মুহাম্মদ ইউনূসের সরকার বাংলাদেশে এক বছরের পূর্তি উৎসবের আয়োজন করতে উদ্যোগী হয়েছে। সামনের মাস থেকেই শুরু হয়ে যাবে একমাস ব্যাপী অনুষ্ঠান। আর আসন্ন ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থান দিবস পালন করবে বাংলাদেশের অন্তরবর্তীকালীন সরকার। বিগত দশ মাসে মুহাম্মদ ইউনূসের বাংলাদেশ যতটা ভারত বিরোধী হয়েছে, ঠিক ততটাই কাছে টেনে নিয়েছে পাকিস্তানকে। ১৯৭১ সালে যে পাকিস্তানের সঙ্গে যুদ্ধ করে স্বাধীনতা অর্জন করেছিল বাংলাদেশ, সেই পাকিস্তানই এখন তাঁদের পরম বন্ধু। কিন্তু বাংলাদেশ ভৌগোলিক ভাবেই ভারত দ্বারা বেষ্টিত। ফলে অভ্যান্তরীণ ও বৈদশীক বাণিজ্যর জন্য বাংলাদেশকে ভারতের ওপর নির্ভরশীল হতেই হয়। কিন্তু নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ মুহাম্মদ ইউনূস সেই ভারতকেই দূরে ঠেলে নিজেদের পায়ে কুড়ুল মেরেছেন। এখন যে কাজটা করতে চলেছেন সেটা আরও বিপদ ডেকে আনতে পারে বাংলাদেশের জন্য। এই প্রথমবার ত্রিপাক্ষিক বৈঠকে বসল চিন, পাকিস্তান, বাংলাদেশ। যা ভারতের আকাশে আশঙ্কার কালো মেঘের মতোই।
চিনের ইউনান প্রদেশের রাজধানী কুনমিংয়ে গত বৃহস্পতিবার নতুন ত্রিপক্ষীয় জোট তৈরি করেছে চিন। এই জোটে চিন ছাড়া রয়েছে পাকিস্তান ও বাংলাদেশ। এই জোট অন্য কোনও দেশ দ্বারা প্রভাবিত হবে না বলেই দাবি চিনের। মূলত ব্যবসা, বিনিয়োগ, স্বাস্থ্য, জলসম্পদ-সহ নানা খাতে সহযোগিতা বাড়াতে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানকে নিয়ে নতুন ত্রিপক্ষীয় জোট বলে দাবি বেজিংয়ের।
সম্প্রতি চিন সফরে গিয়েছিলেন বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টা মুহম্মদ ইউনুস। সেখানে গিয়ে তিনি বলেছিলেন, “ভারতের পূর্ব প্রান্তের সাতটি রাজ্য বা সেভেন সিস্টার্স পাহাড় আর স্থলভাগে ঘেরা। সমুদ্রপথে যোগাযোগ করার উপায়ই নেই তাদের। সেখানে বাংলাদেশই হল সমুদ্রপথের রাজা। তাই ওই এলাকায় চিনা অর্থনীতির বিস্তার ঘটতেই পারে”। প্রসঙ্গত, ইউনূস এই কথা একবার নয়, একাধিকবার বলেছেন। যার ফলস্বরূপ ভারত বাংলাদেশকে দেওয়া ট্রান্সশিপমেন্ট সুবিধা বাতিল করে। আবার ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে দিয়ে স্থলবন্দরগুলিও কার্যত বন্ধ করে দেয়। এই দুটি সুবিধা বন্ধ হওয়ায় বাংলাদেশকে এখন ভারত বা বিদেশের অন্যান্য দেশে ব্যবসা-বাণিজ্য করার জন্য শুধুমাত্র সমুদ্র বন্দর ব্যবহার করতে হচ্ছে। ফলে এক ধাক্কায় অনেকটা কমে গিয়েছে বাংলাদেশের বাণিজ্য। চাপ পড়েছে অর্থনীতিতে। কিন্তু তাতেও দমেননি মুহাম্মদ ইউনূস। তিনি এখনও ভারতকে নানা উপায়ে চাপে রাখার কৌশল নিচ্ছেন। যার সর্বশেষ নমুনা হল, পাকিস্তান ও চিনের সঙ্গে ত্রিপাক্ষিক জোটে যাওয়া।
