ভোটের আগেই কি পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচন কমিশন ভোটার তালিকার স্পেশ্যাল ইন্টেনসিভ রিভিশন করতে চলেছে? তা যদি হয়, তাহলে বিহারের মতোই লক্ষ লক্ষ ভোটারের নাম বাদ পড়তে চলেছে এ রাজ্যে। বিহারে নভেম্বর মাসে ভোট হতে পারে, কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে আরও আট-দশ মাস বাকি। কিন্তু কমিশনের ব্যস্ততা ও কয়েকটি নির্দেশিকা ইতিমধ্যেই কম্পন ধরিয়েছে শাসকদলের বুকে।
বিহারে ভোটার তালিকা সংশোধন শুরু হওয়ার পরে এ বার নির্বাচন কমিশনের নজরে পশ্চিমবঙ্গ। যা নিয়ে ইতিমধ্যেই পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে উত্তাপ বাড়তে শুরু করেছে। শাসকদল প্রস্তুতি নিচ্ছে এর বিরোধিতা করার, অন্যদিকে বিরোধী দল উচ্ছ্বশিত কমিশনের এই পদক্ষেপে। আসলে কি এই ‘স্পেশ্যাল ইন্টেনসিভ রিভিশন’ বা এসআইআর? বিভিন্ন সূত্র মারফত জানা যাচ্ছে, আগামী মাসের মধ্যে রাজ্যে ভোটার তালিকার ‘বিশেষ নিবিড় সমীক্ষা’ বা ‘স্পেশ্যাল ইন্টেনসিভ রিভিশন’ চালু করতে চাইছে জাতীয় নির্বাচন কমিশন। প্রসঙ্গত, ২০০২ সালের ১ জানুয়ারি পশ্চিমবঙ্গে শেষ বার ভোটার তালিকার এসআইআর হয়েছিল। অর্থাৎ প্রায় ২৩ বছর আগে। তবে নির্বাচন কমিশন শুধু বিহার বা পশ্চিমবঙ্গ নয়, ভারতের সব রাজ্যেই এই কাজটি করতে চায়। আর এর জন্য ভোটার তালিকা সংশোধনের বিষয়ে নয়া পদ্ধতি জানিয়ে প্রতিটি রাজ্যকে ইতিমধ্যে নির্দেশিকাও পাঠিয়েছে নির্বাচন কমিশন। বিহারে এসআইআর হওয়ার পর বাদ গিয়েছে ৫৬ লক্ষ ভোটারের নাম। বাংলার রাজনৈতিক মহলের আশঙ্কা, পশ্চিমবঙ্গে আরও বেশি ভোটারের নাম বাদ পড়তে পারে। কারণ এই রাজ্যে অবৈধ বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী এবং রোহিঙ্গাদের উপস্থিতি উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। বঙ্গ বিজেপির নেতারা প্রথম থেকেই ভোটার তালিকা থেকে অনুপ্রবেশকারী বাংলাদেশিদের নাম বাদ দেওয়ার জন্য কমিশনকে চাপ সৃষ্টি করছে। অন্যদিকে শাসকদলের সর্বোচ্চ নেত্রীও স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছে, তাঁরা এই রাজ্যে এসআইআর করতে দেবেন না। সবমিলেয়ে রাজনৈতিক উত্তাপ বাড়ছে।
২০২৬ সালেই পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা ভোট। এই আবহে বাংলায় ভোটার তালিকা সংশোধনের প্রস্তুতি জাতীয় নির্বাচন কমিশন শুরু করতেই কোমর বেঁধে নেমেছে বিজেপি। পদ্ম শিবির সূত্রে খবর, ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে দলীয় কর্মীদের বিশেষ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেছে বঙ্গ বিজেপি। জানা যাচ্ছে, দলের নেতা-কর্মীদের দুটি ধাপে প্রশিক্ষণ দেবে বিজেপি। একটি বিএলও ওয়ান, যা বিধানসভা ভিত্তিক প্রশিক্ষণ। অন্যটি বিএলও টু, যা বুথভিত্তিক হবে। বিএলও ওয়ান হিসাবে যাঁরা প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন, তাঁরাই বিএলও টু-দের প্রশিক্ষণ দেবেন। বিএলও ওয়ান হিসাবে তিন থেকে সাড়ে তিন হাজার নেতা-কর্মীকে প্রশিক্ষণ দিচ্ছে বিজেপি। আগামী ২০ অগস্ট পর্যন্ত চলবে এই বিশেষ প্রশিক্ষণ। বিজেপি সূত্রে খবর, অনেকসময় দেখা যায় বুথ লেভেল অফিসারদের বিরুদ্ধে গাফিলতির অভিযোগ ওঠে। সেই গাফিলতিও যাতে না হয়, সেসব দিকে নজর রাখবেন এই প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত বিজেপি কর্মীরা। ফলে বোঝাই যাচ্ছে কতটা আঁটঘাঁট বেঁধে এবার ময়দানে নামছে বিজেপি। কারণ, বিভিন্ন সময় তাঁদের দাবি, এই রাজ্যে অবৈধ বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গাদের নাম ভোটার তালিকায় তুলে নিজেদের ভোটব্যাঙ্ক বাড়িয়ে নিচ্ছে শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেস। তাই কমিশনের ‘স্পেশ্যাল ইন্টেনসিভ রিভিশন’ চলাকালীন এই অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের নাম বাদ দেওয়ার চেষ্টায় থাকবে বিজেপি। তাঁদের সামনে বিহার মডেল রয়েছে।
অপরদিকে, নির্বাচন কমিশনের এই পরিকল্পনায় সিঁদূরে মেঘ দেখছে তৃণমূল কংগ্রেস। গত একুশে জুলাই মঞ্চ থেকেই বিহারে ৫৬ লক্ষ মানুষের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ যাওয়াকে নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি তখনই দাবি করেছিলেন, এই রাজ্যে তা হতে দেবেন না। যা নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক কম হয়নি। তবে এই আবহেই জানা যাচ্ছে, ভোটার তালিকা সংশোধনের কাজ শুরু হওয়ার আগেই বুথ লেভেল অফিসার বা বিএলও–দের ভাতা দ্বিগুণ করে দিয়েছে জাতীয় নির্বাচন কমিশন। এক নির্দেশিকা জারি করে কমিশন জানিয়েছে, বিএলও–দের বছরে ৬ হাজার থেকে ভাতা বাড়িয়ে ১২ হাজার টাকা করা হয়েছে। বিএলও সুপারভাইজ়ারদের ক্ষেত্রে তা ১২ হাজার থেকে বেড়ে হয়েছে ১৮ হাজার টাকা। এ ছাড়া এসআইআর ডিউটির জন্য অতিরিক্ত দু’হাজার টাকা দেওয়া হবে বিএলও–দের। অর্থাৎ, ইতিমধ্যেই কাজ শুরু করেছে নির্বাচন কমিশন। যা নিয়ে প্রবল আতঙ্কে তৃণমূল কংগ্রেস।












Discussion about this post