বাংলাদেশের অর্থনীতির চালিকাশক্তি হিসেবে চট্টগ্রাম বন্দর একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এটি দেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের প্রধান প্রবেশদ্বার এবং জাতীয় অর্থনীতির হৃৎপিণ্ড। আর এই হৃদপিণ্ড যদি সচল থাকে, তবে বাংলাদেশের অর্থনীতিও সচল থাকবে। বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস চট্টগ্রাম বন্দরের এক অনুষ্ঠানে হাজির হয়ে এই বন্দর নিয়ে কিছু দাবিও করেছিলেন। পরে তিনি জাতির উদ্দেশ্যে দেওয়া এক ভাষণে বলেন, আমরা চট্টগ্রাম বন্দর নিয়ে এক পরিকল্পনা করেছি। আমরা এক বিদেশি সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ করেছি, আমাদের লক্ষ্য হল বন্দর পরিচালনার কাজ তাঁদের থেকে যত দ্রুত সম্ভব শিখে নেওয়া।
মাস খানেক আগে মুহাম্মদ ইউনূসের এই বক্তব্য নিয়ে বাংলাদেশেই বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছিল। কারণ, চট্টগ্রাম বন্দর বিদেশী সংস্থার হাতে তুলে দেওয়া নিয়ে প্রবল আপত্তি করেছিল বিএনপি-সহ বাম দলগুলি। কিন্তু বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং টার্মিনাল পরিচালনায় সাইফ পাওয়ারটেকের চুক্তির মেয়াদ শেষ হচ্ছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ঠিক করেছে, এখন থেকে আগামী ছয়মমাস চট্টগ্রাম বন্দর পরিচালনার দায়িত্ব নেবে বাংলাদেশ নৌবাহিনী। নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা এম সাখাওয়াত হোসেন এক সাংবাদিক সম্মেলনে এ কথা জানান। সেই সঙ্গে তিনি এও জানান, দীর্ঘমেয়াদে দুবাইভিত্তিক বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ডকে বন্দর পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনাধীন।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক মহলে এখন মূল চর্চার বিষয় হল, এত সংস্থা থাকতে কেন ডিপি ওয়ার্ল্ডকেই দায়িত্ব দিতে চাইছেন মুহাম্মদ ইউনূস। পাশাপাশি তাঁদের এও দাবি, কেন গ্লোবাল টেন্ডার না ডেকে, নিজের ইচ্ছামতো একটি সংস্থাকেই বেছে নিয়েন প্রধান উপদেষ্টা। এর পিছনে কাঁদের হাত রয়েছে, সেই প্রশ্নও উঠছে। একটি অংশের দাবি, আসলে মুহাম্মদ ইউনূস বা তাঁর অন্যতম দোসর খলিলুর রহমান মূলত মার্কিন দূত। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সুবিধা করে দিতেই তাঁরা দুবাই ভিত্তিক সংস্থা ডিপি ওয়ার্ল্ডকে চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং টার্মিনাল পরিচালনার দায়িত্ব দিতে চান। প্রসঙ্গত, চট্টগ্রাম বন্দরের মাধ্যমেই দেশের সিংহভাগ আমদানি ও রফতানি হয়ে থাকে। বাংলাদেশের মোট বাণিজ্যের ৯০ শতাংশেরও বেশি এই বন্দরের মাধ্যমেই সম্পন্ন হয়। বন্দরে নয়টি টার্মিনাল আছে ,যার মধ্যে চারটি কনটেইনার পরিবহন করে। কৌশলগত ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে এই বন্দর দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে বিবেচিত হয়। বাংলাদেশের মোট কনটেইনার পণ্য ওঠানামার ৫৫ শতাংশ এই টার্মিনাল দিয়ে সম্পন্ন হয়। এই টার্মিনালটি বছরে ১০ লক্ষ একক কনটেইনার ওঠানো-নামানোর স্বাভাবিক ক্ষমতা রাখে।
তবে, দেশীয় অপারেটররা গত বছর ১২ লক্ষ ৮১ হাজার কনটেইনার ওঠানো-নামানো করেছে, যা এর ক্ষমতার চেয়েও বেশি। তবুও এই বন্দরের বড় অংশ পরিচালনার জন্য বিদেশী সংস্থার হাতে দিতে চান মুহাম্মদ ইউনূস। আর তা দুবাই ভিত্তিক ডিপি ওয়ার্ল্ডকে। কেন? কারণ, ডিপি ওয়ার্ল্ড মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীর সঙ্গে কাজ করে। তবে ডিপি ওয়ার্ল্ড সরাসরি মার্কিন প্রতিরক্ষা বাহিনীর হয়ে রসদ পরিবহন না করলেও, তাদের ফ্রেইট ও কনটেইনার সার্ভিসগুলো “লজিস্টিক কনট্রাক্টর” বা তৃতীয় পক্ষের ঠিকাদারের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সরঞ্জাম বহনের কাজে ব্যবহৃত হয়। এই কনট্রাক্টররা মার্কিন প্রতিরক্ষা বিভাগের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ থাকে এবং তারা ডিপি ওয়ার্ল্ড পরিচালিত বন্দরের অবকাঠামো ও পরিষেবা ব্যবহার করে অস্ত্র বা সামরিক পণ্য সরবরাহ করে। তাদের লজিস্টিক অবকাঠামো এবং পরিষেবা ব্যবহৃত হচ্ছে এমন সেনা কার্যক্রমে, যা যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি ও অপারেশনের সঙ্গে যুক্ত। ফলে ডিপি ওয়ার্ল্ডের উপস্থিতি মানেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পরোক্ষ নিয়ন্ত্রণ থাকবে চট্টগ্রাম বন্দরে। উল্লেখ্য ওই বন্দরেই আবার বাংলাদেশ নৌবাহিনীর বেস আছে।
বিতর্কের এখানেই শেষ নয় , গত ছয় মে চট্টগ্রাম বন্দর সদলবলে পরিদর্শন করেছেন মার্কিন চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স ট্রেসি অ্যান জ্যাকবসন। মার্কিন দলের চট্টগ্রাম বন্দর পরিদর্শনের উদ্দেশ্য ছিল ইউএসজি পণ্যের চালান আগমন এবং পরবর্তীতে অংশীদার গুদামে স্থানান্তরের জন্য পণ্যগুলি ডি-স্টাফ করা পর্যবেক্ষণ করা। চট্টগ্রাম বন্দরের উচ্চ কর্মকর্তাদের সঙ্গে ওই মার্কিন দলের বৈঠকও হয়। অপরদিকে জানা যাচ্ছে, ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন কর্তৃপক্ষ এখন বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার শাহ জালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নবনির্মিত তৃতীয় টার্মিনালের পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য একটি ব্রিটিশ কোম্পানিকে চুক্তি দেওয়ার পরিকল্পনাও চূড়ান্ত করেছে। সবমিলিয়ে মুহাম্মদ ইউনূস এবং তাঁর দোসররা যে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব জলাঞ্জলি দেওয়ার কাজ শুরু করেছেন, এটা স্পষ্ট।












Discussion about this post