আসলে ভারতের সেভেন সিস্টারকে ভেঙে ফেলতে চায় বাংলাদেশ। এই একই ইচ্ছা চিনেরও। তাতে সামিল হয়েছে পাকিস্তান। কারণ সম্প্রতি ভারতীয় সেনা পরিচালিত অপারেশন সিঁদুরের কারণে পাকিস্তান কার্যত দুমড়ে গিয়েছে। এর শোধ তুলতে বাংলাদেশকে আরও কাছে টানতে চাইছে ইসলামবাদ। অপরদিকে বিশ্ব অর্থনীতিতে ক্রমশ উপরের দিকে উঠে আসা ভারতকে চাপে রাখতে চাইছে চিন। ভরত যাতে অভ্যন্তরীণ সমস্যা ও প্রতিবেশিদেশগুলি নিয়ে বিব্রত থাকে সেই চেষ্টায় বাংলাদেশ ও পাকিস্তানকে টোপ দিয়েছে বেজিং। মনে করা হচ্ছে বিদ্ধস্ত পাকিস্তান ও দুর্বল বাংলাদেশকে অর্থনৈতিক টোপ দিয়ে ভারতের বিরুদ্ধে কাজে লাগানোর কৌশলেই এই ত্রিপাক্ষিক জোট তৈরি করেছে বেজিং। পাকিস্তান তো শিক্ষা পেয়েছেই, এবার বাংলাদেশের পালা বলে মনে করছেন ওয়াকিবহাল মহলের একটা বড় অংশ।
চিন ও পাকিস্তানের জোট ছিলই, এবার তাতে যোগ দিল বাংলাদেশ। যা নয়া দিল্লি মোটেই ভালো চোখে দেখছে না। ফলে ঢাকার বিরুদ্ধে আরও বড় পদক্ষেপ হতে পারে বলেই মনে করা হচ্ছে। একটি সূত্র বলছে, ভারত যেভাবে পাকিস্তানের সঙ্গে সিন্ধু জল চুক্তি স্থগিত করেছে, সেভাবেই বাংলাদেশের সঙ্গে গঙ্গা ও তিস্তা জল চুক্তি নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারে নয়া দিল্লি। উল্লেখ্য, ২০২৬ সালেই ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে গঙ্গা জল চুক্তি শেষ হচ্ছে, যা ১৯৯৬ সালে হয়েছিল দুই দেশের মধ্যে। বর্তমান পরিস্থিতিতে ভারত এই চুক্তি থেকে বেরিয়ে এলে বা চুক্তি স্থগিত করলে বাংলাদেশ চরম বিপদে পড়ে যাবে। যেভাবে এখন পাকিস্তান পড়েছে।
প্রসঙ্গত, তিন দেশের জোট নিয়ে চিনের বিদেশ মন্ত্রক একটি বিবৃতি দিয়ে জানিয়েছে, বাংলাদেশ এবং পাকিস্তান উভয়ই চিনের ভালো প্রতিবেশি ও বন্ধু। তাই চিন, পাকিস্তান এবং বাংলাদেশের পারস্পরিক সহযোগিতা তিনটি দেশের মানুষের সাধারণ স্বার্থে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। এই ত্রিপাক্ষিক সম্পর্ক তিন দেশের মানুষের জন্যই শান্তি, স্থিতিশীলতা, উন্নয়ন ও সমৃদ্ধি নিয়ে আসবে। আগামিদিনে এই আলোচনা আরও বহুদূর এগিয়ে এনিয়ে যাওয়া হবে। এখানেই সিঁদুরে মেঘ দেখছে নয়া দিল্লি। সূত্রের খবর, তিন দেশের বৈঠকের ফাঁকে চিনের উপবিদেশমন্ত্রী সান ওয়েইডং আলাদাভাবে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন বিদেশসচিব রুহুল আলম সিদ্দিকী ও পাকিস্তানের অতিরিক্ত সচিব ইমরান আহমেদ সিদ্দিকীর সঙ্গেও বৈঠক করেছেন। যা অন্য কূটনৈতিক সম্পর্কের ইঙ্গিত দেয়। ফলে গোটা পরিস্থিতির দিকে নয়া দিল্লি যেমন কড়া নজর রাখছে, তেমনই পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়েও আলোচনা চলছে। ওয়াকিবহাল মহল মনে করছে, পাকিস্তান ও চিনের সঙ্গে আতাত করে আরও বড় বিপদ ডেকে আনলেন মুহাম্মদ ইউনূস।












Discussion about this post