বাংলাদেশের গোপালগঞ্জে জাতীয় নাগরিক পার্টি বা এনসিপি’র কর্মসূচি ঘিরে যে গোলমাল হয়েছে, তার রেশ কাটার আগেই কক্সবাজারে আক্রমণের মুখে পড়লো দলটি। এখনও বাংলাদেশের নির্বাচন কমিশনের কাছ থেকে পুরোপুরি রাজনৈতিক দল হিসেবে স্বীকৃতি আদায় করে নিতে পারেনি সদ্য গঠিত হওয়া ছাত্রদের দলটি। কিন্তু তার আগেই তাঁরা এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি করে চলেছে যে কোনও রকমে প্রাণ হাতে করে পালতে হচ্ছে ওই ছাত্র নেতাদের। কিন্তু কেন এমন পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে? কেনই বা এনসিপি এত বাঁধার মুখে পড়ছে? বাংলাদেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা অবশ্য এই এনসিপি নেতাদেরই কাঠগড়ায় তুলছেন।
কক্সবাজারের চকরিয়ায় এনসিপি’র অস্থায়ী পথসভা মঞ্চ ভাঙচুরের একটি ভিডিও ভাইরাল হয়েছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। যেখানে দেখা গেছে, ট্রাকের ওপর নির্মিত অস্থায়ী মঞ্চ থেকে দলটির ব্যানার নামিয়ে ফেলছেন একদল ব্যক্তি। সে সময় ট্রাকটিতে ভাঙচুরও চালানো হয়। জাতীয় নাগরিক পার্টি চলতি বছরে জুলাই মাস জুড়ে গোটা বাংলাদেশে জুলাই পদযাত্রা করছে। এমনই একটি কর্মসূচি ছিল বাংলাদেশের গোপালগঞ্জ জেলায়। সেখানে তারা আওয়ামী লীগের সমর্থকদের দ্বারা আক্রান্ত হয়। আবার কক্সবাজারে তারা আক্রান্ত হয়েছে বাংলাদেশের আরেকটি রাজনৈতিক দল বিএনপি’র কর্মী সমর্থকদের দ্বারা। অর্থাৎ রাজনীতির ময়দানে পাকাপাকিভাবে জমি শক্ত করার আগেই বাংলাদেশের দুই বৃহৎ রাজনৈতিক শক্তির মুখে তাদের মার খেতে হল। অভিযোগ এনসিপি নেতা নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী কটূক্তি করেছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দীন আহমদকে। তাতেই ক্ষুব্ধ হয়ে বিএনপি কর্মীরা ভাঙচুর চালায় এনসিপির অস্থায়ী মঞ্চে।
জানা যাচ্ছে, কক্সবাজারে জুলাই পদযাত্রা থেকে ফেরার পথে চকরিয়া এলাকায় একটি পথসভার আয়োজন করেছিল এনসিপি নেতা-কর্মীরা। সেখানে ব্যানার, ফেস্টুন টানিয়ে ট্রাকের ওপর একটি অস্থায়ী মঞ্চও তৈরি করা হয়। ওই প্রথসভাতেই বক্তব্য রাখতে গিয়ে এনসিপি নেতা নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেন, “আগে নারায়ণগঞ্জে বিখ্যাত গডফাদার শামীম ওসমান ছিল। এখন শুনছি কক্সবাজারের নব্য গডফাদার শিলং থেকে এসেছে। ঘের দখল করছে, মানুষের জায়গাজমি দখল করছে। চাঁদাবাজি দখল করছে”।
বাইট – নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী
কারও নাম না করলেও ওই এনসিপি নেতার লক্ষ্য যে বিএনপির নেতা সালাউদ্দিন আহমেদই ছিলেন, তা বুঝতে সময় লাগেনি। এর পরই কক্সবাজার জেলার বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ মিছিল বের করেন বিএনপির নেতাকর্মীরা। চকরিয়াতে এনসিপির সভামঞ্চ ভেঙে দেওয়া হয়। এনসিপি নেতাদের গাড়ি বহরেও হামলা চালানো হয়। কিন্তু সেনাবাহিনী নিরাপত্তা দিয়ে তাঁদের নিরাপদে শেখান থেকে সরিয়ে দেয়। অভিযোগের তির বিএনপির দিকে থাকলেও তাঁরা অস্বীকার করছে। বিএনপির বক্তব্য, সালাহউদ্দীন আহমদকে নিয়ে কটূক্তির প্রতিবাদে বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ মিছিল বের করলেও কোনও মঞ্চ ভাঙচুর বা হামলার ঘটনায় তারা জড়িত নন।
প্রশ্ন উঠছে, বারবার কেন এনসিপি টার্গেট হচ্ছে? রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মধ্যে থেকেই এই জাতীয় নাগরিক পার্টির উত্থান। তারা মনে করেন তারাই নতুন বাংলাদেশের জন্ম দিয়েছেন। তাই তাদের সব দাবি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার মানতে বাধ্য। রাজনৈতিকভাবে ক্ষমতা দখলের জন্যই এই ছাত্ররা একটি রাজনৈতিক দল তৈরি করেছেন বটে কিন্তু তাদের পায়ের তলার জমি শক্ত নয়। সেই কারণেই আওয়ামী লীগকে বাংলাদেশ থেকে মাইনাস করা যেমন তাদের প্রধান লক্ষ্য, তেমনি তাদের দ্বিতীয় লক্ষ্য বাংলাদেশ থেকে বিএনপিকেও মাইনাস করা। বাংলাদেশের প্রধান দুই রাজনৈতিক দল যদি ময়দানে না থাকে তাহলে এনসিপি হবে সর্বময় কর্তা, জামাত তাদের দোসর। কিন্তু এই ভাবনা বা স্বপ্ন বাস্তবের সঙ্গে কোনোভাবেই মিল খায় না। আওয়ামী লীগের জনসমর্থন যদি ৪০ থেকে ৪৫ শতাংশও হয় তাহলে বিএনপি’র জনসমর্থনও ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ। এই বিপুল পরিমাণ জনসমর্থনকে অস্বীকার করে সবচেয়ে বড় ভুল করছে এনসিপি। তারই ফল ভুগতে হচ্ছে তাদের।
আসলে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ এই ছাত্রনেতা ও সমন্বয়কদের দাদাগিরি, খবরদারি নিয়ে এমনিতেই ক্ষুব্ধ। এরপর তারা বিরাগভাজন হয়েছেন আওয়ামী লীগ কর্মী সমর্থকদের। এখন তারা বিএনপিকেও ময়দান থেকে সরাতে তৎপর হয়েছেন রাষ্ট্রযন্ত্রের ক্ষমতার আস্ফালন দেখিয়ে। জামিন নিতে পারছে না বিএনপিও। এমনিতেই আওয়ামী লীগের নিষেধাজ্ঞা নিয়ে বিএনপি’র আপত্তি ছিল। কারণ বিএনপি নেতারা মনে করছিলেন পরের পালা তাদের। আর এটাই সত্যি হতে চলেছে। ফলে গোপালগঞ্জে আওয়ামী লীগ, আর কক্সবাজারে বিএনপি। দুই জায়গায় প্রবল বাঁধার মুখে পড়ল এনসিপি নেতারা। বাংলাদেশের রাজনৈতিক মহলের একাংশ মনে করছেন, এই এনসিপি-মুহাম্মদ ইউনুস জোট খুব শীঘ্রই চরম বিপদের মুখে পড়তে চলেছেন। ফাঁকতালে পার পেয়ে যাবেন জামায়তে ইসলামী বাংলাদেশ।











Discussion about this post