দিনে সুস্থ, সন্ধ্যায় অসুস্থ, রাতে ইস্তফা। উপরাষ্ট্রপতি পদ থেকে জগদীপ ধণখড়ের আচমকা ইস্তফা নিয়ে দিল্লির রাজনৈতিক অলিন্দ সরগরম। তিনি কি সত্যিই অসুস্থ, নাকি নিরবে অপসারণ করা হল তাঁকে? তবে এমনটা মনে করা হচ্ছে আপাতত ধণখড় পর্ব সমাপ্ত, আবার কেউ কেউ মনে করছেন, তাঁকে অন্য কোথাও পুনর্বাসন দেওয়া হবে।
সোমবার বিকালেও উপরাষ্ট্রপতি জগদীপ ধনখড়কে বেশ ফুরফুরে মেজাজে দেখা গিয়েছিল সংসদ ভবনে। তিনি হাসিমুখেই অনেকের সঙ্গে কথা বলেন। তার আগে রাজ্যসভার অধিবেশন সামলেছেন আগের মতোই। কিন্তু সন্ধ্যের পর থেকে আচমকা পরিস্থিতি পাল্টে গেল। সোজা রাষ্ট্রপতি ভবনে গিয়ে নিজের ইস্তফাপত্র দিয়ে আসেন রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুকে। চিঠিতে তিনি জানান, অসুস্থতার জন্যই উপরাষ্ট্রপতি পদ থেকে ইস্তফা দিতে চান। আশ্চর্যের বিষয়, কালক্ষেপ করে রাষ্ট্রপতিও তাঁর ইস্তফাপত্র মঞ্জুর করে দিলেন। আরও আশ্চর্যের বিষয়, প্রধামন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিও কালক্ষেপ না করে ট্যুইট করে ধনখড়ের সুস্বাস্থ্য কামনা করে লিখলেন, “জগদীপ ধনখড় উপরাষ্ট্রপতি-সহ নানা পদে দেশ সেবার একাধিকবার সুযোগ পেয়েছেন। আমি আশা রাখি, তার শরীর-স্বাস্থ্য আগামী দিনে ভাল থাকবে”। সবকিছুই যেন কেমন রহস্যজনক ঠেকছে রাজনৈতিক কারবারীদের কাছে। বিরোধী শিবিরও গোটা বিষয়টিতে সন্দেহের আতশকাঁচের নীচে ফেলে পরখ করতে চাইছে, ডাল মে কুছ কাল হ্যায় কি না!
আচমকা কেন ইস্তফা দিলেন ভারতীয় রাজনীতিতে কার্যত উল্কার গতিতে উপরে উঠে আসা বিশিষ্ট আইনজীবী জগদীপ ধণখড়? আরএসএসের সঙ্গে ওতপ্রতোভাবে যুক্ত ধনখড় প্রথমে পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যপাল হয়ে আসেন। তাঁকে বাংলায় পাঠিয়ে শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেস এবং তৃণমূল নেত্রীকে বড় বার্তা দিতে চেয়েছিল কেন্দ্রীয় সরকার। জগদীপ ধনখড় সেই কাজটা তুখোড়ভাবে করেছিলেন। প্রায়ই মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং রাজ্যপাল জগদীপ ধনখড়ের মধ্যে বিতর্ক লেগেই থাকতো। বাংলার সংবাদমাধ্যমে সে সময় কম লেখালেখি হয়নি। তারপর তাঁকে সোজা উপরাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়ন দিল কেন্দ্রীয় সরকার। বিগত দুই বছরে বিতর্ক যে তাঁকে তাড়া করেনি, তা নয়। কেউ কেউ মনে করছেন, সাম্প্রতিক সময়ে বিচারব্যবস্থা সংস্কার প্রসঙ্গে জগদীপ ধনখড়ের মন্তব্য এবং বিচারপতি বর্মা অপসারণ নিয়ে তাঁর মন্তব্য যথেষ্টই অস্বস্তিতে ফেলেছিল কেন্দ্রের বিজেপি সরকারকে। মনে করা হচ্ছে, এখান থেকেই বিপত্তির উৎপত্তি। তবে দিল্লির রাজনৈতিক মহল জগদীপ ধনখড়ের এই আচমকা ইস্তফার পিছনে সম্ভাব্য তিনটি কারণ খুঁজে পেয়েছে।
প্রথমত, বিচার ব্যবস্থা কেন্দ্রীয় তাঁর সাম্প্রতিক কিছু বিতর্কিত মন্তব্য এবং বিচারপতি যশবন্ত বর্মার অপসারণ-কাণ্ডে তাঁর ‘অতিসক্রিয়তা’। উল্লেখ্য এমকে স্ট্যালিনের নেতৃত্বাধীন তামিলনাড়ু সরকার রাজ্যপালের ভূমিকা নিয়ে শীর্ষ আদালতে মামলা করেছিল। মূলত বিল আটকে রাখা ও অন্যান্য কিছু বিষয়ে মামলা হয়। সুপ্রিম কোর্ট রায় দিয়েছিল রাজ্যপালের এক্তিয়ার নেই বিল আটকে রাখার। পেশায় আইনজীবী জগদীপ ধনখড় শীর্ষ আদালতের সেই নির্দেশের প্রকাশ্যে সমালোচনা করেছিলেন। এরপর দিল্লি হাই কোর্টের বিচারপতি বর্মার অপসারণ বা ইমপিচমেন্ট ঘিরে তৈরি হয় আরও তিক্ততা। এই বিষয়ে উপযাচক হয়ে সরকারি অনুষ্ঠানে এক কেন্দ্রীয় মন্ত্রীকে প্রকাশ্যেই ‘নির্দেশ’ দিয়ে নিজের বিপদ ডেকে আনেন উপরাষ্ট্রপতি জগদীপ ধনখড়। বহুবার তাঁকে বোঝানোর চেষ্টা হয়েছে, কিন্তু তিনি মুখে কুলুপ আঁটেননি। একের পর এক মন্তব্য করে বিড়ম্বনায় ফেলছিলেন কেন্দ্রীয় সরকারকেই। যার পরিণতি হল সোমবার। কংগ্রেসের রাজ্যসভার সদস্য জয়রাম রমেশ একটি বিবৃতিতে প্রশ্ন তুলেছেন, সোমবার দুপুর ১টা থেকে বিকেল সাড়ে ৪টার মধ্যে এমন গুরুতর কিছু হয়েছে। তাঁর বক্তব্য, ‘ধনখড় স্বাস্থ্যের কারণে পদত্যাগ করেছেন বলেছেন। তাকে সম্মান জানানো উচিত। কিন্তু এটাও ঠিক যে, এই পদত্যাগের পিছনে গভীর কোনও কারণ রয়েছে। এই কারণটাই বোঝা যাবে দিন কয়েক পর। তাঁকে দলীয় কোনও পদে আনা হচ্ছে, নাকি পাকাপাকি নির্বাসন।












Discussion about this post