পার্ক স্ট্রিট থেকে হাঁসখালি, আর জি কর থেকে কসবা, রাজ্যের একাধিক সাড়া জাগানো ধর্ষণ মামলায় মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মন্তব্য এবং ভূমিকা নিয়ে একাধিকবার প্রশ্ন উঠেছে। কিন্তু দেখা গিয়েছে, যেখানে অভিযুক্ত শাসকদলের নেতা বা প্রভাবশালীরা, সেখানেই সতর্ক অবস্থানে পুলিশ। ছাব্বিশের নির্বাচনের আগে তাই প্রশ্ন উঠছে, রাজ্য নিজের মেয়েকেই চায়, নাকি সুরক্ষা ও নিরাপত্তাও চায়?
২০১৩ সালে বিধানসভায় রাজ্যপালের ভাষণের উপর জবাবি বক্তৃতায় মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বিরোধীদের উদ্দেশ্যে বলেছিলেন, “আপনারা বলছেন ধর্ষণ বাড়ছে। কিন্তু রাজ্যের লোকসংখ্যাও তো বাড়ছে, বিধান রায়ের আমলে রাজ্যের জনসংখ্যা যা ছিল, এখন কি তাই আছে? মানুষ বাড়ছে, গাড়ি বাড়ছে, পরিকাঠামো বাড়ছে, শপিং মল বাড়ছে, আইনক্স বাড়ছে, ছেলেমেয়েরা আধুনিক হচ্ছে! এই আধুনিকতাকে তো স্বাগত জানাতেই হবে”। ধর্ষকদের কঠোরতম সাজা দিতে ভারতের সংসদ যখন আইন আরও কঠোর করছে, তখন মহিলাদের এই জ্বলন্ত সমস্যাকে লঘু করে দেখার অভিযোগ উঠেছে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে। পার্ক স্ট্রিট থেকে হাঁসখালি, আর জি কর থেকে সাম্প্রতিক সময়ের কসবা ল কলেজের গণধর্ষণকাণ্ড। সবেতেই যেন ছোট ঘটনা বলে চালিয়ে দেওয়ার মরিয়া চেষ্টা শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেসের। সিঙ্গুরের তাপসী মালিকের কথা মনে আছে? বাম আমলের শেষ পর্বে সিঙ্গুর আন্দোলনের সময় তাপসী মালিককেও ধর্ষণ করে খুন করা হয়েছিল। সে সময় বিরোধী নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সেই ঘটনার তীব্র নিন্দা করে কার্যত কেঁদে ফেলেছিলেন। মানবিকতার প্রশ্ন তুলেছিলেন। কার্যত সিঙ্গুর আন্দোলনের হাত ধরেই রাজ্যে পালাবদল করতে সক্ষম হন তিনি। আজ সেই মমতাই ক্ষমতার ভাষায় কথা বলছেন।
২০১৩ তারিখের বিকেলে উত্তর ২৪ পরগনা জেলা সদর বারাসত থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার দূরে একটি সাধারণ গ্রামে বৃষ্টি হচ্ছিল। কামদুনি মোড়ে বাস থেকে নেমে ২০ বছর বয়সী এক কলেজ ছাত্রী যাচ্ছিলেন বাড়ির পথে। যে গ্রামের একমাত্র খ্যাতি ছিল ৭০-এর দশকের গোড়ার দিকে অমিতাভ বচ্চনের একটি ছবির লোকেশন হিসেবে, সেখানেই বেশি রাতে কলেজ ছাত্রীটির বিকৃত দেহ পাওয়া গিয়েছিল। কামুদনি ধর্ষণ মামলা সে সময় গোটা দেশেই সাড়া ফেলেছিল। আর জি কর কাণ্ডের মতোই প্রতিবাদে উত্তাল হয়ে উঠেছিল গোটা বাংলা। সে সময় মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, কামুদনি গ্রামে গিয়ে আন্দোলনকারীদের মাওবাদীর সঙ্গে তুলনা করে এসেছিলেন। তাঁরই হাতে থাকা পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছিল অভিযুক্তদের অপরাধ লঘু করে দেখানোর। একই ভাবে পার্ক স্ট্রিট ধর্ষণ সম্পর্কে তাঁর প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া ছিল, ‘এটা সাজানো ঘটনা৷’। সেই ঘটনাতেই মুখ্যমন্ত্রীর ঠিক বিপরীত পথে হাঁটায় বদলি হতে হয়েছিল কলকাতা পুলিশের তত্কালীন গোয়েন্দা প্রধান দময়ন্তী সেনকেও।
ধর্ষণ, শ্লীলতাহানি-সহ নারীদের প্রতি যৌন নির্যাতনের ঘটনা নিয়ে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বহুবার বেফাঁস মন্তব্য করেছেন। কিন্তু আশ্চর্যজনক ভাবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আশেপাশে থাকা বিদ্বজনেরা তাঁর এই বেফাঁস মন্তব্য নিয়ে কোনও প্রতিক্রিয়াই দেয়নি কোনও দিন। বরং তাঁরা উল্টে ধর্ষণ বা নারী নির্যাতন নিয়ে কখনও সরব হননি। যেমনটা দেখা গেল আর জি কর কাণ্ডে। সরকার মেডিকেল কলেজের ভিতর এক মহিলা চিকিৎসককে ধর্ষণ করে খুন করা হল। নৃশংশ এই ঘটনা নিয়ে যখন গোটা দেশ উত্তাল, নিন্দা করে প্রতিবাদ করেছেন বিশ্বের বহু শহরের মানুষজন। কলকাতা-সহ রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে সাধারণ মানুষ রাস্তায় নেমে রাত দখল, রাস্তা দখল করেছেন। প্রতিবাদের এক নতুন ভাষা সৃষ্টি করেছেন। তখন আশ্চর্যরকম নিরাবতা দেখিয়েছেন বাংলার কবি, সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবীরা। কারণ, মুখ্যমন্ত্রীর আঁচল ধরেই তাঁদের ক্ষুন্নিবৃত্তি চলে। এবার কসবা আইন কলেজের ভিতরে নির্যাতনের শিকার এক ছাত্রী, অভিযুক্ত তৃণমূল ছাত্র পরিষদের নেতা। পুলিশ গ্রেফতার করলেও তৃণমূলের নেতাদের বেফাঁস মন্তব্যে বাঁধ দেওয়া যাচ্ছে না। তৃণমূল নেত্রীর পদাঙ্ক অনুসরণ করেই সেচমন্ত্রী বলেলন “ছোট্ট ঘটনা”। বাংলার সাধারণ মানুষের প্রশ্ন, আর কত মাননীয়া? বাংলা নিজের মেয়েকে নয়, সুরক্ষা চায়।












Discussion about this post