন? বরাবরই কেন্দ্রকে দোষ দিয়ে তৃণমূল রাজনৈতিক ফায়দা লোটার চেষ্টা করে আসছে। কেন বালি চুরি আটকানো যাচ্ছে না, কেন খালগুলি সংস্কার হচ্ছে না? আসলে বালি চুরির টাকা যে একটা বড় ফ্যাক্টর। তাই ফি বছর বন্যা হলেও ক্ষতি নেই হয়তো।












Discussion about this post